আবরার হত্যার রায় ও কিছু কথা

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৯ পিএম

ঘটনার বীভৎসতায় চমকে গিয়েছিল সবাই। এভাবেও মারা যায়, এত ভয়ংকর কায়দায়! ভয়, দুঃখ, ক্ষোভ, কষ্ট সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল বিস্ময়বোধ। বলছি, আবরার হত্যাকাণ্ডের কথা। বুয়েটের এই মেধাবী ছাত্রকে স্রেফ পিটিয়ে মেরেছিল তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেই মামলার রায় হয়েছে ২০ জনের ফাঁসি, ৫ জনের যাবজ্জীবন। এই রায় এতটাই প্রত্যাশিত ছিল যে, মৃত্যুদণ্ড বিরোধী বহু মানুষকেও এই রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখেছি। ঠাণ্ডা মাথায় করা এই খুন স্পর্শ করেছিল দেশের ১৭ কোটি মানুষকে। 

আবরারের ঘটনাটি প্রথম নয় এদেশে। এ ধরনের ঘটনা অতীতে বহুবার ঘটেছে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ঘটেছে। এমন ঘটনা আমরা দেখেছি, পড়েছি, শুনেছি, ফেইসবুকে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়েছি, দুই একটি ঘটনা নিয়ে টকশোতে চিৎকার করেছি, বিচার চেয়েছি, তারপর ব্যস! সব শান্ত, চুপচাপ, নিস্তরঙ্গ। একদিনে তো আর পরিস্থিতি এইখানে নামেনি। বছরের পর বছর আমাদের চোখের সামনে একটির পর একটি ঘটনা ঘটতে দিয়েছি আমরা। দলীয় রাজনীতি দানব তৈরি করেছে আর আমরা তাকিয়ে দেখেছি। একটা স্ট্যাটাসের জন্য খুন হওয়া, কোপ খাওয়া, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণির ছাত্রসহ অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। সুতরাং এই ঘটনা একদিনে ঘটেনি, পরিস্থিতি আজ হঠাৎ এই জায়গায় এসে ঠেকেনি।

এই হত্যার পরপরই উঠে এসেছিল দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশের কথা। সেখানে টর্চার সেলগুলোতে কীভাবে চলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর তাণ্ডব, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে। কারও ওপর নির্যাতন করার আগে তাকে জামায়াত-শিবির নাম দেওয়া হয়। তারপর হত্যা পর্যন্ত জায়েজ। এই যেমন আওয়ামী পরিবারের সন্তান হওয়ার পরও শিবির আখ্যা দিয়ে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। নোংরা রাজনীতির চক্করে পড়ে মেধাবী-অমেধাবী নির্বিশেষে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের বহু ছাত্র নরপিশাচে পরিণত হয়েছে। সাত ঘণ্টা দফায় দফায় আবরারের ওপর স্টাম্প ভেঙে মৃত্যু নিশ্চিত করার ফাঁকে ফাঁকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইয়েরা মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করেছে, রাতের খাবার খেয়েছে, বার্সেলোনার খেলা দেখেছে। কি ভীষণ ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা। এমনকি পানি চাইবার পর পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি তাকে।

এই ঘটনার পরপরই বের হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলে আছে শতাধিক টর্চার সেল। সেখানে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। র‌্যাগিংয়ের নামে চলে দানবীয় অত্যাচার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক উপাচার্য দক্ষ প্রশাসক, না দলীয় কর্মী তা এখন বোঝা দায়। চাঁদার টাকা ভাগাভাগি থেকে শুরু করে নিজ বাসভবনে বিউটি পার্লার খোলা পর্যন্ত বাদ নেই কিছু। শিক্ষক নিয়োগ থেকে উপাচার্য বাছাই সবই চলে দলীয় বিবেচনায়। মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতার যেহেতু কোনো প্রশ্ন নেই তাই দলীয় পরিচয়ই সব ক্ষেত্রে বিচারের একমাত্র মাপকাঠি।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘ Give the dog a name and kill it’. বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন কাউকে শিক্ষা দিতে চাইলে প্রথমে তাকে জামাত-শিবির নাম দেয় তারপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন থেকে শুরু করে পিটিয়ে-কুপিয়ে মেরে ফেলা পর্যন্ত সবই জায়েজ। আবার উল্টো দিকে একই ধরনের ঘটনা আমরা ঘটতে দেখেছি ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে লেখক-প্রকাশকসহ ভিন্নমতের মানুষদের কুপিয়ে মেরে ফেলতে। স্পষ্টভাবে বলে রাখা ভালো, শিবির হোক কি নাস্তিক, চূড়ান্ত বাম কিংবা ডান, কাউকেই তার মতপ্রকাশের জন্য হত্যা তো দূরেই থাক, কোনো রকমের কোনো শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার ন্যূনতম কোনো অধিকার কারও নেই।

কারও মতপ্রকাশকে যদি থামাতেই হয়, তা থামাতে হবে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে। কিন্তু সেটা কি ঘটে আজকের বাংলাদেশে?

দুঃখ নিয়ে হলেও বলতে হয় আবরারের পরিবারের ভাগ্য ভালো। প্রাথমিকভাবে হলেও একটা বিচার তারা পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই রায় বহাল থাকবে কি না, রায় কার্যকর হবে কি না, অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসবে কি না, সেসব ভিন্ন আলোচনা। অতীতেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিচার পায়নি কেউ।

২০১২ সালে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে দিনে দুপুরে বীভৎসভাবে কুপিয়ে মারা হয়েছে বিশ্বজিৎকে। অসংখ্য চাক্ষুষ সাক্ষী আর ভাইরাল হওয়া ভিডিও থাকা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মীকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছিল। এরপর একে একে ঘটেছে যুবায়ের, দিয়াজ, ইরফান, আবু বকর, আবেদসহ বহু হত্যাকাণ্ড। ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ার জের ধরে দৃষ্টি হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এহসান রফিক। প্রায় সব ঘটনাতেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হয় খালাস পেয়েছে, নয়তো তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয়নি। পুলিশ প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ, আইন-আদালত সবাই দাঁড়িয়ে গেছে তাদের রক্ষা করতে।

এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে একেকজন রাসেল, ফুয়াদ, অমিত, জিয়ন, আকাশ, বিটু, রাফিদ, সকাল, অনিক কিংবা ইশতিয়াকের মতো দানবরা। বুয়েটের খোলা ওয়েব পেইজ বলছে মার্চ, ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত বুয়েটেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬৬ জন। তার কোনো একটির বিচার হয়েছে বলে জানা যায়নি। এই সব ঘটনাই সাহস জুগিয়েছে এক এক জনকে দানব হতে।

আজকের বাংলাদেশে বিচার পেতে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয় ১. ঘটনাটি হতে হবে অতি আলোচিত ২. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থাকলে ভালো হয় ৩. ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ যেন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান না হয়। এইসব শর্তের বেড়াজালের কারণেই আমরা নুসরাত হত্যার বিচার যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি তনু হত্যার বিচার না হওয়া। দেখেছি সাগর-রুনি হত্যার ১১ বছরেও মামলাটির চার্জশিট পর্যন্ত না আসা। দেখেছি ত্বকী হত্যার বিচার ৮ বছর ঘুমিয়ে থাকা। আজ অবধি মামলাটির চার্জশিটও হলো না।

বাংলাদেশের এই ‘চেরি পিকিং’ ধরনের বিচার প্রক্রিয়ার চিত্র ফুটে ওঠে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সূচকগুলোতে। কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি) বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচক প্রকাশ করেছে। সেখানে ১৩৯টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২৪তম। সাতটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আইনের শাসনের এই সূচক করা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম, নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার প্রয়োগের দিক থেকে ১২২তম, দুর্নীতি না হওয়ার দিক থেকে ১১২তম, ফৌজদারি বিচারের দিক থেকে ১১৭তম, দেওয়ানি বিচার পাওয়ার দিক থেকে ১২৯তম, জননিরাপত্তায় ১১১তম এবং সরকারি তথ্য প্রকাশের দিক থেকে ১০২তম অবস্থানে রয়েছে। এই বিষয়গুলোর পাঁচটিতেই বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে সংস্থাটি জানায়।

আবরার হত্যার রায়ের পরপরই আইনমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ নাকি প্রমাণ করতে পেরেছে দেশে আইনের শাসন আছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, এই রায় বহাল থাকল। সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত, এমনকি কার্যকরও করা হলো তারপরও কি এই একটি মাত্র রায় দিয়ে ঢাকা যাবে অসংখ্য বিচার না পাওয়া মানুষের আহাজারি?

তনু, ত্বকী, সাগর-রুনি, বিশ্বজিৎসহ অসংখ্য পরিবারের বিচার না পাওয়ার ইতিহাস? যে দেশে আইন, আদালত, প্রাতিষ্ঠানিক বিচার কাঠামো থাকার পরও প্রতিটি ঘটনায় আলাদাভাবে বিচার চাইতে হয়, বিচার চাইতে হয় নির্বাহী বিভাগের প্রধানের কাছে, সে দেশে আর যাই হোক, আইনের শাসন আছে দাবি করার আগে ভাবতে হবে।

লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত