রাজধানীতে মুসলিমদের জন্য বৌদ্ধবিহারে ইফতার

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৫২ পিএম

রাজধানীতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র রমজান মাসজুড়ে ইফতার বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন রোজদারদের জন্য। মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশুরা সারিবদ্ধ হয়ে তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন ইফতারের প্যাকেট। 

রবিবার বিকেলে ঢাকার বাসাব সবুজবাগের অতীশ দীপংকর সড়কের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। 

এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ। 

প্রায় এক দশক ধরে এ আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের মহাসচিব ও একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া।  

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল ৫টার পর থেকেই মুসলমান সম্প্রদায়ের শতাধিক মানুষ বৌদ্ধবিহারের পুকুর ঘাটের বেঞ্চীতে বসে অপেক্ষা করছেন ইফতার সংগ্রহের জন্য। অন্যদিকে তখন টেবিলে ইফতার সাজানোয় ব্যস্ত বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষুরা। 

এ সময় কথা হয় বাসাবো আহাম্মেদবাগ থেকে আসা রিকশাচালক মুজিবরের সঙ্গে। 

image

তিনি জানান, স্ত্রীকে সাথে নিয়ে এসেছেন ইফতার নেয়ার জন্য। বিগত ৫/৬ বছর ধরেই এখান থেকে ইফতার নিতে আসেন তিনি। 

মুজিবর বলেন, ‘খাওনের তো কোনো ধর্ম নাই। আমরা যে পানি খাই, বৌদ্ধরা তো সেই পানিই খাই।’ 

তার পাশ থেকে জুয়েল নামে আরেকজন রিকাশাচালক বলেন, ‘আমরা যে খাওন দিয়া ইফতার করি, তারা তো সেটাই দিতাছে। তাইলে নিতে সমস্যা কী? আর এহান থেইক্যা ইফতার নিতে আইলে কোনো ধাক্কাধাক্কি নাই।’

বৌদ্ধ বিহারের আবাসিক ছাত্র দীপানন্দ ভিক্ষু জানান, ‘মুসলিম রোজাদারেরা যেন মন্দিরের ইফতার মনে করে বিব্রত না হন, এ জন্য পাশেই হারুন হোটেল থেকে ইফতার এনে বিতরণ করা হয়। মন্দিরে কোনো ইফতার বানানো হয় না।’ 
এ কথার সূত্র ধরে বৌদ্ধাবিহারের উল্টোদিকে হারুন হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, তখন ইফতার প্যাকেট করার প্রক্রিয়া চলছে। কথা হয় হোটেল মালিকের ছেলে জহিরুল ইসলাম আহাদের সঙ্গে। 

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সাল থেকে আমাদের এখান থেকে প্রতি বছর ইফতার নেওয়া হয়। প্রতি প্যাকেট ৪৫ টাকার মতো খরচ ধরা হয়। যার মধ্যে দেওয়া হয়- ছোলা, পেঁয়াজু, জিলাপি, আলুর চপসহ বিভিন্ন আইটেম।’ 

উদ্যোগটি ধর্মীয় সম্প্রীতি বাড়াবে বলে মনে করেন আহাদ। 

image

তিনি বলেন, ‘সব ধর্মের মানুষ তো আমরা পাশাপাশি বসবাস করি এই দেশে। আমার ধর্ম আমার, তাদের ধর্ম তাদের। আমাদের ধর্মের রোজায় তারা ইফতার আয়োজন করে ভালোবাসার আহ্বান করেছে। তাদের কাছ থেকে ইফতার নিতে কোনো সমস্যা মনে করি না।’

ঘড়িতে বিকাল সাড়ে ৫টা বাজতেই বৌদ্ধবিহারের সামনে শুরু হয় ইফতার বিতরণ। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন সবাই। একে একে ইফতার নিচ্ছেন ৬ বছরের শিশু থেকে ষাটোর্দ্ধ নারী-পুরুষ। 

ইফতারের প্যাকেট নেয়ার পর হাঁটতে হাঁটতে কথা আয়েশা নামে এক বৃদ্ধার সাথে। 

তিনি বলেন, ‘প্রত্যোক বছরই আমি এহান থেইক্যা ইফতার নিই। যারা ইফতার দেন, তারা খুব ভালো ব্যবহার করেন। কাউরে ফিরিয়ে দেন না।’

ইফতার প্যাকেট বিতরণের পর বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের মহাসচিব ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভালোবাসার বিনিময়ে আমরা মূলত ভালোবাসা পাওয়ার জন্যই আয়োজনটি প্রতি বছর করছি। করোনার জন্য বিগত দুই বছর করা সম্ভব হয়নি।’

সবুজ বাগে বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। ২০১৩ সাল থেকে বৌদ্ধ মহাবিহারের প্রয়াত প্রধান শুদ্ধানন্দ মহাথেরো উদ্যোগটি নেন। 

বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের যুগ্ন সম্পাদক দেবপ্রিয় বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন আমাদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীও আমাদের প্রশংসা করেছেন। এ ছাড়া স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা করেছেন আমরা যেন উদ্যোগটি নিয়মিত করে যেতে পারি। স্থানীয় সব ধর্মের মানুষের ভালোবাসা এবং সহযোগিতায় আমরা এটি প্রতি বছর পরিচালনা করবো বলে আশা করি।’ 

image

করোনার আগে প্রতিদিন ৫ শতাধিক মানুষকে ইফতার দেওয়া হলেও এখন প্রতিদিন ২০০ জনের ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। বেশি লোক আসলে ইফতার প্যাকেটও বাড়ানো হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত