‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ দ্রোহ আর ক্ষরণের যুগল স্রোত

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫১ পিএম

নূরুল আলম আতিক বাংলাদেশের টেলিভিশন মিডিয়ায় ভীষণ উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হিসাবে আবির্ভূত হন, দারুণ সব টিভি প্রডাকশন দিয়ে হইচই ফেলে দেন, বিশেষ করে বিদগ্ধ দর্শক আর মননশীল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে,তাই তো নূরুল আলম আতিক হয়ে উঠেন ভিন্ন ধারার গল্প বলা তরুণদের অঘোষিত গুরু। আতিককে ভালোবাসা তরুণের সংখ্যা ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি।

‘ডুবসাঁতার’ দিয়ে বাংলাদেশ পায় জয়া আহসানের মতো মেধাবী অভিনেত্রী। এরপর অনেক অনেক বছর পর আতিকের দ্বিতীয় সিনেমা ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ সরকারি অনুদানের এই সিনেমাটির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলেন দর্শক, অবশেষে গতকাল মুক্তি পেল।

মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সৈয়দপুর এয়ারপোর্টে বন্দী শ্রমিকদের মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন-আহমেদ রুবেল,আশীষ খন্দকার, জয়রাজ, অশোক বেপারি, জ্যোতিকা জ্যোতি, আশনা হাবিব ভাবনা, স্বাগতা, শাহজাহান সম্রাট, দোয়েলসহ আরও অনেকে।

বহুদিন পর বাংলাদেশি কোন সিনেমায় এক সাথে  এত গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী একত্রিত হয়েছেন, এটা নূরুল আলম আতিক বলেই সম্ভব হয়েছে। আপনাকে অন্য সব খামতি ভুলে যেতে হবে এদের দুর্দান্ত অভিনয়ে। চোখ সরিয়ে রাখা মুশকিল। প্রায় সংলাপহীন সারাক্ষণ বিড়বিড় করতে থাকা আশীষ খন্দকার আপনাকে অদ্ভুত এক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে, তার মেয়ের চরিত্রে আশনা হাবিব ভাবনাকে আতিক বেঁধে রেখেছেন আশ্চর্য পরিমিতবোধে, যারা ভাবনার ভয়ঙ্কর সুন্দর দেখছেন তারা জানেন উনি কতটা এলোমেলো হয়ে যেতে পারেন, সেই জায়গা থেকে এই সিনেমায় ভীষণ সুন্দর পারফর্ম করছেন, একটা ছন্দ শুরু থেকে শেষ অবধি ধরে রেখেছেন, তাই তো শেষ দৃশ্যে ওনার অ্যাকশন দর্শককে চেয়ার ছেড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়।

জয়রাজ আমাকে মুগ্ধ করেছেন, কুটিল হিংস্র রাজাকারের ভূমিকায় ছিলেন মেদহীন, একেই হয়তো বলে পরীক্ষিত অভিনেতা। সিনেমা নির্মাতারা প্লিজ ওনাকে কাস্ট করেন, যে কোন চরিত্রে শান দেয়া ছুরির মতো এফোঁড় –ওফোঁড় করে দিবে। অশোক বেপারি বাংলাদেশে অবহেলায় পড়ে থাকা মেধাবী অভিনেতাদের একজন। আর আহমেদ রুবেলকে নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিত, অনেক অনেক কাজ। হুমায়ূন ফরিদীর পর এমন শক্তিমান অভিনেতা খুব বেশি কিন্তু নেই। জ্যোতিকা জ্যোতি- দীপক অধিকারী পরিশীলিত অভিনয় করেছেন। আহমেদ রুবেলের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা দোয়েল দৃষ্টি কেড়েছে। এই সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধ হয় এটাই যে এর কোথাও অতি অভিনয় নেই। পাকিস্তানি অফিসারদের  ভূমিকায় বরাবরই আমরা খাপছাড়া উপস্থিতি দেখে এসেছে,সেই জায়গায় ক্যাপ্টেনের ভূমিকায় শাহজাহান সম্রাট ভালোই সামাল দিয়েছেন।

লাল মোরগের ঝুঁটিতে সম্পাদনা আলাদা করে আমার নজর কেড়েছে, কেননা নূরুল আলম আতিকের এই সাদাকালো সিনেমায় আহামরি কোন আর্ট ডিরেকশন ছিল না, সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট যেভাবে দেখানো হয়েছে তা খুবই অপ্রতুল, দেশত্যাগ ব্যাপারটাও কোনভাবে দেখানো হয়েছে, পোশাকে মনে হয় না আহামরি নজর দেয়া হয়েছে, ছিল না পর্যাপ্ত প্রপস, সেইসাথে ছিল না খুব বেশি সিনেম্যাটিক লং শট, এত কিছুর পরেও সম্পাদক সামির আহমেদ দর্শককে এসব নিয়ে পড়ে থাকতে দেননি। তাই বলে আমি কিন্তু লাল মোরগের ঝুঁটি নিয়ে শতভাগ সন্তুষ্ট নই, যেই নূরুল আলম আতিককে আমরা জানি,তার গল্প বলার ঢং, মেটাফোরিক ট্রিটমেন্ট আর নান্দনিকতার ছন্দ থাকে তা থেকে লাল মোরগের ঝুঁটি বেশ খানিকটা দূরে। সিনেমাটি যখন শেষ হয় তখন ভালো লাগার একটা অনুভূতির সাথে সাথে নূরুল আলম আতিককে অনেকটা খুঁজে না পাওয়ার ভোঁতা একটা কষ্টও রয়ে যায়।   

লেখক: চিত্রনাট্যকার ও  স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত