পাকিস্তানে কাজিনদের মধ্যে বিয়েতে জন্ম দিচ্ছে অসুস্থ শিশু

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:১০ পিএম

পাকিস্তানে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের ঘটনায় দেশটিতে অসুস্থ শিশু জন্ম নিচ্ছে। বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনসহ নানারকম উদ্যোগ নিয়েও দেশটিতে এ ধরনের বিয়ে কমানো যাচ্ছে না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাচাতো, ফুপাতো, মামাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ের কারণে প্রতিবন্ধিতা, রক্তের জটিল সমস্যা, অন্ধত্ব, কানে না শোনার মতো নানা রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে শিশু।

জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের অনেক জায়গায় পরিবারের বাইরে বিয়ে করলে সমাজচ্যুত হতে হয়।

গফুর হুসেইন শাহ একজন শিক্ষক জানান, ১৯৮৭ সালে বিয়ে করেছিলেন মামাতো বোনকে। তার আট সন্তানের মধ্যে তিনজনই অসুস্থ। তার এক ছেলের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ হয়নি, এক মেয়ে ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না, অন্য এক মেয়ে একদমই কানে শোনে না।

তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ৫৬ বছর বয়সী শিক্ষক গফুর হুসেইন শাহ বলেন, ‘আমার আফসোস ওরা লেখা লেখাপড়াই করতে পারল না। এখন সব সময় শুধু একটা কথাই ভাবি- আমি আর আমার স্ত্রী যখন থাকব না, তখন কে দেখবে ওদের!’

শিক্ষক হয়ে, সমাজের সচেতন অংশের নাগরিক হয়েও তাহলে কেন মামাতো বোনকে বিয়ে করলেন? গফুর হুসেইন শাহ জানালেন, সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল তাকে।

গফুর হুসেইন শাহ যে নিজেই শুধু মামাতো বোনকে বিয়ে করেছেন তা-ই নয়। তিনিও তার এক ছেলে আর দুই মেয়েকে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গেই বিয়ে দিয়েছেন।

চিকিৎসকেরা বলেছেন, ফুপাতো ভাই- মামাতো বোনের বিয়ের কারণেই গফুর হুসেইন শাহর তিনটি সন্তান জটিল শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মেছে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হুমা আরশাদ চিমা বলেন, চাচাতো, ফুপাতো, মামাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ের কারণে প্রতিবন্ধিতা, রক্তের জটিল সমস্যা, অন্ধত্ব, কানে না শোনার মতো নানা ধরনের রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য শিশু। এ ধরনের বিয়ের ফলে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি শিশু জন্ম নিচ্ছে।

পাকিস্তানের বেশ কিছু এলাকার উপজাতীয়দের মধ্যে বিয়ে মানেই আন্তঃপরিবার বিয়ে। তারা মনে করেন, পরিবারের মধ্যে বিয়েই ইসলামসম্মত। তাই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা অনেক চেষ্টা করেও এ ধরনের বিয়ের ঝুঁকির দিকটা কাউকে বোঝাতে পারেন না।

করাচির ডা. সিরাজ উদ-দৌলাহ এ বিষয়ে কয়েকজন মাওলানার সহায়তাও চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি মাওলানাদের বলেছিলাম জেনেটিক কিছু রোগের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোয় ভূমিকা রাখতে। কিন্তু মাওলানারা মনে করেন, এ ধরনের বিয়ে শরিয়া আইনসম্মত, তাই এর বিরুদ্ধে কথা বলা সম্ভব নয়।’

জার্মানির জেন্টোজেন ডায়াগনোস্টিকসের সহায়তায় ২০২০ সালের মার্চ মাসে বংশানুক্রমিক রোগের বিস্তার রোধের জন্য এক বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্য সরকার। লাহোরের শিশু হাসপাতালগুলোতে দেয়া হয় বিনা খরচে ‘জেনেটিক স্ক্রিনিং’-এর সুযোগ।

এই উদ্যোগের ফলে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ এক তথ্য। পাঞ্জাব স্বাস্থ্য বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘এ পর্যন্ত আমরা ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে জেনেটিক ডিসঅর্ডারের আলামত পেয়েছি।’

ডা. সিরাজ উদ-দৌলাহ মনে করেন, আন্তঃপরিবার বিয়ে ব্যাপক হারে চলতে থাকলে সমস্যা খুব দ্রুত আরও খারাপ হবে আর সেই আশঙ্কা দূর করতে হলে ধর্মীয় নেতাদের সহায়তা চাইতে হবে সরকারকে৷

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত