টাকা না পেলে ওসি প্রদীপের কাছে ক্রসফায়ার ছিল ‘ডালভাত’

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:১০ পিএম

টেকনাফের সাবেক ওসি এবং মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রদীপের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত আরও নয়টি মামলার খবর পাওয়া গেছে৷ প্রদীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ, টাকা না পেলে তার কাছে ক্রসফায়ার ছিল ‘ডালভাত’।

সোমবার সকালে ওসি প্রদীপের ফাঁসি চেয়ে করা মানববন্ধনেও একই অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, ওসি প্রদীপ ১৪৫টি ক্রসফায়ার দিয়েছেন। অনেকের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন।

স্থানীয়রা আরও জানিয়েছেন, ওসি প্রদীপের সময়ে প্রত্যেকদিনই লাশের মিছিল চলতো। থানার সামনে স্বজনদের কান্নার রোল লেগেই থাকতো। ওসি প্রদীপরে প্রত্যাহারের পর সেই ক্রসফায়ার নাই হয়ে গেছে।

ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে হওয়া অন্য ৯টি মামলার তেমন তোড়জোড় নেই। শুধু সিনহা হত্যা মামলার ক্ষেত্রেই তোড়জোড় দেখা গেছে। ওই মামলাগুলো হয়েছে আদালতে৷ আদালত আবার সংশ্লিষ্ট থানাকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে৷ তাই সিনহা হত্যার বাইরে ওই মামলাগুলোর তদন্ত আদৌ সঠিক ও দ্রুতগতিতে হবে কিনা এ নিয়ে সংশয় আছে।

ওসি প্রদীপের মামলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘মামলা মামলার গতিতে চলবে।’

সিনহা হত্যা মামলার মোড় ঘোরার পর সাবেক ওসি প্রদীপের নামে মামলাগুলো হতে শুরু করে।

প্রদীপের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা করেছেন রিনাত সুলতানা শাহিন নামে একজন। তিনি বাদী হয়ে চট্টগ্রামের আদালতে ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেছেন৷

মামলায় অভিযোগ করেছেন, টাকা না পেয়ে বাদীর দুই ভাই আমানুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক ও আজাদুল ইসলাম আজাদকে ক্রসফায়ারে হত্যা করেন প্রদীপ। ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই রাতে চন্দনাইশ এলাকা থেকে আজাদকে গ্রেপ্তার করে টেকনাফ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়৷ ১৫ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় তার বড় ভাই ফারুককে৷ এরপর আট লাখ টাকা দাবি করা হয় ছেড়ে দেয়ার জন্য৷ টাকা দিতে না পারায় ১৬ জুলাই সকালে ওসি প্রদীপ ফোন করে তাদের লাশ নিয়ে যেতে বলেন৷ এদের মধ্যে ফারুক একটি মাদক মামলার আসামি ছিলেন এবং মোবাইল ফোন মেরামতের ব্যবসা করতেন৷ আর তার ছোট ভাই আজাদ বাহরাইন প্রবাসী ছিলেন৷ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন৷

এর আগে ওইদিনই কক্সবাজার আদালতে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আরো দুইটি হত্যা মামলা করা হয়৷ কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নে মুছা আকবর ও সাহাব উদ্দিন নামে দুই যুবককে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে মামলা দুটি করা হয়৷

মুছা আকবর হত্যা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টেকনাফ থানা-পুলিশের বিরুদ্ধে ঘর পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করায় গত ২৮ মার্চ রাতে পুলিশ মুছাকে তুলে নিয়ে যায়৷ এরপর ২০ লাখ টাকা দাবি করা হলে তার পরিবার তিন লাখ টাকা দেয়৷ তারপরও ভোরে মুছাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়৷

অন্যদিকে নিহত সাহাব উদ্দীনকে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল টেকনাফ থানা-পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়৷ ক্রসফায়ার থেকে বাঁচতে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় ৷ তার পরিবার ৫০ হাজার টাকা দিতে পারে৷ পুরো টাকা না পেয়ে ২০ এপ্রিল রাতে সাহাব উদ্দীনকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে৷

প্রদীপ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও রয়েছে একটি৷ দুদক চট্টগ্রামে ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয় ২৩ আগস্ট৷ এই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে তিন কোটি ৯৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে৷

সিনহা হত্যা মামলার আগে কেন মামলা হয়নি- এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিনহা হত্যার তদন্ত এবং ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীরা গ্রেপ্তার হওয়ায় মানুষ মনে করছে সরকার তার অপকর্মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে৷ তাই যারা প্রদীপের অপকর্মের শিকার হয়েছেন তারা সাহস করে মামলা করছেন। এখন এই মামলাগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা আরো দৃঢ় হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম জানান, ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত