বছরের পর বছর আটকে রেখে গৃহকর্মীকে নির্যাতন, উদ্ধার করল পুলিশ

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ০৯:১৫ পিএম

বছরের পর বছর এক গৃহকর্মীকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই গৃহকর্মী অবশেষে বাসা থেকে পালিয়ে গেলে, তাকে উদ্ধারের পর এমন তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ।

শুক্রবার সকালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাঘিয়া শাহপরান সড়কের কবির হাওলাদারের বাড়ি থেকে ওই গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে পুলিশ।

এর আগে বৃহস্পতিবার ওই গৃহকর্মী বাসা থেকে পালিয়ে এক রিকশাচালকের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।

উদ্ধারের সময় ওই গৃহকর্মীর বয়ান অনুযায়ী, বরিশাল নগরের কলেজ রোড এলাকায় আকিমুল ইসলামের বাসায় তিনি কাজ করতেন। আকিমুল ইসলাম বরিশাল নগরের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্যামিস্ট ল্যাবরেটরিজের চিফ অপারেশন এ্যাডমিনেস্টেটর পদে কর্মরত আছেন।

গৃহকর্মী জানান, তার চাচা স্বপন ঢাকায় থাকতে আকিমুল ইসলামের বাড়িতে কাজের ব্যবস্থা করেন। আকিমুলের বাড়ি রাজশাহী হলেও বর্তমান চাকরির সুবাদে স্ত্রী শিমু ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে বরিশাল নগরের কলেজ রোড এলাকায় বসবাস করেন। তাকে কখনোই ঠিকভাবে খেতে দেয়া হতো না। মারধর করা হতো। কাজের জন্য নির্ধারিত সময় বেঁধে দেয়া হতো, না পারলে চালানো হতো নির্যাতন।

নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী বলেন, ‘আমি যতটুকু কাজ পারি ততটুকু তো করি। আমি তো কোনো মেশিন না যে তাড়াতাড়ি সব কাজ করমু, আমি তো মানুষ কিন্তু আমার সঙ্গে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করা হতো। নিজেদের ৭ ও ৩ বছরের দুটি শিশু সন্তান রয়েছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে তো ওইরকম ব্যবহার করার সাহস পায় না। তারা আমারে বেলন দিয়ে বাড়ি মারে, লোহার ইয়া (ছেকনি/খুনতি) দিয়া মারে, আর চর-থাপ্পড় তো আছেই। এমনভাবে মারে যে পরে আমি উইঠা আর কাজ করতে পারি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এক কাজ চৌদ্দবার করাতো। কাজে দেরি হলেই হাঁটু ও মাজার মধ্যে মারতো। পচা বাসি খাবার খাওয়াত। আবার খাওয়ার জন্যও সময় বেঁধে দিতো। তাঁদের মারধরের কারণে আর একটা মেয়ে ছিল সে চলে গেছে।’

কীভাবে পালালেন জানতে চাইলে বলেন, ‘বাসার গেট খোলা পেয়ে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিএম কলেজের সামনে চলে আসি। কিন্তু এখানকার কিছু না চেনায় একজন মহিলার সাহায্য চাই। তখন ওই আন্টিকে খ্রিষ্টান কলোনিতে দিয়ে আসার অনুরোধ জানাই। তখন ওই আন্টি রিকশাচালক আরিফ ভাইকে খ্রিষ্টান কলোনিতে দিয়ে আসতে বললে আমি এখানে আসি।’

নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর দক্ষিণ বাঘিয়া এলাকায় কবির হাওলাদারের বাড়ির ভাড়াটিয়া ও রিকশাচালক আরিফ মোল্লা বলেন, ‘বিএম কলেজের সামনে থেকে যাওয়ার সময় এক মহিলা আমাকে সিগন্যাল দেয়। এরপর এই মেয়েটিকে বাঁচানোর কথা বলে এবং মেয়েটিও ভাই বলে ডাক দিয়ে সাহায্যের আকুতি জানায়। এরপর তাকে নিয়ে হাজেরা খাতুন স্কুলের সামনে এসে চা-রুটি খাওয়াই। তারপর সে ভাত খেতে চাইলে বাসায় নিয়ে আসি। পরবর্তীতে সে খ্রিষ্টান কলোনিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, তবে না জেনে আমি কোথায় নেব এই চিন্তায় বাসায় স্ত্রীর কাছেই রাখি মেয়েটিকে।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আকিমুল ইসলাম এসব অভিযোগ মিথ্যে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ওই গৃহকর্মীকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। গাজীপুরে চাকরির সময়ে এক লোকের মাধ্যমে তাকে তিনি পেয়েছেন। আর বরিশালে মাত্র ৩ মাস হয়েছে এসেছেন, সব মিলিয়ে ৬-৭ মাস হতে পারে ওই গৃহকর্মী তাদের সঙ্গে আছেন।

ওই গৃহকর্মীর মানসিক সমস্যা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ওই গৃহকর্মী তার বাড়ির ঠিকানাই বলতে পারেন না। আমরাও অনেক চেষ্টা করেছি তার বাড়িতে যোগাযোগ করার জন্য।

তবে গতকাল হারিয়ে যাওয়া বা আগে থেকে তার পরিবারের সন্ধান না পাওয়ার বিষয়ে তিনি থানা-পুলিশকে কখনো জানাননি।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ আহম্মেদ বলেন, রিকশাচালক আরিফের বাড়ির মালিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে থানা পুলিশসহ আমরা এখানে এসেছি। এখন নির্যাতনের শিকার ওই মেয়েটি যাতে ভালো থাকে সেই চেষ্টা করব।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই মো. শাহজালাল কবির জানান, বিমানবন্দর থানা-পুলিশ ওই গৃহকর্মীকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। ওই গৃহকর্মীকে কোতোয়ালি মডেল থানার ভিকটিম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওই গৃহকর্মীর নাম মীম (১৫); তার বাড়ির ঠিকানা ঠাকুরগাঁওয়ে বলে জানান। ঠাকুরগাঁও সদর থেকে গাড়িতে একশত টাকা পথের দূরত্বে তুলশী পুকুর এলাকায়। তার পিতা অরেন, আর মাতার নাম আনিকা বলে জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত