পাকিস্তানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে প্রভাব পড়বে বিশ্বমঞ্চে

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২২, ০৩:৩০ পিএম

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ৩ বছর ৭ মাস ক্ষমতায় থাকার পর শনিবার মধ্যরাতের পর দেশটির সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন।

আগামী সোমবার সংসদে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে। বিরোধীদলীয় নেতা শেহবাজ শরীফের অধীনে একটি নতুন সরকার গঠন করা হতে পারে।

২২ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ পাকিস্তানের পশ্চিমে আফগানিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন এবং পূর্বে ভারত। যে কারণে দেশটি বিশ্ব রাজনীতিতেও কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইমরান খানের বক্তৃতা আরও বেশি আমেরিকা-বিরোধী হয়ে উঠে এবং তিনি চীন এবং সম্প্রতি রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ইউক্রেনে আক্রমণের দিন তিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এশীয় পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও ঐতিহ্যগতভাবে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। কিন্তু ইমরান খান প্রকাশ্যেই তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী মূলত মার্কিনপন্থী।

আসুন জেনে নেওয়া যাক, অর্থনৈতিকভাবে গভীর সমস্যায় পড়ে যাওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত দেশগুলোর জন্য পাকিস্তানের এই পরিবর্তনের অর্থ কী:

 

আফগানিস্তান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং আফগানিস্তানের কট্টর ইসলামপন্থী তালেবানদের মধ্যে সম্পর্ক শিথিল হয়েছে।

তালেবানরা গত বছর আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফেরার পর অর্থের অভাবে এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। কাতার এখন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী অংশীদার। আগে এই ভুমিকা পালন করত পাকিস্তান।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর ইন্দো-প্যাসিফিক সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক লিসা কার্টিস বলেন, ‘তালেবানের কাছে বার্তাবাহক হিসেবে আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) আর পাকিস্তানের প্রয়োজন নেই। কাতারই এখন সেই ভূমিকা পালন করছে’।

তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনাও বেড়েছে। সীমান্তে তালেবানের হামলায় বেশ কয়েকজন সৈন্যকেও হারিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তান চায় তালেবানরা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করার জন্য আরও কিছু করুক এবং তারা পাকিস্তানে সহিংসতা ছড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তা শুরুও হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, ইমরান খান বেশিরভাগ বিদেশী নেতাদের তুলনায় মানবাধিকার নিয়ে তালেবানের কম সমালোচক ছিলেন। এমনকি তিনি তালেবানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

 

চীন

ইমারন খান ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তান ও বিশ্বে চীনের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।

তবে ৬০ বিলিয়ন ডলার চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর পাকিস্তানের দুটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের অধীনেই চালু হয়েছিল। দুটি দলই নতুন সরকারে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত।

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ছোট ভাই সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ পূর্বাঞ্চলীয় পাঞ্জাব প্রদেশের নেতা হিসেবে সরাসরি চীনের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। ফলে তার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বেশ ভালোই আছে।

 

ভারত

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দুই প্রতিবেশী তিনটি যুদ্ধ করেছে। যার মধ্যে দুটি কাশ্মীর নিয়ে।

আফগানিস্তানের মতোই, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পাকিস্তানের নীতি কী হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।

ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর আক্রমণ পরিচালনার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ইমরান খানের চরম সমালোচনা সহ বিভিন্ন বিষয়ে গভীর অবিশ্বাসের কারণে বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা হয়নি।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ করণ থাপার বলেছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কাশ্মীরে সফল যুদ্ধবিরতি তৈরি করতে ইসলামাবাদের নতুন সরকারের উপর চাপ দিতে পারে।

পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সম্প্রতি বলেছেন যে, ভারত রাজি হলে তার দেশ কাশ্মীর নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।

শরীফ পরিবারও ভারতের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব লালন করে।

 

যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট এখন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ তিনি এখন ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত আছেন।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যেহেতু পর্দার অন্তরালে তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সেহেতু সরকারের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় না।

লিসা কার্টিস বলেন, ‘যেহেতু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই দেশটির পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকুলেই রাখে তাই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক’।

তবে তিনি বলেন যে, ইমরান খানের রাশিয়া সফর মার্কিন সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি ‘বিপর্যয়’ ছিল এবং ইসলামাবাদের নতুন সরকার অন্তত ‘কিছু মাত্রায়’ সে সম্পর্ক সংশোধন করবে।

ইমরান খান বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে বলেছেন যে, সাম্প্রতিক রাশিয়া সফরের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেছে। ওয়াশিংটন অবশ্য এক্ষেত্রে তার কোনো ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত