১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন পূরণ হলো না বাংলাদেশের। মালের রাশমি ধান্দু স্টেডিয়ামে গতকাল নেপালের সঙ্গে বাঁচা-মরার লড়াইটি ১-১ গোলে ড্র করে ফাইনালের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে জামাল ভুঁইয়াদের। লাল-সবুজকে বিদায় নিতে বাধ্য করা হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। রেফারির ভুল বাঁশিতে বলি হয়ে জয় হাতছাড়া হয়েছে দলটির। তিন বছর আগে এই নেপালের কাছে হেরেই গ্রুপপর্ব উতরানো হয়নি বাংলাদেশের। নেপাল আবারও স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। তবে এবার প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রেফারিকে বিভ্রান্ত করেন।
ম্যাচের নবম মিনিটে সুমন রেজার গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ শিবিরে যখন জয়ের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, মালের রাশমি ধান্দু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় চার হাজার প্রবাসী বাঙালি যখন আগাম উৎসব শুরু করে দিয়েছেন, তখনই আসে রেফারির হঠকারী সিদ্ধান্ত। রোহিত চাঁদের ক্রস আসে গোলমুখে। অঞ্জন বিস্তা, বিশ্বনাথ ঘোষ আর সাদউদ্দিন গোলমুখে। সতীর্থের ক্রস বাতাসে ভাসা অবস্থায় অঞ্জন সুযোগ বুঝে দিয়ে বসেন ফলস ডাইভ। অনেক দূরে থাকা রেফারি আগপিছু পশ্চাত না ভেবে বাঁজান পেনাল্টির বাঁশি। অসম্ভব অভিনয়ে পেনাল্টি আদায় করে অঞ্জনই পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান ম্যাচে। এর কিছুক্ষণ আগে উজবেক রেফারির আরেক ভুল সিদ্ধান্তে দশজনের দলে পরিণত হয় বাংলাদেশ। নেপালের অনেক প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা গোলকিপার জিকোকে দেখতে হয় সরাসরি লাল কার্ড।
বাঁচা-মরার ম্যাচে বাংলাদেশ কোচ অস্কার ব্রুজন নিয়েছিলেন আক্রমণাত্মক কৌশল। ৪-৪-২ ফরমেশন সাজাতে তিনি পরিবর্তন আনেন চারটি। আগের তিন ম্যাচ সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলা তারিক কাজীকে লেফটব্যাক পজিশনে নিয়ে যান কার্ডের কারণে খেলতে না পারা ইয়াছিন আরাফাতের জায়গায়। টুটুল হোসেন বাদশাকে তপু বর্মণের সঙ্গে সেন্টারব্যাক পজিশনে নিয়ে আসা হয়। রাইটব্যাকে ফেরেন বিশ্বনাথ ঘোষ। জামালের সঙ্গে মাঝমাঠের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিপলু আহমেদকে। কার্ডের খাঁড়া থেকে ফিরে লেফট উইংয়ে সপ্রতিভ ছিলেন রাকিব হোসেন। রাইট উইংয়ে খেলেন সাদউদ্দিন। আর সামনে সুমন রেজা ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম। আক্রমণাত্মক থাকার সুবিধাটা শুরুতেই নিয়েছে বাংলাদেশ। নবম মিনিটে প্রথম সেট-পিস কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায় তারা। বাঁ প্রান্ত থেকে জামাল ভুঁইয়ার ফ্রিকিক নেপালের এক ডিফেন্ডারের মাথা ছুঁয়ে গোলমুখে এলে সুমন রেজার হেড জালে জড়ায় (১-০)। পিছিয়ে পড়ার পর থেকেই নেপাল মরিয়া হয়ে উঠে আক্রমণাত্মক খেলতে থাকে। ১৫ মিনিটে ভালো সুযোগ নষ্ট করেন রোহিত চাঁদ। ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে কাটব্যাক দেন নবযুগ শ্রেষ্ঠা। কিন্তু রোহিতের শট বাইরে যায়। ২১ মিনিটে দিনেশ রাজবংশীর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে একাই ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে ইব্রাহিমকে পাস না বাড়িয়ে শট নেন সুমন রেজা। তবে তা লক্ষ্যে ছিল না। যোগ করা সময়ে বাঁ দিক থেকে রোহিত চাঁদের ক্রসে আয়ুস ঘালানের হেড বাইরে যায়। বিরতি থেকে ফিরে সুমন রেজা ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন ব্যবধান বাড়ানোর। ৫৫ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে অসাধারণ গতিতে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন। কিন্তু নেপাল কিপার সেটা রুখে দিয়ে দলের ফেরার আশা বাঁচিয়ে রাখেন। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে রাকিব অযথা এক ব্যাকপাস দিয়েছিলেন জিকো বরাবর। রোহিত তা প্রায় ধরেই ফেলেছিলেন। বিপদ বুঝে বক্স থেকে বেরিয়ে তাকে রুখতে গিয়ে বল হাতে লাগে জিকোর। এই অপরাধে বড়জোড় হলুদ কার্ড দিতে পারতেন রেফারি। সেটা না দিয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখান তিনি। অগত্যা ইব্রাহিমকে তুলে আশরাফুল রানাকে গোলরক্ষার দায়িত্বে নামান ব্রুজন। রানা একটি অসাধারণ সেভে দলকে বিপদমুক্ত করলেও ৮৭ মিনিটে অঞ্জনের প্রতারণা আর রেফারির বিতর্কিত বাঁশিতে শেষ হয় স্বপ্নের মতো যাত্রা।
অপর ম্যাচে ভারত ৩-১ গোলে মালদ্বীপকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে। ভারতের সুনীল ছেত্রী করেন জোড়া গোল।
জেমি ডে’র জায়গায় অস্কার ব্রুজন দায়িত্ব নিয়েই সাত দিনে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আসরে বাংলাদেশের খেলায় আনন্দের রেণু সেভাবে না থাকলেও ছিল সাফল্যের রসদ। যে করেই হোক গোল পাওয়া, প্রতিপক্ষের খেলাকে কঠিন করে তোলার সব চেষ্টাই ছিল। তবে বাজে রেফারিং বাধা হয়ে দাঁড়ালে সে দলের স্বপ্ন বাঁচতে পারে না। বাংলাদেশের স্বপ্নও বাঁচেনি। তাই ফাইনাল অথবা শিরোপার গৌরব নয়, বিদায়বেলায় বাংলাদেশের সঙ্গী শুধুই বিষাদ।
