টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গত দেড় বছরের ছুটিতে সাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক ছাত্রসহ ১৭১ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই লেখাপড়া বন্ধ করে এখন সংসার করছেন।
করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই অভিভাবকেরা তাদের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন শিক্ষকরা।
উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে ১৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আটটি কলেজ, ১৪টি মাদ্রাসা ও তিনটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৯ হাজার ১৯২, কলেজ শিক্ষার্থী আট হাজার ৭৫২ ও মাদ্রাসায় তিন হাজার ৭৭৫ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মির্জাপুর সরকারি সদয় কৃষ্ণ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৯৬২ জন। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীর সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৮৮ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন ও ২০২২ সালের এসএসসি ৩৪৪ জনের মধ্যে পাঁচজন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে।
সদরের মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এক হাজার ৪৬০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। বর্তমান বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোকেশনালসহ নবম শ্রেণিতে ২৯১ জন ছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন বিয়ে করেছে।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ৩০৬ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৪ জন এবং ২০২২ সালের ২৯৩ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে।
সদরের এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বিয়ে হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদ্যালয়ে ক্লাস করছেন বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতান উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন।
উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত গেড়ামাড়া গোহাইলবাড়ি সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়ে গত দেড় বছরে ষষ্ঠ শ্রেণির চারজন, সপ্তম শ্রেণির ৯ জন, ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৯ জন ও ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ৯ জন বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ফিরোজ আল মামুন।
মির্জাপুর উপজেলা সদরের আফাজ উদ্দিন দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় গত দেড় বছরে অষ্টম শ্রেণির একজন ও নবম শ্রেণির চারজন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে।
উপজেলার বহুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত দেড় বছরে অষ্টম শ্রেণি পাস তিন শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম।
দেওহাটা এজে উচ্চ বিদ্যালয়ে গত দেড় বছরে ৮ম শ্রেণির একজন, ৯ম শ্রেণির ৪ জন,এসএসসি ২০২১ এর এক ছাত্রসহ ৯ জন এবং এসএসসি ২০২২ এর ১৩ জন ছাত্রীর বাল্য বিয়ে হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক খোরশেদ আলম।
উয়ার্শী পাইকপাড়া ইয়াসিন অ্যান্ড ইউনুস খান উচ্চ বিদ্যালয়ে গত দেড় বছরে ৭ম শ্রেণির ৩ জন, এসএসসি ২০২১ এর ১৯ জন এবং এসএসসি ২০২২ এর ৭ জন ছাত্রীর বাল্য বিয়ে হয়েছে বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান জানিয়েছেন।
দেওহাটা এ জে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খোরশেদ আলম বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘ ছুটিতে দরিদ্র অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তাছাড়া গ্রাম এলাকা কুসংস্কার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা্ও এসব বাল্য বিয়ের জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাল্যবিয়ের খবর পেলে আমরা উপস্থিত হয়ে তা বন্ধ করি। গত দেড় বছরে এ উপজেলায় কতজন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে তার একটি তালিকা করা হচ্ছে।’
