‘আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, সেই স্বপ্ন এখন শেষ হয়ে গেছে!’

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:০১ পিএম

আফগানিস্তানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুললেও মেয়ে শিক্ষার্থীদের এখনো স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি তালেবান। শুধু ছাত্ররা এবং পুরুষ শিক্ষকরাই শ্রেণীকক্ষে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।

আফগান স্কুলছাত্রীরা বিবিসিকে বলেছে, তারা বিদ্যালয়ে ফিরতে না পেরে ভেঙ্গে পড়েছে। কাবুলের বাসিন্দা ১৬ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী বলেন, এটি একটি ‘দুঃখজনক দিন’।

‘আমি একজন ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, সেই স্বপ্ন এখন শেষ হয়ে গেছে! আমার মনে হয় না যে, তারা আমাদেরকে আবার স্কুলে যেতে দেবে। এমনকি তারা আবার উচ্চ বিদ্যালয় খুললেও, তারা আসলে চায় না যে নারীরা শিক্ষিত হোক’।

আইনজীবী হতে চাওয়া আরেক স্কুল ছাত্রী বলছিলেন, ‘আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তিত। সবকিছু খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে। প্রতিদিন আমি ঘুম থেকে উঠি এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করি কেন আমি বেঁচে আছি? আমার কি ঘরে থেকে অপেক্ষা করা উচিৎ যে কখন কেই এসে দরজায় কড়া নেড়ে আমাকে বিয়ে করতে বলবে? এটা কি একজন নারী হওয়ার উদ্দেশ্য?’

তার বাবা বলেছিলেন, ‘আমার মা নিরক্ষর ছিলেন এবং এর জন্য আমার বাবা তাকে ক্রমাগত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো এবং তাকে গর্ধব বলে ডাকতো। আমি চাই না যে আমার মেয়ে আমার মায়ের মতো হোক’।

 

নারী বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলছে তালেবান

তালেবান কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য কাজ করছেন। তবে এখনো কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আফগানিস্তানে ফের ১৯৯০-র দশকের মতোই কট্টর তালেবান শাসন ফিরে আসবে। সেসময় তারা মেয়ে এবং নারীদের সব ধরণের স্বাধীনতা ও অধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল।

তাদের নতুন সরকারের অধীনে, তালেবান কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, শরিয়া আইনের আওতায় নারীরা পড়াশোনা এবং কাজ করার অনুমতি পাবে।

কিন্তু কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তার অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। সেই সাথে গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা সব পুরুষদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী নারীদের মারধর করেছে।

শুক্রবার, তালেবানরা আফগান নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিয়েছে। তার জায়গায় ‘প্রার্থনা ও পথ নির্দেশনা এবং পুণ্যকাজে সহায়তা ও পাপকাজে বাধা দান’ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছে তালেবান।

তালেবানরা তাদের প্রথম মেয়াদের শাসনে (১৯৯৬-২০০১) মেয়েদের স্কুলে যাওয়া এবং নারীদের কর্ম ও শিক্ষা থেকে নিষিদ্ধ করেছিল।

সেই সময়কালে পুণ্যকাজে সহায়তা এবং পাপকাজে বাধাদান মন্ত্রণালয় তালেবানের নৈতিক পুলিশ হিসেবে পরিচিতি পায় ওই মন্ত্রণালয়ের কাজ ছিল তালেবানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করা, যার মধ্যে ছিল কঠোর ড্রেস কোড এবং প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড ও বেত্রাঘাত করার মতো বিষয়।

 

সম্ভাবনা খুবই বিবর্ণ

শনিবার আফগান স্কুলগুলি নতুন করে খোলার আগে জারি করা একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে: ‘সব পুরুষ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া উচিৎ’।

মাধ্যমিক স্কুলগুলি সাধারণত ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য, এবং বেশিরভাগ স্কুলেই ছেলে মেয়েরা আলাদাভাবে ক্লাস করে।

আফগানিস্তানের সংবাদ সংস্থা বাখতার নিউজ এজেন্সি তালেবান মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদকে উদ্ধৃত করে বলেছিল যে, মেয়েদের স্কুল খুলবে। তিনি বলেছিলেন, কর্মকর্তারা বর্তমানে স্কুল খোলার ‘প্রক্রিয়া’ এবং শিক্ষকদের বিভাজনসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন যে, কর্মকর্তারা বয়স্ক স্কুলছাত্রীদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন। শনিবার স্কুলছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকরা বলেছিলেন যে, সেই সম্ভাবনা খুবই বিবর্ণ।

এই সপ্তাহের শুরুতে, তালেবান ঘোষণা করেছিল যে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার অনুমতি দেওয়া হবে, কিন্তু তারা পুরুষদের পাশাপাশি পড়াশোনা করতে পারবে না এবং এর জন্য একটি নতুন ড্রেস কোড মানতে হবে।

 

নারীদের শিক্ষা থেকে বাদ দেয়ার পাঁয়তারা

অনেকে মনে করেন যে, নতুন নিয়ম কানুনের আওতায় নারীদের শিক্ষা থেকে বাদ দেয়া হবে কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আলাদা শ্রেণীকক্ষের সুযোগ করে দেয়ার সক্ষমতা নেই।

মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া মানে হচ্ছে তারা কেউই শিক্ষায় পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে না।

২০০১ সালে তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর, আফগানিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বিশেষ করে মেয়ে এবং নারীদের স্কুলে ভর্তি এবং সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের সংখ্যা প্রায় শূন্য থেকে ২৫ লাখে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া এক দশকে মেয়েদের সাক্ষরতার হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৩০% হয়েছে। যাই হোক, শহরগুলোরও অনেক উন্নতি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মুখপাত্র নরোরিয়া নিঝাত বলেন, আফগান নারী ও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি ধাক্কা।

‘নব্বইয়ের দশকে তালেবানরা যা করেছিল এটি সবাইকে তা ফের মনে করিয়ে দিলো। যার ফলশ্রুতিতে আমরা নিরক্ষর এবং অশিক্ষিত নারীদের একটি প্রজন্ম পেয়েছিলাম’।

ক্ষমতায় আসার কিছু পরেই তালেবান বলেছিল যে, ‘ইসলামী আইনের কাঠামোর মধ্যে’ থেকেই আফগানিস্তানে নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত