তালেবানের কৌশলেই তালেবানকে ঘায়েল করতে চাইছে আইএস

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:৪৯ পিএম

কাবুলে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক মাস যেতে না যেতেই আফগানিস্তানের নতুন তালেবান শাসকরা ভয়ঙ্কর সব আভ্যন্তরীণ শত্রুদের মুখোমুখি হচ্ছে, যারা তালেবানদেরই শহুরে যুদ্ধের অনেক কৌশল অবলম্বন করছে, যেসব কৌশলে তালেবানরা নিজেরাও তাদের গেরিলা যুদ্ধে সফল হয়েছিল।

তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর গত মাসে কাবুল বিমানবন্দরের ভয়াবহ হামলা এবং পূর্ব জালালাবাদে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ, ইসলামিক স্টেটের স্থানীয় সহযোগী সংগঠন যেসব হামলার দায় স্বীকার করেছে, এসব হামলা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার প্রতি নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে। তালেবানরা এই হিংস্র জঙ্গিদেরকে তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারেনি।

তবে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আইএস এর হুমকি অস্বীকার চলতি সপ্তাহে বলেছেন যে, আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের কোন কার্যকর উপস্থিতি নেই। কিন্তু তালেবানের মাঠের কমান্ডাররা আইএস এর হুমকি এত হালকাভাবে উড়িয়ে দেন না।

তালেবান আন্দোলনের গোয়েন্দা বিভাগের দুই সদস্য যারা জালালাবাদে সাম্প্রতিক কিছু হামলার তদন্ত করেছিলেন তারা ভারতের টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বলেছেন যে, হামলার কৌশলগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আইএস জঙ্গি গোষ্ঠী একটি বিপদ হিসেবেই রয়ে গেছে, যদিও কোনো অঞ্চল দখলের জন্য তাদের পর্যাপ্ত যোদ্ধা এবং সম্পদ নেই।

তারা যেভাবে স্টিকি বোমার ব্যবহার করছে- এমন চুম্বকীয় বোমা যেগুলি সাধারণত গাড়ির নীচে আটকে থাকে- তালেবানরাও ঠিক একইভাবে সাবেক সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য তাদের কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজের ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালাতো।

তালেবান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘আমরা এই স্টিকি বোমাগুলো নিয়ে চিন্তিত যেগুলি আমরা একসময় কাবুলে আমাদের শত্রুদের টার্গেট করার জন্য ব্যবহার করতাম। আমরা আমাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়েও উদ্বিগ্ন, কারণ তারা যদি আইএসকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে তাহলে তারাও তাদের টার্গেট হতে পারে’।

ইসলামিক স্টেট-খোরাসান বা আইএস-কে (আধুনিক আফগানিস্তান এবং ইরানের কিছু অংশের প্রাচীন নাম খোরাসান) ২০১৪ সালের শেষের দিকে প্রথম আফগানিস্তানে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু তালেবান এবং মার্কিন বাহিনী উভয়ের ধারাবাহিক হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ার পর ২০১৮ সালের দিকে এসে আইএস দূর্বল হয়ে পড়ে।

নানগারহারে তালেবান নিরাপত্তা বাহিনী বলছে যে, তারা গত বুধবার রাতে আইএস এর তিন সদস্যকে হত্যা করেছে এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন যে, আইএস এখনও ছোট আকারের হামলার মাধ্যমে সমস্যা সৃষ্টি করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘তাদের মূল কাঠামো ভেঙে গেছে এবং তারা এখন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হামলা চালায়’।

তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বারবার বলছে যে, তারা আফগানিস্তানকে অন্য দেশে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন যে, এই ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন আইএস-কে এবং আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করেছে। আলকায়েদা তালেবানের আগের শসনামলে আফগানিস্তানকে তাদের ঘাঁটি বানিয়েছিল।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সিকিউরিটি স্টাডিজের অধ্যাপক রোহান গুনারত্ন বলেন, ‘আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন সব ইসলামপন্থীর জন্যই একটি বিশাল বিজয়। তারা সকলেই তালেবানদের প্রত্যাবর্তন উদযাপন করেছে, তাই আমি মনে করি আফগানিস্তান তাদের নতুন থিয়েটার হয়ে উঠবে’।

আইএস-কে তালেবান বা তালেবানের পাকিস্তানি সংস্করণ টিটিপির যোদ্ধাদেরকেও তাদের দলে ভেড়ায়। কিন্তু তারা ঠিক কীভাবে কাজ করে তার অনেক কিছুই এখনও বোঝা যায় না।

আইএস চোরাচালান রুট এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, কিন্তু এরা ইসলামী আইনের অধীনে একটি বৈশ্বিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে, তালেবানরা জোর দিয়ে বলে যে, আফগানিস্তানের বাইরে তাদের কোথাও আর কোনো স্বার্থ নেই। তালেবানরা মূলত আফগান ইসালামি জাতীয়াতাবাদী দল।

অধিকাংশ বিশ্লেষক এবং জাতিসংঘও মনে করে আইএস-কে এর যোদ্ধার সংখ্যা ২০০০ এরও কম। অন্যদিকে, তালেবানদের যোদ্ধার সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। তবে তালেবানরা ক্ষমতায় এসে আফগানিস্তানের কারাগারগুলি খুলে দেওয়ার পর আইএস-কে এর যোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে যায়।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জুন মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরাক ও সিরিয়ায় মূল সংগঠনের সঙ্গে আইএস-কে এর আর্থিক ও লজিস্টিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে, যদিও তারা যোগাযোগের কিছু মাধ্যম ধরে রেখেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মূল সংগঠন থেকে খোরাসান শাখাকে অর্থায়ন সহায়তা কার্যকরভাবে শুকিয়ে গেছে বলে মনে করা হয়’।

যাইহোক, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তবে তালেবানদের মধ্যে যে বিভক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে তালেবানের অনেক অসন্তুষ্ট যোদ্ধাও আইএস এর সঙ্গে যোগদানে উৎসাহিত হতে পারে।

জাতিসংঘ বলেছে, ‘আইএস সক্রিয় এবং বিপজ্জনক, বিশেষত যদি এটি আফগানিস্তানে একমাত্র বিশুদ্ধ প্রত্যাখ্যানবাদী গোষ্ঠী হিসাবে অবস্থান করে, তাহলে অসন্তুষ্ট তালেবান এবং অন্যান্য সন্ত্রাসীরা তাদের সঙ্গে যোদ দিয়ে তাদের শক্তি কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলতে পারে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত