দেবীদ্বারে বৃদ্ধকে ১০১ দোররা, মাথা ন্যাড়া, জুতার মালা পরিয়ে জরিমানা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৫৩ পিএম

দেবীদ্বারে তিন শিশুর সঙ্গে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে দু’দফা সালিসে ১০১ দোররা, গলায় জুতার মালা, মাথা ন্যাড়াসহ ১০ হাজার টাকার জরিমানা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কুমিল্লা দেবীদ্বার পৌর এলাকায় ওই ঘটনার পর থেকে ওই বৃদ্ধ বাকরুদ্ধ এবং অসুস্থ হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী।

স্থানীয়রা জানান, শনিবার দুপুরে ৭ বছর বয়সী নাতনি সম্পর্কীয় এক শিশুকে ডেকে এনে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে আব্দুল কাদেরের (৬৫) বিরুদ্ধে এসব শাস্তি দেওয়া হয়। এর আগেও ওই বৃদ্ধ একই বাড়ির দুই শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তারা জানান, এ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হলে শনিবার সামাজিক সালিস ডাকা হয়। সালিসে একই বাড়ির চট্টগ্রামে কর্মরত পুলিশ সদস্য মো. ইউনুছ মিয়া, খুলনায় সেটেলমেন্ট অফিসে কর্মরত আব্দুল হাকিম, কৃষক সুলতান আহমেদ, আলমগীর হোসেনর উপস্থিতিতে বৃদ্ধার মাথা ন্যাড়া করে গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে তাকে হুজুরের মাধ্যমে শুদ্ধি করার নামে সোমবার আবারো সালিস ডাকা হয়। সালিসে বারেরা মোল্লা বাড়ির ইমাম মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম এবং বারেরা দাখিল মহিলা মাদ্রাসার সহকারী মৌলভি মো. ইব্রাহীম খলিলসহ দুই হুজুরকে ডাকা হয়।

তারা বলেন, বৈঠকে মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম বৃদ্ধাকে ১০১ দোররা, জুতার মালা গলায় দিয়ে উপস্থিত সবার নিকট কান ধরে ক্ষমা চাওয়ার ফতোয়া দেন। ১০১ দোররা মারার দায়িত্ব মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম নিজ হাতে কার্যকর করেন।

সালিসদার আলমগীর হোসেন বলেন, ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী দোররার ফতোয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ এটা আমার জানা ছিল না। দোররা মারার ফতোয়া কার্যকর করার সময় মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম ১০টি বেত একত্র করে ১০ বার বেত্রাঘাত এবং ১টি বেত দিয়ে একবার বেত্রাঘাতে ওই রায় কার্যকর করেন। তা ছাড়া অভিযুক্তের স্ত্রী মিনুয়ারা বেগমকে দিয়ে মাথা ন্যাড়া করার রায় কার্যকর করা হয়। ১০ হাজার টাকা জরিমানার রায় হলেও তা এখনো কার্যকর করা হয়নি।

অপরদিকে এলাকার বিশিষ্ট সালিসদার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুল হক মোল্লা জানান, বিষয়টা তিনি পরে শুনেছেন। তাকে জানালে তিনি ফতোয়া জারি ও বাস্তবায়নের সুযোগ পেত না। অপরাধ প্রমাণ হলে তাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে পারত। অভিযুক্ত আব্দুল কাদের ৫ ছেলে ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। ২ ছেলে কোরআনে হাফেজ, এক ছেলে প্রবাসী, এক ছেলে প্রতিবন্ধী, এক ছেলে বাড়িতে থেকে কৃষি কাজ করেন। তিন কন্যারই বিয়ে হয়ে গেছে। তার ওপর এমন অমানবিক রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী বিচার আমাদের স্তম্ভিত করেছে।

 এ ব্যাপারে বারেরা দাখিল মহিলা মাদ্রাসার সহকারী মৌলভি মো. ইব্রাহীম খলিল জানান, আমাকে তারা ডেকে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি জানার পর মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম হুজুরকে বলেছি, ফতোয়া এখন রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী, দোররা মারার রায় কার্যকর করা যাবে না। আর যদি ইসলামি শরিয়ামতে বিচার করতে হয়, তাহলে মুফতির নির্দেশনা লাগবে।

বারেরা মোল্লা বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমি ইসলামি শরিয়া মতে সবার উপস্থিতিতে দোররা কার্যকর করেছি এবং তওবা পড়িয়েছি।

অভিযুক্ত আব্দুল কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। বর্তমানে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

দেবীদ্বার থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান জানান, দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরায় বৃদ্ধাকে অনৈতিক কাজের অভিযোগে সামাজিক সালিসে দোররা মাড়া ও  মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় কোন অভিযোগ পাইনি। কেউ যদি অভিযোগ করে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত