১৮ কোটি মানুষে জনবল ২১৭

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২২, ০৩:২০ এএম

ভোগ্যপণ্যের বাজারে আগুন। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহ ধরে ভোজ্য তেল বাজার থেকে প্রায় উধাও ছিল। সরকারপক্ষ ও আমদানিকারক এবং সরবরাহকারী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বলছে, সংকট নেই। সরবরাহ ঠিকই আছে। অথচ কারওয়ান বাজারের মতো পাইকারি মার্কেটসহ খুচরা দোকানগুলোতে গত সপ্তাহে সয়াবিন তেল ছিল না বললেই চলে। যদিও টিসিবির ট্রাকে সয়াবিন তেল বিক্রি করা হয়েছে। তবে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে গতকাল থেকে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। পাশাপাশি সংকট চলছেই।

শুধু ভোজ্য তেলই নয়, দাম চড়া ডাল, চাল, সবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় বেশিরভাগ পণ্যের। এদিকে আসছে রমজান। ভোক্তারা দিশেহারা বাজার নিয়ে। নিত্যপণ্যের বাজার চড়ার মধ্যে আজ পালিত হতে যাচ্ছে ভোক্তা অধিকার দিবস। সরকারপক্ষও বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরতে টাস্কফোর্স গঠন ও বাজার মনিটরিংয়ে জোরদার করেছে।

প্রসঙ্গ এসেছে সব নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায় করছে। আর এ ক্ষেত্রে সব অভিযোগের তীরই ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের দিকে। পণ্যের মান, পরিমাপ, দাম ও সরবরাহসহ সবকিছু দেখভালকারী সংস্থাগুলোর ওপরও রয়েছে অভিযোগের তীর। এর মধ্যে গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভোজ্য তেল ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট যতটা সম্ভব হ্রাস করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপরই এনবিআর থেকে এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সরকারের এসব ইতিবাচক উদ্যোগে ভোক্তারা সুফল পাবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজার বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, এখন ভোজ্য তেলের দাম নাগালের বাইরে। তাই এ বিষয়টি আলোচনায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ জরুরি। প্রশ্ন উঠেছে ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকান্ড নিয়ে। প্রতিনিয়ত ভোক্তারা যে বঞ্চনা ও অন্যায্যের শিকার হচ্ছে এবং অভিযোগ করছে সেসবের নিষ্পত্তি নেই বছরের পর বছর।

জানা গেছে, সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করে। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল থেকে তা কার্যকর হয়। পণ্যের উৎপাদনকারী, প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে জরিমানা আরোপ করা হবে, তার ২৫ শতাংশ পাবেন অভিযোগকারী।

জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর অভিযোগ পাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। সেই তালিকা অনুসারে অভিযোগ পাওয়া ও অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য দেওয়া আছে। তবে কোন কোন পণ্য নিয়ে সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ বেশি তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না ভোক্তা অধিদপ্তর। তারা বলছে, লোকবলের সংকটের কারণে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা আমলে নেওয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর তা প্রমাণিত না হলেও নিষ্পত্তি হিসেবে দেখানো হয় এবং খুব দ্রুতই ভোক্তাদের কোন বিষয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ও পণ্যসহ প্রকাশ করা হবে।

ভোক্তা অধিদপ্তরের তালিকা অনুসারে, ২০১০ থেকে চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধিদপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে ৫৬ হাজার ১২৪টি। এর মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৭৫৯টির। অভিযোগ অনিষ্পন্ন রয়েছে ৪ হাজার ৩৬৫টি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অভিযোগের সংখ্যা ৭ হাজার ৫১৫টি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯ হাজার ১৯৫টি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯১০টি, ২০২১-২২ অর্থবছরে (২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ৮ হাজার ২৪০টি।

২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে অনলাইনে পণ্য কেনাকাটা নিয়ে। এখন পর্যন্ত অনলাইনে পণ্য কেনাকাটা নিয়ে অভিযোগ হয়েছে ২৬ হাজার ৫৩৭টি। তার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২ হাজার ৫৩৮টি। নিষ্পত্তির হার ৪৭.২৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ইভ্যালি ও দারাজ ডটকমের বিরুদ্ধে। এখন পর্যন্ত ইভ্যালির বিষয়ে অভিযোগ হয়েছে ১০ হাজার ৭৩৬টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ হাজার ২৪১টি। দারাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ১ হাজার ৫৫টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৬৭টি। ভোক্তা অধিকারের তথ্যমতে, ৪৩টি অনলাইন কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের কারণ হিসেবে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি না পাওয়া, ডেলিভারি পাওয়া পণ্যের গুণগতমান ঠিক না থাকা এবং পেমেন্টে টাকা ফেরত পেতে বেশি সময় লাগা। এসব বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেও প্রতিদিন জমা পড়ছে অসংখ্য অভিযোগ।

ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সময়ে ভোক্তা অধিকার আইনে যত অভিযোগ আসে তার অধিকাংশই অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে আসা অভিযোগগুলোর ৮০ শতাংশই অনলাইনকেন্দ্রিক কেনাকাটায় প্রতারিত হওয়ার বিষয়ে। এসব অভিযোগের মধ্যে আছে, পণ্য সরবরাহে দেরি হওয়া, এক পণ্য দেখিয়ে অন্য পণ্য সরবরাহ করা অথবা রিফান্ড পেতে দেরি হওয়া।

অনলাইনে কেনাকাটার অভিযোগের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে অনলাইনে পণ্য কেনা নিয়ে। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও বাকিদের চিহ্নিত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সে ধরনের প্রযুক্তি বা জনবল আমাদের নেই। তাই এ মামলাগুলো অনিষ্পত্তি থেকে যায়।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘১৮ কোটি জনগণের জন্য ২১৭ জন জনবল নিয়ে কাজ করছি আমরা। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই কাজ করছি। এর থেকে বেশি কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষ কিন্তু এখন আস্থা রাখে আমাদের ওপর। যেসব জায়গায় যাচ্ছি আমাদের কার্যক্রমে কেউ বাধা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। লেনদেন করার আগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করে নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা আছে, যা বেশিরভাগই মানা হচ্ছে না। কোনো পণ্যের সংকট ও মান নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে ভোক্তা অধিদপ্তর নড়েচড়ে বসে।  এর কিছুদিন পর আগের মতো চলতে থাকে। ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সংশোধনে ক্যাব যে সুপারিশ করেছে তা আরও জনবান্ধব ও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঠিক দাম, মাপ ও মানের পণ্য পাওয়া ভোক্তার অধিকার। পদে পদে তারা বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আদালতে রিট করে ভোক্তার আইনি অধিকার খর্ব করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোক্তা অধিকার আইন খুব একটা কার্যকর রয়েছে তা বলা যাবে না। দেশের পাইকারি বাজারসহ অন্যান্য সেক্টরে ভোক্তা অধিকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধতা থাকে। এখানে হাত না দিলে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হবে না। ফৌজদারি অপরাধে আদালতে মামলা করার এখতিয়ার ভোক্তা অধিকারের আছে। কিন্তু তারা মামলা করতে যায় না। এরকম ক্ষমতা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও থাকলেও কার্যকরের উদ্যোগ নেই।’

প্রফেসর ড. শামসুল আরও বলেন, মানহীন পণ্য সরবরাহ করা একটা অপরাধ কিন্তু তার দায়ে তো কাউকে জেল খাটতে হয় না। কোনো মামলাও হয় না। যা জরিমানা করা হয় তার চেয়ে ভোক্তার কাছ থেকে বেশি আদায় করে। শাসন বিভাগে সুশাসনের অভাবে সব আইন অকার্যকর হয়ে যায়। সবকিছু গণমুখী করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে। ভোক্তাদের সুরক্ষায় তাদের হাতেও ক্ষমতা দরকার।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত