বাগধারা সত্য হওয়ার দেশে

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪৩ পিএম

‘বালির বাঁধ’ বা বালুর বাঁধ বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত এক বাগধারা। ‘ক্ষণস্থায়ী’ কোনো কিছু বোঝাতে এই বাগধারা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতীকী অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেও যে বালুর বাঁধ সত্য হতে পারে সেটা জানা গেল দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে। শনিবার ‘বালুর বাঁধে প্রতিবছর কোটি টাকা পানিতে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ড্রেজারের মাধ্যমে নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে অস্থায়ী রিং বাঁধ। পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা স্লুইস গেটের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ‘অস্থায়ী রিং বাঁধ’ বলা হলেও বিগত ৩৪ বছর ধরে স্থানীয় কৃষকদের ধান রক্ষার নামে বালু দিয়ে এভাবে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রতিবছরই সেই বাঁধ ভাঙার কাজ চলছে। প্রতি বছরই বাঁধটি নির্মাণের এক থেকে দেড় মাসের মাথায় মাছ আহরণ ও নৌকা চালানোর সুবিধার জন্য অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কেটে দেয় স্থানীয় মৎস্যজীবী ও নৌযান শ্রমিকরা। অবিশ্বাস্য মনে হলেও একই কায়দায় গত ৩৪ বছর ধরে এই বালুর বাঁধ গড়া ও ভাঙার কাজ চলছে।

দেশ রূপান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বাঁধটি নির্মাণের ফলে স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন না হলেও বিগত তিন দশকের বেশি সময়ে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় শতকোটি টাকা। যে অর্থ দিয়ে সেখানে কয়েকবার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা না করায় প্রতি বছর ভাঙা-গড়ার কাজই চলছে। শুধু কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে সরকারের এ বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে। এমন অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শাহজাদপুর উপজেলাসহ চলনবিল অঞ্চলের অন্তত আটটি উপজেলার ৪৫ হাজার হেক্টর জমির ইরি-বোরো ধান ও অন্যান্য ফসল বন্যার পানির হাত থেকে রক্ষার জন্য ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকার একটি বাঁধ নির্মাণ করে। এ বাঁধের সুবিধাভোগী উপজেলাগুলো হলো সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর, ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া এবং নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া ও বড়াইগ্রাম।

কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যায় বাঁধটির বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া অংশের রাউতারা অংশের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ২৫০ মিটার পরিমাণ ভেঙে যায়। পরের বছর সেখানে বালু দিয়ে ‘অস্থায়ী রিং বাঁধ’ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নির্মাণ শেষে বাঁধের এ অংশ ভেঙে না গেলেও প্রতি বছর জুন মাস শেষে মাছ আহরণ ও নৌকা চালানোর সুবিধার জন্য কেটে দেন মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। এতে চোখের সামনে সরকারের কোটি টাকা জলে ভেসে যায়। আর স্থানীয়রা বাঁধের পাইলিংয়ের বাঁশ, খুঁটি ও বালুর বস্তা লুট করে বিক্রি করে। এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় কর্মকর্তা আবু জুবায়ের বলেন, ইরি-বোরো ফসল রক্ষার্থে পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা স্লুইস গেট সংলগ্ন লো-হাইট অস্থায়ী রিং-বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ধান কাটা শেষ হয়ে গেলে এখানকার পাহারা সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সুযোগে স্থানীয়রা বাঁধটি কেটে দিয়ে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় করে। প্রশ্ন হলো, বিগত ৩৪ বছর ধরে প্রতিবছর এমন একটি অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদন পায় কীভাবে? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কিংবা একনেক থেকেই বা কীভাবে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়?

খেয়াল করলে দেখা যাবে, কেবল সিরাজগঞ্জেই নয়, দেশের অন্য অনেক স্থানেও হয়তো এমন বালুর বাঁধ ভাঙাগড়ার খেলা চলছে আর বছর বছর সরকারে লাখো-কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২১ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ভেঙে গিয়েছিল খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাতির ঘেরি এলাকার শাকবাড়িয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একাংশ ভেঙে গিয়েছিল। সেখানেও বন্যা নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘বালুর বাঁধ’। অথচ ওই বাঁধের ১ হাজার ২০০ মিটার অংশ মেরামতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মাটি দিয়ে বাঁধটি মেরামতের কথা। সেখানে বালু ব্যবহার করায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে বিব্রত হয়েছিলেন কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও। প্রশ্ন হলো, এভাবে ‘বালুর বাঁধ’ নির্মাণ করে জনগণের করের টাকা আক্ষরিক অর্থেই ‘পানিতে ফেলে’ চিরায়ত বাগধারাগুলো সত্য প্রমাণের দায় কে বা কারা নেবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত