বিদেশি ভাষা না দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখব ইংরেজি

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১০:০৫ পিএম

বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের সব কিছুকে বদলে দিয়েছে। একটা সময় ছিল কথায় কথায় ইংরেজি বললে অনেক মানুষ বিরক্ত হতেন। আর এখন ইংরেজি বলতে বা লিখতে না পারলে বিব্রত হতে হয়। ইংরেজি এখন আর কেবল সাহেবদের ভাষা নয়; ইংরেজি আপনার আমার সবার ভাষা, যা এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশি^ক ভাষা বা গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে স্বীকৃত। এই যুগে এসে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি জাতীয় ক্ষেত্রেও অবদান রাখতে পারেন। ইংরেজি জানা মানে যেন কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা, সম্পদের নিশ্চয়তা। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার সনদ এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতিতে প্রবেশের পাসপোর্ট হিসেবে কাজ করে। বিশে^র নানা দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে ইংরেজি শুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

‘বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের হিসেবে পৃথিবীতে ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন ১৫০ কোটি মানুষ। কিন্তু এদের মধ্যে ৪০ কোটিরও কম মানুষের মাতৃভাষা এটি’ (বিবিসি বাংলা)। সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি যতটা ব্যবহার হয় অন্য কোনো ভাষা এতটা ব্যবহার হয় না। ইংরেজি ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। ‘বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে ইংরেজি সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। ২০৫০ সালেও ইংরেজি সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষাই থাকেবে (বিবিসি বাংলা ২৬ আগস্ট ২০২০)’। ভুলে গেলে চলবে না সাহিত্য-সংস্কৃতি-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ইংরেজি এখনো শীর্ষস্থানেই আছে।

ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের বাঙালি মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষাকে ভালো চোখে দেখত না। প্রায় দু’শ বছর ব্রিটিশের অধীনে থাকার পরও আমরা ইংরেজি শিখতে পারিনি। স্বাধীনতার পর মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে ইংরেজি শিক্ষাকে প্রায় বিসর্জন দিয়েছিলাম। আর এভাবেই কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ইংরেজি শিক্ষা থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়ি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা কোনো স্তরেই আমাদের ইংরেজির অবস্থা ভালো না। ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ হাজার ৫৬৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দু’জন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৬ সালে গ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ ভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করেছিল ইংরেজিতে।

ইংরেজির দক্ষতায় বাংলাদেশের অবস্থা খুবই নিম্নস্তরে, এমন তথ্যই উঠে এসেছে এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায়। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এডুকেশন ফার্স্ট (ইএফ)। ২০১৯ সালে প্রথম ভাষা ইংরেজি নয় এমন ১০০টি দেশের ২৩ লাখ মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে ইংরেজি দক্ষতার পরিমাপ করেছে তারা। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে অতি উচ্চ, উচ্চ, মধ্যম, নিম্ন ও খুবই নিম্ন দক্ষ এই পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। ৪৮ দশমিক ১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে তালিকার ৭১তম স্থানে, দক্ষতার শ্রেণি হিসেবে যা খুবই নিম্ন। ইংরেজিতে দক্ষতার সূচকে আমাদের আশপাশে এশিয়ার যে দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে তাদের মধ্যে রয়েছে নেপাল : স্কোর ৪৯ অবস্থান ৬৬, ইন্দোনেশিয়া : স্কোর ৫০.০৬ অবস্থান ৬১, পাকিস্তান : স্কোর ৫১.৪১ অবস্থান ৫৪, ভিয়েতনাম : স্কোর ৫১.৫৭ অবস্থান ৫২, চীন : স্কোর ৫৩.৪৪ অবস্থান ৪০, ভারত : স্কোর ৫৫.৪৯ অবস্থান ৩৪ ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত দুর্বল। ইংরেজির এ অবস্থা দেখে শিক্ষাবিদরাও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা ইংরেজিতে পাঠদান করছেন, তাদের ইংরেজিতে দক্ষতা কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটি দেখতে হবে। শিক্ষকরাই যদি দুর্বল হন, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন? একদিকে বিষয়ভিক্তিক শিক্ষকের অভাব, অন্যদিকে নিয়োগ পাওয়ার পরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করার ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না।’ তথাকথিত ‘কমিউনিকেটিভ ইংলিশ’ পদ্ধতিতে ইংরেজি শিক্ষাদানকে ভুল উল্লেখ করে প্রবীণ এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘আমরা ইংরেজি শিখেছি গল্প, কবিতা পড়ে। এখন পঠ্যবইয়ে গল্প, কবিতা রাখা হয়েছে খুবই কম। ফলে ইংরেজি অনেক কঠিন একটা ভাষাএ ধরনের মনোভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।’ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযান এডুকেশন ওয়াচ ২০১৮-১৯ প্রতিবেদনে বলেছে, ‘ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানরত মাধ্যমিকের ৫৬ শতাংশ শিক্ষকেরই বিষয়ভিক্তিক কোনো প্রশিক্ষণ নেই।’ এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, ‘পেশাগত প্রয়োজনীয়তায় ইংরেজি শেখার বিকল্প নেই। যদিও দুঃখজনক হলেও সত্য যে ব্যাংকে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে গিয়ে ইংরেজিতে প্রত্যাশিত দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কোনো গ্রাহক বা বিনিয়োগকারী কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবলীল ইংরেজি বলতে সক্ষম কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর’।

দেশে জিডিপিতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশিরা কাজ করে। অধিকাংশ মানুষই কাজ করছে মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশে। ভাষাজ্ঞান যে কত বড় একটি শক্তি সেটা প্রবাসে কর্মরতরা ভালোই জানেন। শুধু ইংরেজি ভালো জানার কারণেই আমাদের দেশের কর্মীদের তুলনায় ফিলিপাইন, ভারত ও শ্রীলঙ্কার কর্মীদের বেতন দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি বৈদেশিক শ্রমবাজারে। কর্মক্ষেত্রে সুপারভাইজার হন তারা, বাংলাদেশিরা হন অদক্ষ শ্রমিক। একই কাজ আমাদের লোকেরাও করেন। কিন্তু শ্রীলঙ্কা বা ভারতের কর্মীরা আমাদের চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ বেতন বেশি পান। তাদের বেতন হয় তিন হাজার ৫০০ রিয়াল, বাংলাদেশিদের হয় এক হাজার ২০০ রিয়াল। এক্ষেত্রে আরেকটি দৃষ্টান্ত ফিলিপাইন। বাংলাদেশের প্রায় সমপরিমাণ ফিলিপিনো কর্মীরা প্রবাসে কাজ করেন। কিন্তু তাদের প্রবাসী আয় বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ এই ইংরেজি জানার কারণেই। ‘এডুকেশন ফার্স্ট’-এর ইংরেজি দক্ষতার সমীক্ষায় ফিলিপাইন উচ্চ অবস্থানে (২০তম) রয়েছে।

শুধু ইংরেজি ভালো না জানার কারণে আমরা দেশি-বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ছি মেধা থাকা সত্ত্বেও। দেশে এখন বহু সংখ্যক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কাজ করছে। এছাড়া বিশ্বমানের অনেক কোম্পানি এদেশে বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। এ সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অন্যতম শর্ত ভালো ইংরেজি জানা। এই ঘাটতি পূরণ করতে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ থেকে ইংরেজিতে দক্ষ কর্মী আনতে হচ্ছে। বৃহৎ পরিসরে ইংরেজিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে না ওঠায় সংকুচিত হচ্ছে কর্মক্ষেত্র। বাড়ছে কম ইংরেজি জানা শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। চাকরির ইন্টারভিউতে সাধারণ মানের ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী। ক্যারিয়ার গঠনে ইংরেজি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেই দেখা যাচ্ছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, কোনো ক্ষেত্রেই আসছে না কাক্সিক্ষত সাফল্য। আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারেও সুযোগ পাচ্ছে না তারা। বছরে ৫ লাখ তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও ইংরেজি দক্ষতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ইংরেজি দক্ষতার অভাবে আমরা আন্তর্জাতিক দেন-দরবারেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি’। এত প্রতিকূলতার পরও ইংরেজি ভাষাকে আমরা এখনো ‘ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবেই শিখছি, ‘সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে শিখতে পারলাম না আজও।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত