ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা সামরিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মুখোশ খুলে গেছে বলে মনে করে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
বিবৃতিটি ঢাকার রুশ দূতাবাস গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রচার করেছে।
এতে বলা হয়, অনেক বছর ধরে ইইউ নিজেকে শান্তির প্রবক্তা হিসেবে জাহির করে আসছে। এ জোট ইউক্রেনের সরকারকে সমর্থন ও অর্থায়ন করেছে। অথচ দেশটির সরকার সংবিধানবিরোধী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। দোনবাসে যখন মানুষ নির্মূল করা হচ্ছিল, ইউক্রেনে যখন রুশ ভাষাকে স্তব্ধ করা হচ্ছিল, তখন ইইউ চুপ ছিল।
ইউক্রেনের সরকারি কর্তৃপক্ষে নাৎসিদের প্রাধান্য নিয়ে ইইউ নিশ্চুপ ছিল। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনের ওপর আর্থসামাজিক অবরোধ আরোপ ও হত্যার বিষয়টি আমলে নেওয়ার জন্য রাশিয়া বারবার আহ্বান জানালেও ইইউ তা আমলে নেয়নি বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইইউ মিনস্ক চুক্তি বাস্তবায়নের শর্ত দিয়েছে। কিন্তু এ চুক্তির প্রধান ধারাগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করতে ইউক্রেনকে উৎসাহিত করার জন্য ইইউ কিছুই করেনি। এর বিপরীতে ইইউ ইউক্রেনকে অর্থ দিয়েছে। দেশটির নাগরিকদের ভিসামুক্ত ভ্রমণসুবিধা দিয়েছে। কল্পনাপ্রসূত অজুহাতে রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়েছে। ইউরোপীয় এ জোট ইউক্রেনে যেসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, তা রাশিয়ান ফেডারেশনের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ইস্যুতে এখন ইইউর মুখোশ খুলে গেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইইউ নিজের চেহারা নিজেই উন্মোচন করেছে। ইইউ চূড়ান্তভাবে কিয়েভের সেই সরকারের পক্ষ নিয়েছে, যারা (কিয়েভ সরকার) নিজেদের জনগণের অংশবিশেষের বিরুদ্ধে গণহত্যার নীতি পরিচালনা করেছে।
সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কাকে সরবরাহ করা হবে আর কাকে করা হবে না, সেটা নিয়ে ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর ইইউ নিজেই আটটি নির্ণায়ক নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে ইইউ নিজের নির্ধারণ করা এসব নিয়ম ভেঙেছে। নিয়মগুলো হলো:
১. যদি দেশটি আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ না করে, তবে সেই দেশটিকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে না। অথচ ইউক্রেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২২০২ নম্বর রেজল্যুশন অনুযায়ী নির্ধারিত মিনস্ক চুক্তিতে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি।
২. যদি দেশটি মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ না করে এবং সরবরাহ করা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম অভ্যন্তরীণ দমন–পীড়নে ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে, তাহলে ওই দেশ ইইউর কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাবে না। অথচ দোনবাসে নিজেদের জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে কিয়েভ।
৩. যদি সশস্ত্র সংঘাত চলমান থাকে এবং সরবরাহ করা অস্ত্র সরঞ্জাম ওই সংঘাত ও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়, তবে ওই দেশ ইইউর কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাবে না।
৪. যদি ইইউর সরবরাহ করা অস্ত্র সরঞ্জাম আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা ভঙ্গের কারণ হয় এবং অস্ত্র সরঞ্জাম গ্রহণকারী রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত থাকে, তাহলে ওই দেশ ইইউর কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাবে না।
৫. যদি সরবরাহ করা অস্ত্র সরঞ্জাম ইইউর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয় কিংবা ইইউর সদস্যেদর স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে, সে ক্ষেত্রে ইইউ সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ থেকে বিরত থাকবে।
৬. যদি ক্রেতা কিংবা গ্রহীতা দেশের উদ্দেশ্য ও নীতি নিয়ে সন্দেহ রয়ে যায়, বিশেষত সামরিক শক্তি ব্যবহার না করা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুতির ঝুঁকি থাকে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না ইইউ। কিয়েভ এসব প্রতিশ্রুতি থেকে আগেই বিচ্যুত হয়েছে।
৭. যদি সরবরাহ করা সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সন্ত্রাসী সংগঠনসহ অবাঞ্ছিত কোনো ব্যক্তি–সংগঠনের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশকে তা সরবরাহ করবে না ইইউ। ইউক্রেনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বেহাত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
৮. যদি সরবরাহ করা সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম গ্রহীতা দেশের সামরিকায়ন ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের মধ্যকার ভারসাম্য বিনষ্টের কারণ হয়, তাহলে তা সরবরাহ থেকে বিরত থাকবে ইইউ। এ পরিস্থিতিতে কিয়েভের উচিত ভিন্নমত দমনের চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেওয়া।
রাশিয়া সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র, জ্বালানি ও লুব্রিকেন্ট সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ইইউর নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান চলমান বিশেষ সামরিক অভিযানের সময় এসব কর্মের যেকোনো পরিণতির জন্য দায়ী থাকবে। তাই পরিণতির তীব্রতা সম্পর্কে তাঁদের সচেতন হওয়া উচিত।
আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিংবা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সত্ত্বেও রাশিয়া তার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার কাজ অব্যাহত রাখবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর জেগে ওঠা উচিত। এসব দেশকে বুঝতে হবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের অখণ্ড শাসনের দিন অনেক আগেই গত হয়েছে।
