স্টার্টআপে ইউরোপীয় বিনিয়োগের সুযোগ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৫ এএম

বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তারা এখন শুধু দেশীয় বাজারে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাজার; সে লক্ষ্যে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বহুজাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত উল্লেখ করার মতো বিকশিত হয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক নানা উদ্যোগে দেশীয় বাজারে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন তারা। উদ্ভাবনী ধারণা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ স্টার্টআপের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ।

আগামী ৯ থেকে ১২ নভেম্বর পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়েব সামিট ২০২৬ বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ প্রযুক্তি সম্মেলনে হাজারো স্টার্টআপ, শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) প্রতিষ্ঠান, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি শুধু নিজেদের উদ্ভাবন তুলে ধরার সুযোগই নয়, বরং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, অংশীদার ও বৈশ্বিক গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি কার্যকরী মঞ্চ।

ইদানীং ওয়েব সামিট ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য), উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা প্রভৃতি অঞ্চলে আয়োজন করা হয়। পর্তুগালের ওয়েব সামিট সবচেয়ে বড় আয়োজন। অন্যান্য বারের মতো এবারও এ সামিটে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করবেন। আয়োজনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান, করপোরেট ভেঞ্চার ফান্ড এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টররা থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগ-সক্ষমতা শত শত বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রযুক্তিবিদরা জানান, পর্তুগাল ওয়েব সামিট বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এ প্রযুক্তি সম্মেলনে হাজারো স্টার্টআপ, শত শত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) প্রতিষ্ঠান, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর, বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এবং নীতিনির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করেন।

ফলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, উদ্ভাবনী পণ্য উপস্থাপন ও নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রযুক্তি খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্লাইমেট টেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল হেলথ, রিনিউয়েবল এনার্জি এবং ডিপটেক খাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা নতুন উদ্যোক্তা খুঁজছেন। ফলে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও বিশ^বাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুলনামূলক কম খরচে প্রাযুক্তিক সমাধানের সক্ষমতা, বৃহৎ জনসংখ্যা, দ্রুত সম্প্রসারণশীল ইন্টারনেটের ব্যবহার ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সম্ভাবনাময় বাজারে পরিণত করেছে।

তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মানে শুধু মূলধন নয়, এটি স্টার্টআপকে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ, অভিজ্ঞ মেন্টরের পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগও এনে দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই এ নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতের বড় বিনিয়োগ, নতুন বাজার ও কৌশলগত অংশীদারত্বের পথ খুলে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে এমন কয়েকটি খাত রয়েছে যেখানে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্ভাবনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে ক্লাইমেট টেক, ফিনটেক, এগ্রিটেক, হেলথটেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, পর্তুগালে অনুষ্ঠিতব্য ওয়েব সামিট ২০২৬ বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সঠিক প্রস্তুতি থাকা দরকার। সবার আগে উদ্যোক্তাদের স্পষ্টভাবে তাদের প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের ভ্যালু প্রপোজিশন দেখাতে হবে। কোন সমস্যার সমাধান তারা দিচ্ছে এবং কেন তাদের সমাধানটি বৈশ্বিকভাবে স্কেল আপ করা যেতে পারে সে বিষয়ে ফোকাস করতে হবে। ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা আবেগ নয়, ডেটা নির্ভর বাস্তবতা দেখতে চান। তাই ট্র্যাকশন, যেমন মাসিক গ্রোথ, রিটেনশন রেট, সিএসি-এলটিভি অনুপাত, আন্তর্জাতিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রভৃতি তথ্য পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, ইউরোপীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) থেকে বিনিয়োগ পেতে হলে উদ্যোক্তাদের ইউরোপের বিনিয়োগ-সংস্কৃতি বুঝতে হবে। ইউরোপীয় ভিসিরা ঝুঁকি কম নিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, ইএসজি ফোকাস ও স্বচ্ছ করপোরেট গভর্নেন্সকে গুরুত্ব দেন বলে স্টার্টআপকে শক্তিশালী ডিউ ডিলিজেন্সের প্রস্তুতি রাখতে হবে; আইনি নথি, ফিনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স ও ডেটা সিকিউরিটি নীতিমালা প্রস্তুত করতে হবে। উদ্যোক্তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে কীভাবে তাদের পণ্য ইউরোপীয় বাজারে লোকালাইজড হবে, কীভাবে তারা জিডিপিআর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করবে এবং কোন পার্টনারশিপ বা পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে তারা বাজারে প্রবেশ করবে। 

সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, একটি শক্তিশালী ইনভেস্টর এই পুরো প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দু। এতে সমস্যা, বাজারের আকার, প্রোডাক্ট ডেমো,  ট্র্যাকশন, বিজনেস মডেল, ফিনান্সিয়াল প্রজেকশন ও ইউরোপে স্কেলিং রোডম্যাপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর, তরুণ জনসংখ্যা এবং উদীয়মান বাজারের সম্ভাবনা প্রভৃতিকে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও শক্তি হিসেবে দেখানো যেতে পারে।

একসময় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপ দ্রুত বিশ্বের বড় উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ, তুলনামূলক কম পরিচালনব্যয় এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল ডিজিটাল অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ বাড়াতে পারে।

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ইউরোপ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা নতুন উদ্যোক্তাদের খুঁজছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলো কীভাবে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবে?  

প্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোর সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা দল, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির কৌশলকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। অনেক বাংলাদেশি স্টার্টআপ এখনো এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখে না। ফলে ভালো ধারণা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে আছে।

ইউরোপীয় বাজারে ঢুকতে পারলে বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোর জন্য নতুন গ্রাহক, উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোকে শুধু ভালো প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকাক্সক্ষাও বুঝতে হবে। সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সহজ ব্যবসা নিবন্ধন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা ও ওয়েব সামিটের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য ইউরোপীয় বিনিয়োগ, নতুন বাজার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

অনেকেই ওয়েব সামিটকে শুধু প্রযুক্তি সম্মেলন হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় স্টার্টআপ, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি-উদ্যোক্তাদের মিলনমেলা। সেখানে উদ্যোক্তারা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সামনে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি নেটওয়ার্কিং সেশন, বিনিয়োগকারী-স্টার্টআপ বৈঠক, কর্মশালা ও প্রযুক্তিপ্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন অংশীদার, গ্রাহক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্বের অনেক সফল স্টার্টআপ প্রথম আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে ওয়েব সামিটের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি সম্মেলন থেকেই। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার সুযোগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত