স্কুলশিক্ষককে মারধর, হাতকড়া পরিয়ে ফেনসিডিল রাখার অভিযোগ ডিবির বিরুদ্ধে

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ০৯:১৩ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশের বিরুদ্ধে মাদক উদ্ধারের অভিযানের নামে স্কুলশিক্ষক নাজমুল হাসানকে মারধর ও হাতকড়া পড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। পরে, ফেনসিডিলসহ ছবি তুলে মুচলেকা নিয়ে ওই স্কুলশিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয়।

রবিবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্কুলশিক্ষক নাজমুলের পরিবারে পুলিশ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নাজমুল বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের সহেদেবপুর গ্রামের মো. আব্দুল হাই ভূঁইয়ার ছেলে। তবে দীর্ঘ ৩৩-৩৫ বছর ধরে পরিবার নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বসবাস করছেন নাজমুল। তিনি শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় দীর্ঘ ১২ বছর ধরে মৃত আব্দুল আওয়ালের বাড়িতে বাবা-মাসহ পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন।

নাজমুল বিজয়নগর উপজেলার দক্ষিণ পেটুয়াজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

নাজমুলের পরিবার জানান, কান্দিপাড়ার প্রয়াত আব্দুল আওয়ালের বাড়ির তৃতীয় তলায় তার বড় ছেলে রাজীব আহমেদ থাকেন। একই ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্কুলশিক্ষক নাজমুল বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে থাকেন।

ঘটনার দিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে নাজমুলের বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা আব্দুল হাই ভূঁইয়া (৮০) কাপড় আনতে বাড়ির ছাদে যান। সেসময় আব্দুল আওয়ালের বাড়িতে ডিবি পুলিশের আটজন সদস্য মাদক উদ্ধারের অভিযানে যান। তারা তালা ভেঙে আবদুল আউয়ালের ছেলে রাজিবের ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় ডিবি পুলিশের সদস্যরা ছাদ থেকে বৃদ্ধ আব্দুল হাই ভূঁইয়াকে ডেকে রাজীবের ঘরে নিয়ে যান। সেসময় একজন নিজেকে ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন।

এদিকে, বৃদ্ধ আব্দুল হাই ভূঁইয়া ঘরে না ফেরায় ২০-২৫মিনিট পর নাজমুল তার বাবার খোঁজে ছাদের দিকে যান। বৃদ্ধ বাবাকে ডিবি পুলিশ সদস্যের মধ্যে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গিয়ে নাজমুলও রাজীবের কক্ষে যান। তার বাবাকে দাঁড় করিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে ডিবি পুলিশের সদস্যরা ক্ষেপে যান। একপর্যায়ে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বৃদ্ধ বাবার সামনেই নামজুলকে কানে, গালে, কপালে ও পিঠে চর-থাপ্পড় ও কিলঘুষি মারেন। পুলিশ সদস্যরা দুই হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাজীবের ঘরের বিছায়নায় নামজুলকে বসিয়ে পাশে দুটি ফেনসিডিলের বোতল রেখে ছবি তোলেন। পরে নাজমুলের কাছ থেকে পুলিশ সদস্যরা একটি মুচলেকা আদায় করেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরা শিক্ষকতার পেশা নিয়েও নামজুলকে আজেবাজে কথা বলেন।

স্কুলশিক্ষক নামজুল হোসেন বলেন, আমার বাবা বৃদ্ধ ও অসুস্থ। গত দুই দিন আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে বাবাকে বাড়িতে এনেছি। ২০-২৫মিনিট হয়ে গেলেও বাবা ঘরে না আসায় আমি ছাদের দিকে যাই। তখনই বাবাকে রাজীবের ঘরে ডিবি পুলিশ সদস্যদের মাঝে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। বাবাকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় বাবা অস্বস্তিবোধ করছিলেন। আমি তখন বলেছি, সাক্ষী হিসেবে বাবার নাম দিতে চাইলে দেন, আমি বাবাকে নিয়ে যাই। প্রয়োজন হলে পরে আসবে বললে তারা আরও ক্ষেপে যান। পরে পুলিশের সদস্যরা আমাকে মারধর করেন। এখনো আমার কান ও মুখের চোয়াল ব্যথা করছে।

তিনি বলেন, হাতকড়া পড়িয়ে পাশে দুটি ফেনসিডিল বোতল রেখে ডিবি পুলিশ সদস্যরা আমার ছবি তুলেছে। আমি তাদের কাজে বাঁধা দিয়েছি এবং এতে আমি অনুতপ্ত লিখে তারা আমার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছে।

নাজমুলের বাবা আব্দুল হাই ভূঁইয়া বলেন, ডিবি পুলিশের মারধরে ছেলের মাথা থেকে নামাজের টুপি পড়ে যায়। নাজমুল টুপি তুলে পড়তে চাইলে তারা তা ঢিল ছুড়ে ফেলে দেয়। চোখের সামনেই বিনা কারণে ডিবি পুলিশ সদস্যরা ছেলেটাকে মারধর করেছে। আমি ও আমার পরিবার এখন পুলিশের আতঙ্কের মধ্যে আছি।

অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেনের ভাষ্য, ওই ভদ্রলোক (নাজমুল) একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি মাদক উদ্ধার অভিযানে আমাদের বাধা দিয়েছেন। এই মর্মে মুচলেকাও দিয়েছেন। তিনি বলেন, মারধর ও হাতকড়া পরানোর অভিযোগ সঠিক না।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, আমাদের মাদক উদ্ধারের অভিযান চলমান রয়েছে। মাদক উদ্ধার অভিযানে পুলিশ সদস্যদের অভিযান ভিডিও করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভিযানের পুরো ভিডিও দেখে বিষয়টি সম্পর্কে বলতে পারব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত