রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সৈয়দা রত্নার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বর্তমানে ছেলেসহ তাকে কলাবাগান থানায় আটকে রাখা হয়েছে।
রবিবার সকালে ওই মাঠে পুলিশের পক্ষ থেকে স্থাপনা নির্মাণের ভিডিও ধারণ করার সময় সৈয়দা রত্না ও তার ছেলে প্রিয়াংসুকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৭টা পর্যন্ত তাদের থানায় বসিয়ে রাখা হয় বলে রত্নার মেয়ে শেউঁতি শাহগুফতা দেশ রূপান্তরকে জানান।
তিনি বলেন, ৮ ঘণ্টা ধরে আমার মা আর ভাইকে আটকে রাখা হয়েছে। আমার ভাইয়ের বয়স ১৮ হয়নি। আমার ভাইকে লকআপের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে। মার সঙ্গে আমাকে একবার কথাও বলতে দেওয়া হয়নি। আমার মায়ের সঙ্গে কোনো কথা বলার বা আইনি শলাপরামর্শ করার অধিকার কি আমার নেই?
ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) শরিফ মো. ফারুকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে ওই নারীকে আটক করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় লোকজন ও শিশুদের এনে কাজে বাধা দিয়েছেন। আটক করা দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এলাকাবাসী জানান, রবিবার সকাল থেকেই মাঠ ঘিরে বিপুলসংখ্যাক পুলিশের জড়ো হতে থাকে। এরপর এক পর্যায়ে রত্নাকে পুলিশ প্রথমে ঘিরে ফেলে পরে তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।
পুলিশের দাবি, সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন সৈয়দা রত্না। তাই তাকে পুলিশের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে সৈয়দা রত্নাকে আটকের পর নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দ্রুত মুক্তি ও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। ইমিধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানান, কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠ দখলের বিরুদ্ধে শুরুতে বেশ সোচ্চার ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা রত্না। এ বিষয়ে রত্না স্থানীয় লোকজন ও পরিবেশবাদী নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। এ মাঠে কলাবাগান থানা নির্মাণ করার জন্য পুলিশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাঠ নিজেদের কব্জায় রাখতে গত মাসখানেক ধরে পুলিশের চার-পাঁচ সদস্যের একটি দল মাঠে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছে বলেও জানা যায়।
এ নিয়ে পুলিশের হাতে আটক সৈয়দা রত্নার সঙ্গে বেশ কয়েকবার বাগবিণ্ডা হয়েছে।
রবিবার সকাল থেকে দেয়াল নির্মাণ কাজ শুরু করে পুলিশ। এ বিষয়ে ফেইসবুক লাইভে এসে প্রতিবাদ করছিলেন রত্না। একপর্যায়ে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।
রত্না উদিচী শিল্পী গোষ্ঠীর একজন কর্মী।
উদিচীর নেতা কংকন নাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৈয়দা রত্না পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা থানায় গিয়ে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাকে ছাড়ার বিষয়ে পুলিশ ইতিবাচক কোনো কথা বলেনি। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামীকাল (সোমবার) সংবাদ সম্মেলন করব।’
এলাকাবাসী আরো জানান, গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পান্থপথে কনকর্ড টাওয়ারের সামনে কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে থানার ভবন নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। ‘কলাবাগান এলাকাবাসী’র ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় শিশু-কিশোর ও এলাকাবাসী অংশ নেয়।
মানববন্ধনে এলাকাবাসী জানিয়েছিল, কলাবাগান এলাকার খোলা একটি জায়গা তেঁতুতলা মাঠ হিসেবে পরিচিত। শিশুদের খেলাধূলার পাশাপাশি সেখানে ঈদের নামাজ, জানাজাসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন হয়। স্থানীয় লোকজন জায়গাটি মাঠ হিসেবেই ব্যবহার করে আসছেন।
এলাকাবসীর অভিযোগ, এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে খেলতে যাওয়া কয়েক শিশুর কান ধরে উঠবস করায় পুলিশ। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে রত্নাকে আটকের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান অধিকারকর্মী খুশি কবির, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বেলার সংগঠক আলমগীর কবির, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, থানা ভবনের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক অনুমতি দেওয়ার পর তারা কাজ শুরু করেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় শেষে সর্বশেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে জেলা প্রশাসককের মাধ্যমে এই স্থানটি থানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
