প্রাকৃতিক কৃষির রূপকার মাসানোবু ফুকুওকা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৫৩ এএম

বিশ্বব্যাপী বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে উচ্চফলনশীল জাত, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা ও পরিবেশগত বিপর্যয়। প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষির বিপরীতে গত শতকে তাই শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক কৃষি দর্শনের চর্চা। এর পুরোধা ছিলেন মাসানোবু ফুকুওকা। লিখেছেন বিপুল জামান

শৈশব

মাসানোবু ফুকুওকা জাপানের মাতসুয়ামা শহরের ষোল মাইল দূরে ইয়ো নামক এক মফস্বল শহরতলিতে জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে। ইয়ো শহরে ফুকুওকা পরিবারের স্থায়ী বাস শত বছর ধরে। শিক্ষিত, সচ্ছল ও অভিজাত পরিবার হিসেবে সমাদৃত তারা। মাসানোবুর বাবা কামেইচিসি ফুকুওকা ছিলেন নগরপ্রধান। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন যা ছিল সে সময়ে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। মা শাচিএ ইশসিকি ছিলেন সামুয়াই বংশোদ্ভূত, শিক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী। শৈশবেই বাবার দৃঢ় মনোবল আর মায়ের আত্মমর্যাদার গুণ আয়ত্ত করেন মাসানোবু। ফুকুওকা পরিবারে অকারণ বিলাসিতার প্রচলন ছিল না। মাসানোবু ইয়োর স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য মাতসুয়ামা শহরে যান। আত্মজীবনীতে তিনি স্মরণ করেছেন, তিনি ছিলেন অনগ্রসর ছাত্রদের অন্যতম। সে কারণে শিক্ষকরা তাকে বিশেষ স্নেহ করতেন না। পড়াশোনার বাঁধাধরা নিয়ম ভালো লাগত না বালক মাসানোবুর। তার ভালো লাগত সাহিত্যের শিক্ষকের সহজ-সরল জীবনদর্শনের কথা। তিনি বলতেন, ‘জীবনে পাঁচজন বন্ধু তৈরি করো যারা তোমার মৃত্যুতে কাঁদবে।’ সাহিত্যের শিক্ষকের কথায় তার প্রত্যয় জন্মায় যে, সুখী জীবনযাপন করতে বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই।

উচ্চশিক্ষা ও চাকরি

মাসানোবুর পরিবার ছিল কৃষিভিত্তিক পরিবার। পরিবারের হাল ধরার জন্যই তাকে গিফু কৃষি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এ সময় মাঞ্চুরিয়ানরা জাপান আক্রমণ করে। মাসানোবুসহ মহাবিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে সে সময় বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

গিফু মহাবিদ্যালয়ে মাসানোবু অধ্যাপক মাকাতো হিউরার অধীনে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্নাতক পাস করার পর অধ্যাপক মাকাতো হিউরা তাকে ওকায়ামা কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। পরে ইয়োহামা শুল্ক দপ্তরে উদ্ভিদ পরিদর্শক বিভাগে চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন।

এই বিভাগের কাজ ছিল আমদানিকৃত উদ্ভিদের গুণাগুণ যাচাই করা। গাছের গুণাগুণ বিচার ও শহুরে জীবনযাপন করে ভালোই সময় কাটতে থাকে তার। এভাবে পার হয় দুই বছর। তৃতীয় বছরে মাসানোবু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। সংক্রামক রোগ ভেবে শহুরে বন্ধুরা তাকে পরিত্যাগ করে। তার দিন কাটতে থাকে একাকী, অপরিচ্ছন্ন হাসপাতালের নির্জন, শীতল প্রকোষ্ঠে। তার জন্য নির্ধারিত ঘর এমনই ঠা-া ছিল যে, দায়িত্বরত সেবিকারাও তার শরীরের উষ্ণতা পরীক্ষা করে মূহূর্তমাত্র অপেক্ষা না করে পালিয়ে যেত। তিনি একাকী মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তার বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর।

মৃত্যু থেকে ফিরে আসা

বেশ কিছুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মাসানোবু অবশেষে সুস্থ হন। হাসপাতাল ত্যাগ করার পর থেকেই তার মন বিক্ষিপ্ত থাকত সবসময়। কাজে মন নেই। ভাবেন, এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? এক রাতে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন ইয়োকোহামা পাহাড়ের চূড়ায়। সম্বিত ফিরে পেতে তাকালেন নিচে, খাদের দিকে। ভাবলেন, যদি এখান থেকে পড়ে যাই, মরে যাই তাহলে কী হবে? আমার মা অবশ্যই কাঁদবেন, কিন্তু আর কে কাঁদবে? সাহিত্যের শিক্ষকের সেই কথাটি মনে পড়ল, পাঁচজন বন্ধু তৈরি করো যারা তোমার মৃত্যুতে কাঁদবে। তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেও পাঁচজন বন্ধুকে খুঁজে পেলেন না যারা তার মৃত্যুতে কাঁদতে পারে। বিগত জীবন সম্পর্কে এমন নিদারুণ রূঢ় উপলব্ধি তাকে বিমূঢ় করে দিল। তিনি পাহাড়ের পাদদেশে একটি এলম গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়লেন।

সারসের শব্দে পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙল। কুয়াশা ভেদ করে তিনি দেখলেন সূর্যের আভা। পাখিরা গান গাইছে। তবু সবকিছু ছাপিয়ে মাসানোবুর মনে হলো, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই নেই। মানুষের কিছু করার নেই। কিছু করতে যাওয়া মানে হলো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা মাত্র। তিনি পরে লিখেছেন, তার মনে হয়েছিল তিনি যে সমস্ত ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন তা ছিল নিছক মনগড়া। সেদিন সকালে যেন তার সমস্ত যন্ত্রণা, স্বপ্ন আর বিভ্রম অদৃশ্য হয়ে গেল, যাকে ‘প্রাকৃতিক সত্য’ বলা যেতে পারে তা প্রকাশিত হলো।

নবজীবন

নতুন এই উপলব্ধির পরে তার পক্ষে সম্ভব হলো না পুরনো যাপিত জীবনে ফিরে যাওয়া। পরদিন মাসানোবু চাকরি ছেড়ে দিলেন এবং লক্ষ্যহীন এক জীবনের পথে যাত্রা শুরু করলেন। ঘুরে বেড়াতেন লাগলেন টোকিও, ওসাকা, কোবে, কায়টো আর ক্যায়ুসুর পথে, জনপদে। ঘুরে ঘুরে তিনি তার এই নতুন উপলব্ধির কথা সবাইকে বলতে লাগলেন। যদিও অন্যরা তার কথাকে তেমন পাত্তা দিল না। অপ্রকৃতিস্থ, খামখেয়ালি বলে তার কথাকে উড়িয়ে দিল। অবশেষে তিনি ফিরে এলেন বাড়িতে, মা-বাবার কাছে। বাবার আশ্রয়ে শুরু করলেন নতুন উপলব্ধি অনুযায়ী জীবনযাপন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

কামেইচিসি ফুকুওকা ছেলেকে দায়িত্ব দিলেন পাহাড়ে কমলা চাষের তদারকির। মাসানোবু কমলা বাগানকেই বেছে নিলেন তার পরীক্ষা চালানোর জায়গা হিসেবে। চাষের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তিনি কিছুই করলেন না। গাছগুলোর চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করলেন না, ডালপালা ছেঁটে দিলেন না, সার দিলেন না, জমিতে লাঙল দিলেন না। গাছগুলোকে বেড়ে উঠতে দিলেন অযতেœ, পরিচর্যাহীনভাবে। সম্পূর্ণ নতুন, অপ্রত্যাশিত এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে কমলা বাগানের সমস্ত গাছ মরে গেল। ঘটনা জানাজানি হলে মাসানোবুর বাবা মনঃক্ষুণœ হলেন। তাছাড়া নগরপ্রধানের ছেলে পাহাড়ে নির্জনবাস করছে এটা বাবা কামেইচিসির জন্য সম্মানজনক ছিল না। কিছুদিন পরে মাসানোবু রোগ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান হওয়ার আমন্ত্রণ পান। বাবার ইচ্ছানুসারে তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

কোচিতে মাসানোবু ফুকুওকা এবং তার সহকর্মীদের কাজ ছিল বৈজ্ঞানিক কৃষিতে অগ্রগতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কৃষকদের আধুনিক চাষের পরামর্শ দিলেও ফুকুওকা তার নিজস্ব উপলব্ধিগত গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তিনি কম্পোস্ট, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ছাড়া উৎপন্ন ফসলের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষকৃত ফসলের ফলনের তুলনা করেন। তিনি দেখেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে যে ফলন পাওয়া গেছে তা এসব ব্যবহার না করে যে ফলন পাওয়া গেছে তার থেকে খুব বেশি না। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যয় হিসাব করলে দুই পদ্ধতির ফলন সমান। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অধিক ফলন দিতে পারে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাদের পারিবারিক জমির তিন ভাগের দুই ভাগই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এই অল্প জমিতেই তিনি প্রাকৃতিক কৃষি শুরু করেন। পরের কয়েক বছর তিনি লক্ষ করতে থাকেন তার ছোট খামারে কোন কোন উদ্ভিদ ও প্রাণী

প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। সেসব উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ করে বীজগুলোকে মাটি ও প্রাণিজ বর্জ্যরে সাহায্যে ছোট ছোট বল তৈরি করতেন। এগুলো ছড়িয়ে দিতেন জমিতে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন প্রাকৃতিক কৃষির নিয়ম।

ক. প্রকৃতি নিজে নিজেই আবাদ করে। বৃক্ষ বা চারাগাছের শেকড়, পোকামাকড় আর ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ারাই যেটি করতে পারে, আলাদাভাবে মানুষের সেটি করার দরকার নেই। মাসানোবুর প্রাকৃতিক কৃষির প্রথম সূত্র হলো, মাটিতে লাঙল চালানো যাবে না।

খ. মাসানোবু লক্ষ করেন, সারের প্রয়োজন তখনই হয় যখন মাটির প্রাকৃতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এই ক্ষমতা কোনো সারেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এমনকি হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বা কম্পোস্ট সারও খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। তার কৃষির দ্বিতীয় সূত্র হলো, কোনো রাসায়নিক বা কম্পোস্ট সার ব্যবহার করা যাবে না।

গ. ফুকুওকা লক্ষ করেন, যখন তিনি লাঙল চাষ বন্ধ করেন, তখন আগাছার সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়। লাঙল আসলে গভীরভাবে পড়ে থাকা আগাছার বীজকে আলোড়িত করে এবং তাদের অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ দেয়। লাঙল দিলেই যে আগাছা নির্মূল হবে এমন নয়। রাসায়নিক ভেষজনাশকও আগাছার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শক্তি নয় কারণ তা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মাটি ও পানিকে বিষিয়ে ফেলে। সহজ উপায় হলো, আগাছা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার চেষ্টা না করা। সদ্য বপন করা জমিতে খড় বিছিয়ে আগাছা সফলভাবে দমন করা যায়। তার তৃতীয় সূত্র হলো, আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে লাঙল দিয়ে চাষ বা আগাছানাশক ব্যবহার করা যাবে না। খড় বিছিয়ে দিলেই আগাছা মাড়িয়ে নতুন চারাগাছ উঠবে।

ঘ. ফুকুওকার চতুর্থ সূত্র হলো, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। কীটপতঙ্গ ফসলের ক্ষতি করলেও কীটনাশক ছেটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কীটনাশক কীট নিয়ন্ত্রণে স্বল্প সময়ে ফল দিলেও তা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদে জমির ক্ষতিই করে।

প্রাকৃতিক কৃষির এই সূত্র অবলম্বন করে তিনি কাক্সিক্ষত ফল পান। তিনি লক্ষ করেন এর ফলে মাটির গুণাগুণ যেমন বছরের পর বছর অক্ষুণœ থাকছে তেমনি ফলনেও কোনো তারতম্য ঘটছে না। ফসলও অন্য যেকোনো পদ্ধতিতে চাষকৃত ফসলের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু।

দর্শন

মাসানোবু ফুকুওকা তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান নিজের কাছে গোপন করে রাখেননি। বই, গান, শ্লোক ইত্যাদি রচনা ও পরিবেশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন অন্যদের মধ্যে। প্রাকৃতিক

কৃষি নিয়ে তার বই ‘দ্য ওয়ান-স্ট্র রেভুল্যুশন : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ন্যাচারাল ফার্মিং’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে, জাপানি ভাষায়। একই বছরে ‘দ্য ন্যাচারাল ওয়ে অফ ফার্মিং- থিওরি অ্যান্ড প্রাকটিস অব গ্রিন ফিলোসফি’ বইটির জাপানি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে কৃষিচিন্তার জগতে দারুণ আলোড়ন ওঠে। কৃষি সম্পর্কে প্রচলিত সব ধারণা ভেঙে পড়ে। কৃষি গবেষকদের কৌতূহল মেটাতে তিনি ছুটে গেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদার কারণে ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় বইটিও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। বইটি সমালোচিতও হয়েছিল। বই দুটি পাঠের পর জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির বিপরীতে চাষহীন এই কৃষিব্যবস্থা বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে আদৌ সক্ষম কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কৃষি গবেষকরা।

১৯৭৯ সাল থেকে, ফুকুওকা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন, বক্তৃতা করেছেন তার দর্শন, জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন খামার, নিউইয়র্ক শহর ও তার আশপাশের এলাকা যেমন ম্যাসাচুসেট্সের আমহার্স্ট কলেজ ও বস্টন ইত্যাদি শহরে ভ্রমণ করেন। শুধু

বক্তৃতার মধ্যেই তার কাজকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে সে দেশের কৃষি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন আর সে দেশের ঊষরভূমিকে সবুজ করতে ছড়িয়ে দিয়েছেন বীজ। ১৯৮৩ সালে, বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজন, কৃষকদের শিক্ষাদান ও বীজ বপনের উদ্দেশ্যে ৫০ দিনব্যাপী ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ১৯৮৫ সালে, বীজ বপনের জন্য তিনি সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়ার মরুভূমি এলাকায় ৪০ দিন কাটান। পরের বছর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতির ওপর বক্তব্য প্রদান করেন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘দ্য রোড ব্যাক টু ন্যাচার-রিগেইনিং দ্য প্যারাডাইস লস্ট’ বইটি। ১৯৮৮ সালে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস, রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য জায়গায় বক্তৃতা প্রদান করেন।

তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন বীজ পাঠাতেন তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের বীজ সংগ্রহও করতেন। ফুকুওকা ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে বিভিন্ন খামার পরিদর্শন ও ভারতের মরুভূমি অঞ্চলে চাষের জন্য বীজ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডে যান। সংগৃহীত বীজ নিয়ে সে বছরের নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসে তিনি পুনরায় ভারত ভ্রমণ করেন। পরের বছর তিনি জাপানের একটি আনুষ্ঠানিক সভায় অংশগ্রহণ করেন যা ব্রাজিলের রিওতে অনুষ্ঠিত আর্থ সামিটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে তিনি আফ্রিকার তানজানিয়ার মরুভূমি এলাকায় বীজ বপন করেন, বাওবাব গাছ ও জঙ্গল এলাকা পরিদর্শন করেন। এছাড়াও তিনি ফিলিপাইন, গ্রিস, ইউরোপ, চীন ভ্রমণ করেন।

২০০২ সালে তিনি পুনরায় ভারত ভ্রমণ করেন। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলেন, ঊষর মরুতে সবুজায়নের অভিযানে যে জ্ঞান অর্জন করেন তার ওপর ভিত্তি করে লেখেন তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘সয়িং সিডস ইন দ্য দেজার্ট’। প্রাকৃতিক কৃষি বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না সে প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি এ বইতে। তিনি এ বইতে বলেন, অল্প জায়গায় অধিক শস্য ফলানোর চেষ্টার মাধ্যমে নয় বরং ঊষর জমিকে প্রাকৃতিক কৃষির মাধ্যমে সবুজায়নের ফলে এই চাহিদা পূরণ হতে পারে।

পুরস্কার

কৃষি, জনসেবা ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় অবদানের জন্য মাসানোবু ফুকুওকা সম্মানিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। ১৯৮৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় মাসানোবু ফুকুওকাকে সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দেশিকোত্তম’ পুরস্কারে ভূষিত করে। একই বছর তিনি লাভ করেন এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত ফিলিপাইনের র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার। ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে, টেকসই উন্নয়নে অবদানের জন্য আর্থ সামিট প্লাস ফাইভ ফোরামে তাকে আর্থ কাউন্সিল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

প্রাকৃতিক কৃষির রূপকার হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এই জাপানি কৃষিবিদ ও দার্শনিক ২০০৮ সালের ১৬ আগস্ট ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত