বর্তমান উন্নয়নের গতি- প্রকৃতি খুবই গতানুগতিক যাকে আধুনিক বলতে অস্বস্তি হয়। ‘সহজ, টেকসই ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা’ শীর্ষক সেমিনারে এই অভিমত জানিয়েছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন পরামর্শক অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক।
তিনি বলেন, ‘গ্র্যামার (ব্যাকারণ) দিয়ে তাকালেই দেখা যাবে আমাদের উন্নয় খুব ট্র্যাডিশনাল (গতানুগতিক ) হয়ে যাচ্ছে যা আধুনিক না।’
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে আয়োজিত এই সেমিনারে যোগ দিয়ে প্যানেল আলোচক হিসেবে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, ‘দুই এর জায়গায় চার লেন; চারের জায়গায় ছয় লেন করছেন কিন্তু রাস্তার মোড়ে গিয়ে আমরা আটকে যাই । মোড় রেখে দিয়ে যদি রাস্তা আরও চওড়া করি যানজট আরও বেশি লাগবে। বিজ্ঞান তাই বলে।’
শামসুল হক বলেন, ‘দ্রুতগতি আমরা হজম করতে পারছি না; প্রতিটা দুর্ঘটনা মানে একটা গতিরোধক।’ ভারী অর্থনীতির কথা আমরা বলছি ভারী অর্থনীতির দর্শন হচ্ছে একটা রাস্তা আমরা বানাবো দশটা রাস্তার প্রোডাক্টিভিটির সমান পাবো; দর্শনটা হতে হবে এরকম।’
ইটনা-মিঠামইন হাওরের তৈরী রাস্তা খুটি দিয়েও করা যেত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি কিন্তু শাসন মানতে চায় না। লাগসই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে টেকসই উন্নয়ন করতে হবে।’
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত যে যোগাযোগ ব্যবস্থা পেয়েছিলেন সেখান থেকে নৌ, রেল, সড়ক এই যে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে তিনটি মাধ্যমকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
দাতা গোষ্ঠী এমনিতেই ঋণ দেয় না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তার পিছনে কিছু লুকায়িত শর্ত থাকে।’
দেশের রোড ট্র্যাফিক সিস্টেম অনেক জটিল জানিয়ে তিনি বলেন, বাইরের ধার করা জ্ঞানে আমি টেকসই উন্নয়ন করবো; আমার বিশ্বাস হবে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদটা আমাদেরই তৈরি করতে হবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক যে পরিবর্তন হচ্ছে তার কেন্দ্র হচ্ছে অবকাঠামো পরিবর্তন পরিকল্পনা বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
তিনি বলেন, ‘অবকাঠামো প্রকল্প আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই গুরুত্ব দেন। আমাদের অলিখিত একটা বোঝাপড়া আছে, কিছু বিষয় সামনে নিয়ে আসতে হবে। সড়ক অবকাঠামো, বিদ্যুৎঅবকাঠামো এবং জলপথের অবকাঠামো এই সকলের সমন্বয়ে দেশের জন্য বিশাল সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে উঠবে যা উন্নত বিশ্বে দেখা যায়।’
সড়কের কোন প্রকল্পে একনেকে ৫ থেকে ৭ মিনিটের বেশি সময় লাগে না বলে যোগ করেন তিনি।
সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আপনাদের আমরা আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আপনাদের সাহায্যকারী সংস্থা হিসেবে বন্ধুর মতো কাজ করে যাব। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে আপনারা বন্ধু এবং সহকর্মীর মতো দেখবেন। যারা আপনাদের পাশে দাঁড়িয়ে আপনাদের সহযোগিতা করবে। বাইরে যখন আমরা কথা বলি আপনাদের অমারা ওপরে তুলে ধরি।’
ঢাকা শহরের ট্র্যফিক সিগন্যালের সমালোচনা করে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘লাালবাতি চললে বলতেছে যান আবার সবুজ বাতি চলরে বলছে দাঁড়ান এই যে অদ্ভুত ঘটনা ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত ঘটছে আমরা কিন্তু এগুলো কেউ দেখি না।’
তিনি বলেন, পৃথিবীর এমন একটি রাষ্ট্র দেখাতে পারবেন যে রাষ্ট্রে রাজধানীতে বাসে চামড়া নাই মাংস নাই হাড্ডি নাই সেই বাসগুলো চলছে। পৃথিবীর কোথাও কি দেখাতে পারবেন একই প্রতিষ্ঠানের দুটি বাস একই নামের একই রঙের বাস প্রতিযোগীতা করেছে ঢাকার রাস্তায় মানুষ মেরে ফেলছে যাতে একজনের থেকে বেশি আরেকজন আয় করতে পারে। আমরা সমাধান করতে পারি নাই।
তিনি বলেন, ‘বিআরটিএর হিসেব মতে, তাদের হিসেবে বাংলাদেশে যতগুলো বাস–ট্রাক রয়েছে তার অর্ধেক হলো লাইসেন্সড ড্রাইভার। তাহলে বিআরটিএ কি অনুমতি দিয়ে দিলো লাইসেন্স ছাড়াই বাংলাদেশে বাসগুলো চালানো যাবে। এগুলো প্রতিষ্ঠানের হিসেব।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর প্রায় ১১টি ড্রাইভার ট্রেনিং সেন্টার ছিল এখন ২টিতে নেমে এসেছে। এই যে সমন্বয়হীনতা এই অস্বাভাবিক ঘটনা যেগুলো চিন্তা করা যায় না।’
মেট্রোরেলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেল ইউনিক একটি কাজ। স্টেশনগুলো অপূর্ব হচ্ছে । কিন্তু কখনো কি শুনেছেন প্রতি তিন মিনিটে দুইশত থেকে চারশত লোক ওঠা-নামা করবে এই ছোট্ট তিনফিট ফুটপাতের উপরে। যেখানে একটি এক্সেলেটার থাকবে সিঁড়ি থাকবে। ফিনিশিং কাজ হচ্ছে প্রতি তিন মিনিট পর পর অসংখ্য লোক এখানে আসবে প্রত্যেকটি মেট্রোরেলের স্টেশনে ৫ হাজার স্কয়ারফিট উন্মুক্ত জায়গা রাখতে হবে। এখন রাখার চেষ্টা চলছে। জাপান থেকে বিশেষজ্ঞ এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করছে। অর্থাৎ এক টাকার কাজ ১ কোটি টাকা দিয়ে ওই জায়গা এখন অধিগ্রহণ করতে হবে। এখন বলেন এই সমন্বয় সম্পর্কে কি বলব?’
বিআরটিসি বাস দিনে দুই বেলা ডিউটি করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সকালে উঠে হাইকোর্টে গিয়ে দেখবেন কতগুলো বিআরটিসির বাস ঘুমাচ্ছে। কার্জন হলের পাশে কয় শ বিআরটিসি বাস দাঁড়িয়ে । অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াতে কোনো সমস্যা নাই। কার স্বার্থ রক্ষার জন্য জনগণের পয়সায় কেনা বাস দিনে দু’বার ডিউটি করে বাকি বাসগুলো কাদের তাকিয়ে দেখেন। সমন্বয় না থাকলে যে কাজই করেন তা ব্যর্থ হবে।’
সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) রাষ্ট্রদূত মাসফি বিনতে শামস।
