ভারী নেতার চেয়ে কৌতুকাভিনেতাই ভালো

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২২, ১১:১৪ পিএম

দুই বন্ধুর তর্ক লেগে গেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে। একজন খুব চিন্তিত, ‘রাশিয়ার এই আগ্রাসন পৃথিবীর ছোট দেশগুলোকে শেষ করে দিল।’

‘কীভাবে শেষ করল?’

‘বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে ছোট প্রতিবেশীর কিছু গোলমাল থাকেই। তাই বলে কেউ ট্যাংক-কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। শাসায়-ধমকায়। এখন থেকে আর ধমকাবে না। সোজা অ্যাকশন।’

চিন্তার কথা। অন্যজন চিন্তিত হচ্ছে না। একটু ভেবে বলে, ‘কিন্তু তুমি এর সুবিধার দিক দেখছ না!’

‘সুবিধার দিক আবার কোথায় দেখা যাচ্ছে?’

‘পৃথিবী একমুখী হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকা যা চাইবে তা-ই। সোভিয়েত ইউনিয়ন যতদিন ছিল ততদিন বিষয়টা এরকম ছিল যে আমেরিকা যার পক্ষে সোভিয়েতরা তার বিপক্ষে। ফলে, আমেরিকা অঙ্ক করে আগাত। ৯১’র পর থেকে আর অঙ্ক করে না।’

‘আমেরিকার অঙ্ক না করার সঙ্গে এই যুদ্ধের সম্পর্ক কী?’

‘সম্পর্ক হলো এখন রাশিয়া আছে। পুতিন আছেন। রাশিয়াও দেখিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার একা দুনিয়া ঘোরানোর দিন শেষ। ফের ফিরে এলো...’

সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একসময় তারুণ্যের চূড়ান্ত রোমান্টিকতা। কত জীবন- যৌবন যে বিলীন হলো সোভিয়েত সমাজের স্বপ্নের রং চোখে এঁকে। আমাদের তারুণ্যে এমন তরুণ বোধহয় পাওয়া যাবে না যে জীবনে একবার বলেনি, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও।’ কিংবা লেনিনের স্বপ্নের সাম্যের সমাজের কথা ভেবে মনে করেনি, আমি তুচ্ছ। গরিবের কথা না ভেবে বিলাসে মেতে আছি।

স্বপ্ন দেখিয়ে, স্বপ্ন বিলিয়ে একসময় সোভিয়েত বিলুপ্তই হয়ে গেল। বিপ্লবের রোমান্টিকতা গেল কিন্তু রেশ স্মৃতি হয়ে রইল। স্মৃতির এই রেশটাই জীবন নিয়ে জেগে ওঠে রাশিয়ার কোনো এক গর্জনে এবং তখনই ভুলটা হয়। রোমান্টিকতাময় অতীত কাউকে কাউকে এমন ভুলপথে ঠেলে যে, তারা রাশিয়ার আগ্রাসনকেও যুক্তির পোশাক পরিয়ে দেয়। 

স্মৃতি থাকবে। তাতে রোমান্স থাকবে। কিন্তু সেই রোমান্সটা ঝেড়েও ফেলতে হবে পরিবর্তিত সময়ে। এই যুগে কোনো স্বাধীন দেশের ওপর কোনো দেশেরই আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। দেশ-টেশ তো শেষ পর্যন্ত মানচিত্রের ব্যাপার। আর মানচিত্র কখনোই মানুষের চেয়ে বড় নয়। যুদ্ধ হলে মানুষ ভুগবে। মানুষ মরবে। মানুষকে ভুগিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের যে নেশা আজকের যুগে এর কোনো জায়গা নেই।

তবু এসব হয়। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কী লাভ হলো যুদ্ধের বিরুদ্ধে এত কথা বলে। এত সাহিত্য করে। মানবিকতার সব গান শেষমেশ মিলিটারি বুটের আওয়াজে হারিয়ে যায়।

যাই হোক, একটু ভারী কথা হয়ে গেল। এসব কথা শোনার সময় সে-ই নেতাদের নেই যারা উগ্র জাতীয়তাবোধে উন্মত্ত। এমন যুদ্ধোন্মাদদের কা-ে মেজাজ এমন চরমে পৌঁছায় যে ঠা-া হতে একটা রসিকতা লাগে।

রসিকতাটা ঘটনাচক্রে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নেরই।

নিকিতা ক্রুশ্চেভ একটা সভায় খুব সমালোচনা করছিলেন স্ট্যালিনের। স্ট্যালিন  স্বৈরাচারী ছিলেন। তিনি শেষ করে গেছেন সবকিছু। শ্রোতাদের একজন ফিসফিস করে বলল, ‘তিনি যখন এসব করেন তখন আপনি চুপ ছিলেন কেন?’

ক্রুশ্চেভ গর্জন করে উঠলেন, ‘কে, কে বলল এই কথা। সামনে আসো।’

সবাই চুপ।

ক্রুশ্চেভ হাসতে হাসতে বললেন, ‘এখন বুঝতে পারলে তো আমি কেন চুপ ছিলাম।’

আরেকটা রসিকতা। সেটাও ক্রুশ্চেভ-স্ট্যালিনের।

স্ট্যালিন মৃত্যুর আগে ক্রুশ্চেভের জন্য দুটো খাম রেখে গিয়েছিলেন। বলা ছিল, বিপদে পড়লে তিনি যেন খামগুলো খুলেন।

কয়েক বছর পর প্রথমবার ঝামেলায় পড়ে খামটা খুললেন। লেখা, ‘তুমি আমার সমালোচনা শুরু করো। দেখবে মানুষজন চুপ হয়ে যাবে।’

ক্রুশ্চেভ তাই করলেন। ম্যাজিকের মতো কাজ হলো।

কয়েক বছর পর আবার ঝামেলা। তিনি আবার খাম খুললেন। লেখা, ‘এবার একটা যুদ্ধ লাগিয়ে দাও। দেখবে মানুষ তোমার অক্ষমতার কথা ভুলে যাবে।’

তাই করলেন। কাজ হলো আরও বেশি। যুদ্ধে মেতে উঠল মানুষ।

কয়েক বছর পর আবারও অজনপ্রিয়তা। শেষ খামটা খুললেন। লেখা, ‘তোমার সময় শেষ। পরের জন্য খামগুলো তুলে রেখে বিদায় নাও।’

ঠিক জানি না পুতিনের কাছে ওরকম কোনো খাম আছে কি না। তা দেখেই তিনি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কি না। তা হলে কিন্তু তৃতীয় খামটিও আছে। যুদ্ধ-টুদ্ধ করে একদিন বিদায় নেবেন হয়তো। কিন্তু তার আগে...। কত মানুষ শেষ হয়ে যাবে। কত স্বপ্নের রং রক্তে ভেসে যাবে।

সমস্যা হলো, পুতিন-ক্রুশ্চেভ-স্ট্যালিনদের যে আমরা অত দোষ দিই, সে-ই দোষ দেওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে একপক্ষীয় হয়ে যায়। পশ্চিমা মিডিয়া রাশিয়া বা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে চালিয়ে আমাদের মনোজগৎটাই এমন করে দেয় যেন সব দায় তাদের। একটা গল্প শোনা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে।

ক্যাস্ত্রো-আলেকজান্ডার-নেপোলিয়ন স্বর্গে বসে একটা সামরিক কুচকাওয়াজ দেখছিলেন। আলেকজান্ডার ট্যাংক দেখে বললেন, ‘এই জিনিস আমার হাতে থাকলে আমি পুরো এশিয়া শাসন করতে পারতাম।’

মিসাইলে চোখ পড়ল সিজারের। বললেন, ‘এই জিনিস আমার হাতে থাকলে আমি পুরো বিশ্বকে সারা জীবনের জন্য পদানত করে রাখতাম।’

ক্যাস্ত্রো একটা আমেরিকান পত্রিকা ওল্টাচ্ছিলেন। বললেন, ‘কোনো অস্ত্র দরকার ছিল না। এরকম একটা পত্রিকা আমার হাতে থাকলে আমেরিকানরা আমাকে শত্রুর বদলে তাদের রক্ষাকর্তা মনে করত।’

মার্কিন বা পশ্চিমা মিডিয়া এমনই। একপেশে প্রচারে যে কাউকে তারা তাদের আদলে একটা বিকৃত চেহারায় সাজিয়ে ফেলতে পারে। তাদের চোখে এরা লৌহমানব। কুশাসক। পুতিন বা রাশিয়ার ক্ষেত্রেও কি বিষয়টা ক্ষেত্রবিশেষে এরকম নয়! রুশদের নিরাপত্তা বিষয়ে যে কিছু যুক্তি আছে সেগুলোকে কেউ প্রশ্রয়ই দেয় না তার কারণ সম্ভবত পশ্চিমা মিডিয়ার প্রতিষ্ঠিত করা মতামত। সেই সূত্রে পুতিনের খুনে ভাবমূর্তি। তবে আবার জানিয়ে রাখি, এসব কোনো যুক্তিতেই পুতিনের ইউক্রেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া সমর্থন করা যায় না। বিরোধ মীমাংসার জন্য রাশিয়া এক হাজারটা কাজ করতে পারত কিন্তু যুদ্ধ সেই এক হাজারের মধ্যে পড়বে না। দুই হাজার-তিন হাজার নম্বরেও না।

যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। আরও হাজারটা সমস্যার শুরু। যেমন শুরুতে যে দুশ্চিন্তার কথা বলছিলাম, রাশিয়া সফল হয়ে গেলে মোটামুটি এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে যে ছোটদের ওপর যেকোনো সময় হামলে পড়া যায়। রাশিয়ার ব্যর্থতা তাই আমাদের মতো দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

কিন্তু তখন আবার মনে হয়, আচ্ছা রাশিয়া যদি হেরে যায় তাহলে আমেরিকান বিশ্ব আবার সেই অট্টহাসিতে মেতে উঠবে। সে-ই হাসি যা দিয়ে তারা পৃথিবীর জনপ্রিয় মানবতাবাদী নেতাদের পেছনে লাগে। ভুল প্রচার প্রতিষ্ঠিত করে ইরাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নিজেদের অপছন্দের পৃথিবীকে পৃথিবী থেকে দূর করার যে এককেন্দ্রিক হিসাব এর বিরুদ্ধে একটা শক্তির প্রকাশ তো ভারসাম্যের স্বার্থে দরকারও।

যেমন দরকার ন্যাটো এবং জাতিসংঘ নামক সংস্থাগুলোকেও চিনে নেওয়ার। ন্যাটোর ভূমিকাটা বেশ অদ্ভুত। ইউক্রেনকে একরকম সাহস জুগিয়ে গেল। কিন্তু যে-ই পুতিন আক্রমণ করে বসলেন, তখন ওরা বেশ শান্তিকামী। ইউক্রেন একাকী মার খাচ্ছে আর ন্যাটো নানা বাণী দিয়ে চলছে। আর জাতিসংঘ! আরেকটা গল্প বলি। আমাদের এক স্কুলে এক স্যার কেউ কোনো অপরাধ করলেই জানতে চাইতেন, ‘বাবা কী করে?’ তারপর বিচার।

আমরা ভাবতাম, স্যার বোধহয় বাবা কী করেন এর মাধ্যমে পারিবারিক শিক্ষা ঠিকমতো হয়েছে কি না সেটা বুঝতে চান। একসময় খেয়াল করলাম তিনি তাদেরই মারেন যাদের বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না। রাগ করে একদিন সবাই মিলে ধরলাম।

স্যার বললেন, ‘কী করব রে বাবা। উপায় তো নেই। গরিবদের শাসন করলে হজম করা যাবে, বাবারা তেড়ে আসবে না।’

‘এটা অন্যায়। বড়লোকের ছেলেদের না মারলে গরিবদেরও মারতে পারবেন না।’

স্যার করুণ গলায় বললেন, ‘কাউকে মারতে না পারলে আমার আর মাস্টারি থাকবে। কেউ মানবে আমাকে? এখন তো তবু কিছু ছাত্র মানে...’

জাতিসংঘও তাই। নিজেদের ধরে রাখতে গরিব বাবার ছেলেরাই ভরসা। নেপাল -ভুটান বা সোমালিয়া-উগান্ডা লড়াই হলে দেখা যেত তারা কত বড় ক্ষমতাবান!

একদিক দিয়ে এই যুদ্ধ ভালোই। অনেকের পোশাকের রংটা আরও স্পষ্ট করে দিল। বড় সংস্থা আর বড় নেতাদের সঠিক ছবিটা দেখা হয়ে গেল। আর দেখে দেখে জানলাম, বিরাট বিরাট নেতাদের চেয়ে কৌতুকাভিনেতাই ভালো।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলোনস্কির কথাই বলছি। স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান ছিলেন। লোক হাসাতেন। সেই কমেডিয়ান মানুষটি যুদ্ধের ময়দান থেকে না পালিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। রক্ষার লড়াইয়ে প্রেরণা দিয়ে এখন দারুণ জনপ্রিয়।

বুঝলাম ভারী নেতাদের চেয়ে কৌতুকাভিনেতাই ভালো। আর যুদ্ধ-টুদ্ধ এগুলো শেষপর্যন্ত নানা অঙ্কের নাটক। রসিকতারই বিষয়। সমস্যা হলো, এ জীবন দেওয়া-নেওয়ার নিষ্ঠুর রসিকতা।

লেখক সাংবাদিক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত