উইল করা সম্পত্তি আগে পেতে ভাড়াটে দিয়ে মাকে খুন করল মেয়ে

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ১০:১৭ পিএম

কয়েকজন শিশু সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ছাগল নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঝোপে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে। তা ভয়ে দৌড়ে পালায়। এ সময় অন্যরা জানতে চাইলে তারা লাশের কথা জানায়। তারা ওই ঝোপে এসে দেখেন বোরকা পরিহিত অজ্ঞাত (৬০) এক নারীর গলাকাটা মরদেহ পড়ে আছে। পাশে রক্ত মাখা এক জোড়া হ্যাণ্ড গ্ল্যাভস পাওয়া যায়। 

পরে খবর দিলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এ সময় নিহত নারীকে স্থানীয়রা কেউ চিনতে পারছিল না। 

হত্যার তদন্তে সিআইডি ও পিবিআই ঘটনাস্থলে আসে। তারাও কোনো কুল-কিনারা করতে পারছিল না এ হত্যাকাণ্ডের। ক্লুলেস এমন একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ ছিল চরম বেকায়দায়। 

খুন হওয়া নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ছিল গত ১১ ফেব্রুয়ারি। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় পুলিশ। 
পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে অধিকতর তদন্তে নামে। এক মাসের কম সময়ে নিবিড় তদন্তে ক্লুলেস এ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে তারা। 

এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে জড়িত থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। 
জানা যায়, সহযোগীকে নিয়ে কোমল পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মাকে খাইয়ে গলাকেটে হত্যা করা হয়। 

এ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের ব্যাপারে জানাতে শুক্রবার সকালে শ্রীপুর মডেল থানায় পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। 

গ্রেপ্তাররা হত্যায় দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারা জবানবন্দী দিয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। 

পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত ওই নারীর নাম মিনারা বেগম (৬০)। তিনি পাশের ভাংনাহাটি গ্রামের আবু তাহেরের স্ত্রী। স্বামী আবু তাহেরও দীর্ঘদিন ধরে উধাও। এক মেয়ে শেফালীকে নিয়েই ছিল মিনারা বেগমের সংসার।

আর গ্রেপ্তার হওয়া নিহতের মেয়ে শেফালী বেগম (৩৫), তার স্বামীর নাম ফরিদ উদ্দীন। গ্রেপ্তার হওয়া তার সহযোগী সোহেল রানার (৪০) বাড়ি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার খড়িয়া বানির চর। 

স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরির সুবাদে শেফালীর সঙ্গে পরিচয় হয় সোহেলের এমনটি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) আমজাদ শেখ। 

তিনি আরো বলেন, অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েকদিন পর নিহতের ছোট বোন দেলোয়ারা থানায় নিখোঁজে একটি অভিযোগ নিয়ে আসেন। এ সময় ওই নারীর সঙ্গে কথা বলার সময় নিখোঁজ নারীর ছবি চাই। অজ্ঞাত উদ্ধার ওই নারীর সঙ্গে ছবির মিল থাকায় তার কাছে আরো বিস্তারিত জানতে চাই। এ সময় ওই নারী (অভিযোগকারী ছোট বোন) জানান, মিনারা বেগমের মেয়ে শেফালী সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিল তার মা বিয়ে করে কুমিল্লায় চলে গেছে। পরে শেফালী স্বামীসহ পালিয়ে ছিল। যে কারণে তাদের সন্দেহ আরো বাড়ে। পরে অভিযান চালিয়ে প্রথমে শেফালীর স্বামী ফরিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার তথ্যমতে শেফালীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, গ্রেপ্তার শেফালীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার সহযোগী সোহেলের কথা জানায় পুলিশকে। পরে অভিযান চালিয়ে সোহেলকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শেফালী মায়ের দেওয়া উইল করা ১৪ শতাংশ জমি দ্রুত নিজের করে পেতে হত্যার পরিকল্পনা সাজায়। সহযোগীকে নিয়ে ৪০ হাজার টাকায় রফা করে মাকে হত্যার। কোমল পানিয়ের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানোর পর হত্যা করা হয় মিনারা বেগমকে। 

বরমী ইউনিয়নের ইউপ সদস্য (২ নম্বর ওর্য়াড) মো. মারুফ শেখ মুক্তার জানান, কালো বোরকা পরিহিত এক নারীর মরদেহ সে সময় পড়ে থাকতে দেখে শিশুরা। ঢাকা ময়মনসিংহ রেল লাইনের পশ্চিম পাশের মাঠে খেলা শেষে  মাঠে চরানো ছাগল আনতে গিয়ে এ লাশ দেখতে পেয়েছিল শিশুরা। পরে পুলিশে খবর দিলে শ্রীপুর থানার ওসি খোন্দকার ইমাম হোসেন ও কালিয়াকৈর এএসপি সাার্কেল আজমীর হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন।  পরে সিআইডি ও পিবিআইকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। 

কালিয়াকৈর সার্কেলের এএসপি আজমীর হোসেন জানান, খুন হওয়া মিনার বেগম ৮ গণ্ডা (১৪ শতাংশ) জমি পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। স্বামী তাকে ছেড়ে উধাও হওয়ার পর থেকে মেয়েকে নিয়েই তার সংসার ছিল। পরে মেয়ে নিজের পছন্দমত এক পিকআপ চালকে বিয়ে করে। মা তার নিজ নামের জমি মেয়ে শেফালীকে উইল করে দেন। সেখানে বলা ছিল জীবিত থাকাকালীন সম্পত্তির মালিক মিনারা বেগম থাকবেন। মৃত্যুর পরে সে জমিটুকু হবে মেয়ে শেফালীর। কিন্তু শেফালীর সংসারে অশান্তি হওয়াতে এ সম্পত্তির দিকে লোভ বাড়তে থাকে। দ্রুত সময়ে জমি পেতে মাকে খুনের পরিকল্পনা করে। পরে এ পরিকল্পনা তার গার্মেন্টস সহকর্মী সোহেলের সঙ্গে পরামর্শ করলে সোহেল মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। পরে মাকে হত্যার জন্য সোহেলের সঙ্গে ৪০ হাজার টাকায় রফা করে। একদিন আত্মীয় বাড়ি নিয়ে যাবে বলে মাকে নিয়ে বের হয় শেফালী। এ সময় তার সঙ্গে সোহেলও ছিল। পরে গোলাঘাট এলাকায় সদুখার ভিটা নামে এক নির্জন স্থানে গিয়ে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয় মিনারা বেগমকে। 

এ পুলিশ কর্মকার্তা বলেন, শেফালী জানায় সে আগে মায়ের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে দুজনে ধরে ঝোপের ভেতর নিয়ে সে বুকের ওপর বসলে সোহেল ছুরি চালায় মিনারার গলায়। মৃত্যু নিশ্চিহ হওয়ার পরে পাশের একটি ডোবায় রক্তমাখা হাত ধুয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। 

তিনি বলেন, এক মাসের কম সময়ে ক্লুলেস এ হত্যার আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত