বিশ্ব গুম দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন গুমের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সোমবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন দাবি করেছে, বাংলাদেশ সরকার বারবার রাজনৈতিক কর্মী, সমালোচক এবং বিরোধী দলের সদস্যদের জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে এবং কোনো গুমের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের পদক্ষেপ নেয়নি। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের উচিত গুম এবং অন্যান্য গুরুতর নির্যাতনে জড়িত শীর্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২১ সালের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রচুর মানুষের গুম হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন অবশ্য গণমাধ্যমের কাছে এসব অভিযোগকে “বানোয়াট” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন যাবৎ কোনো নাগরিকের গুমের সঙ্গে সরকারের জড়িত থাকার জোরালো প্রমাণ অস্বীকার করে আসছে, যা বিশেষ করে গুমের ভিকটিমদের পরিবারের জন্য ক্ষতিকর এবং বেদনাদায়ক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, “বাংলাদেশ সরকার কয়েক শ জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনায় তার কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্যের ভূমিকা আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখতে একেবারেই আগ্রহ দেখায়নি''। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বিদেশী সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আইনে জোরপূর্বক নিখোঁজ বা গুমের সংজ্ঞা হলো, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা তাদের এজেন্টরা কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পরে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা, অথবা তার ভাগ্যে কী ঘটেছে বা তার অবস্থান প্রকাশ না করা। জোরপূর্বক নিখোঁজ বা গুমের মাধ্যমে একজন মানুষের অনেক মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়। যেমন, নির্বিচারে আটক, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের যেসব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেসব লঙ্ঘন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) অনেক গুমের ঘটনার সাথে জড়িত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র্যাবকে ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, সরকারী নেতৃত্ব গুমের ঘটনাগুলি অস্বীকার করে আসছে। অনেক পরিবার যাদের প্রিয়জনকে জোর করে নিখোঁজ করা হয়েছিল, তারা বলেছে যে, তারা যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনির সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে গেছেন, তখন পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং কিছু পরিবার হুমকি ও হয়রানির সম্মুখীনও হয়েছে।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, যেমন, জামায়াতে ইসলামী নামের একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের একজন কর্মী মোহাম্মদ রেজাউন হোসেনের পরিবার বলেছে, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট পুলিশ রেজাউন হোসেনকে আটক করার পর অস্বীকার করলে তারা একটি মামলা দায়েরের চেষ্টা করেন। স্থানীয় থানায় অভিযোগ করতে যান। কিন্তু দায়িত্বরত অফিসার তাদের বলেছিলেন, “রেজাউনের খোঁজ করতে আসবেন না, নয়তো আমরা আপনাদের সবাইকে হত্যা করব”। রেজাউন হোসেন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তার মা সেলিনা বেগম বলেন, “আমার ছেলে যদি দোষী হয়, তাহলে পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করতে পারত। পুলিশ কেন তাকে তুলে নিয়ে চলে গেল?”
তারা জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের ওপর সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ভিসা বা প্রবেশ নিষিদ্ধ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক পরিষেবায় প্রবেশাধিকার বাতিল করার আইন রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ জানায়, গত ২৪ আগস্ট গুয়ের্নিকা ৩৭ চেম্বারস ল অফিস যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ এবং উন্নয়ন অফিসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে মানবাধিকার নিষেধাজ্ঞা আইন ২০২০ এর অধীনে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের বর্তমান এবং প্রাক্তন ১৫ জন সিনিয়র অফিসারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০২০ সালের অক্টোবরে মার্কিন সিনেটররা একটি দ্বি-পক্ষীয় চিঠি প্রকাশ করেন, যাতে বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ড, গুম এবং নির্যাতনের অপরাধে গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি মানবাধিকার জবাবদিহিতা আইন এর অধীনে বাংলাদেশের র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আরএফকে হিউম্যান রাইটস এর আন্তর্জাতিক ওকালতি ও মামলা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলিতা বেয়েন্স বলেন, “গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েন করা উচিত নয়। মহাসচিব গুতেরেসের উচিত জাতিসংঘ কর্তৃক মোতায়েনকৃত ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং বাড়ানো, যাতে বাংলাদেশ থেকে আসাদের জন্য মানবাধিকার স্ক্রিনিং নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়”।
এশিয়ান মানবাধিকার কমিশনের যোগাযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেছেন, “বাংলাদেশে জোরপূর্বক নিখোঁজ বা গুমের শিকার অনেক ব্যক্তির পরিবার বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের বারবার অস্বীকৃতির মুখে অসহায় বোধ করে। এই নিপীড়ন বন্ধ করতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশ্বের উচিত এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া”।
তিনি আরো বলেন, "জাতিসংঘের উচিত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি আরো যাচাই-বাছাই করা। এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িতদের জাতিসংঘের পতাকার নিচে দায়িত্ব পালনের সম্মান দেওয়াও উচিত নয়”।
