হল কমিটিতে পদ পেয়েই বেপরোয়া রাবি ছাত্রলীগ নেতারা

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২২, ০৪:২৩ পিএম

দীর্ঘ ছয় বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের হল কমিটি ঘোষণার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হলের পদপ্রাপ্ত নেতা কর্মীরা। পদ পাওয়ার এক মাস যেতে না যেতেই টাকার বিনিময়ে সিট বিক্রি, সিট দখল করে দলের নেতা কর্মীদের তুলে দেওয়া, খাবার ছিনতাই এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে গত ১৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭টি হলের সমন্বিত হল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েক দিন পর গত ২৪ মার্চ আংশিক হল কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির পদপ্রাপ্ত অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হয়েছেন। আর পদ পাওয়ার পর থেকে আবার অনেকেরই দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১২ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে হল থেকে নামিয়ে দেয় হল ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে রাতুল। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম আকিব জাভেদ। তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ওই দিন সকাল ৯টার দিকে রাতুলের নেতৃত্বে সাত থেকে আটজন এসে আকিবের বইপত্রসহ সব জিনিস বাইরে ফেলে দেন।

পরে সারা দিন ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র নিয়ে রুমের সামনে অবস্থান করে ওই শিক্ষার্থী। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূর, সহকারী প্রক্টর আরিফুর রহমান ও হল প্রাধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান ওই শিক্ষার্থীকে আরেক কক্ষে তুলে দেন।

গত ৬ এপ্রিল মাদার বখ্শ হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে হল ছাত্রলীগের সভাপতি প্রিন্স হামিম রেজা শাফায়াতের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীরা নাম এখলাস উদ্দিন। তিনি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী জানান, তিনি উক্ত ঘটনার সপ্তাহ খানেক পূর্বে হলের ৩৩৩ নম্বর কক্ষে ওঠেন। এরপর গত ৪ এপ্রিল বিকেলে ২০৮ নম্বর কক্ষে তাকে ডেকে নেন শহীদ হবিবুর রহমান হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান অপু। পরবর্তীতে তার কাছে টাকা দাবি করেন এবং বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করায় পরবর্তীতে গত ৬ এপ্রিল রাতে হল ছাত্রলীগের সভাপতি প্রিন্সের অনুসারী সোহেল রানাসহ ছাত্রলীগের ১৫ জন নেতা কর্মী রুমে এসে তাকে সিট থেকে নামিয়ে অন্য একটি ছেলেকে তুলে দেন।

এর আগে গত ২৮ মার্চ মতিহার হলে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে গভীর রাতে সিট থেকে নামিয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. রাজিব হোসেনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম সৌরভ। তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

হল কমিটি ঘোষণার পর সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটে গত ২৬ শে মার্চ। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রতিটি হলে আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্পেশাল’ খাবারের ব্যবস্থা করে হল প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সেই খাবারের ১১২টি প্যাকেট ছিনিয়ে নিয়ে যায় শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছাত্রলীগের সভাপতি চিরন্তন চন্দ ও সাধারণ সম্পাদক মোমিন ইসলাম। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যে তারা এ ঘটনা ঘটান।

এ ঘটনার দিনেই হল প্রাধ্যক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৯ মার্চ উক্ত ঘটনার জন্য হল প্রাধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশ করেন সভাপতি চিরন্তন চন্দ ও সাধারণ সম্পাদক মোমিন ইসলাম।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে হলের সিট বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। কোনো শিক্ষার্থী কখন হল ছাড়বেন সেটাও রুমে রুমে গিয়ে খোঁজ নেন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী সিট বাতিল করার আগেই সেই সিটের দখল নেয় ছাত্রলীগ। কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে সাংগঠনিক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি শাখা ছাত্রলীগ।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ডেকে হলের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছি। কেউ অন্যায় করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা আমরা নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত