রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী-কর্মচারী ও ঢাকা কলেজ ছাত্রদের সংঘর্ষে কুরিয়ার সার্ভিসকর্মী নাহিদ মিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার আবদুল কাইয়ুমকে (২৪) নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমে অস্ত্র হাতে কাইযুম নামের যে যুবকের ছবি ছাপা হয়েছে তার সঙ্গে গ্রেপ্তার আবদুল কাইয়ুমের ছবির কোনো মিল নেই এমন দাবি করেছে তার পরিবার ও ঢাকা কলেজের ছাত্ররা।
কাইয়ুমের বাবা নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার মতিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পত্রিকায় যে কাইয়ুমের ছবি ছাপা হয়েছে তার সঙ্গে আমার ছেলের ছবির কোনো মিল নেই। নাম এক হওয়ার করণে সে বিপদে পড়ে গেছে। ভুল করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভালো ভাবে ছবি দেখলেই বোঝা যায়। আমাদের এলাকার সকলেই আমাকে বলেছে পত্রিকার কাইয়ুম আর আমার ছেলে কাইয়ুম এক না। পুলিশের কাছে অনুরোধ আরও ভালো করে তদন্ত করুক তারা।’
তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, কাইয়ুম আমার একমাত্র ছেলে। ছোট বেলা থেকেই ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলে। কলেজের গণ্ডগোলের পরও আমাকে বলেছে ‘ওসব ঝুট ঝামেলার মধ্যে আমি নেই, পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। দু একদিনের মধ্যে বাড়ি চলে আসব।’
ঢাকা কলেজের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন দাবি করেন, ‘যে কাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে প্রকৃত অপরাধী না। পত্রিকায় অস্ত্র হাতে ছবি ছাপা হওয়া ওই ছেলের নাম সাইমন সেতু বলে জানতে পেরেছি। সে ঢাকা কলেজেরই ছাত্র। তবে থাকে লালবাগ এলাকাতে। আমরাও তাকে খুঁজছি। কোনো নিরপরাধ ছেলে ফেঁসে যাক তা আমরা চাই না।’
তবে এ বিষয়ে ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার আব্দুল কাইয়ুম অস্ত্র হাতে সংঘর্ষে অংশ নেয়। সে নিজে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি নিশ্চিত হয়েছে।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তিন দিন আব্দুল কাইয়ুমের ফোনে আড়ি পেতে বসে ছিলাম। সে ভয়ে একবারের জন্যও হল থেকে বের হতো না। সিগারেট আনতে হলেও অন্যদের সাহায্য চাইত। ঈদে সে বাড়িতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার এক বড় ভাই ঈদের জামা কাপড় কিনে দিতে চেয়েছিল। তাও সে ভয়ে হল থেকে বের হয়নি। গ্রেপ্তারের পর সে সংঘর্ষে অস্ত্র নিয়ে থাকার কথা স্বীকারও করেছে।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ডিবির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ, তথ্য উপাত্ত যাচাই করেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নাই।
নাহিদ হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে ঢাকা কলেজের পাঁচ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তারা হলেন- ঢাকা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবদুল কাইয়ূম (২৪), সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের পলাশ মিয়া (২৪) ও মাহমুদ ইরফান (২৪), বাংলা বিভাগের ফয়সাল (২৪), ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের মো. জুনায়েদ বুগদাদী (১৯)।
গ্রেপ্তার পাঁচ ছাত্রের দুই দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন ছিল শুক্রবার। রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে এদিন দুই দফায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাদের। এ সময় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করা হবে না এবং হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। হত্যার উদ্দেশ্যে তারা নাহিদকে মারপিট করেনি এবং হত্যা মামলার আসামি হবেন এমন কল্পনাও করেননি বলে ডিবির তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেন তারা।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রিমান্ডের প্রথম দিনে একজন আরেকজনকে শনাক্ত করেছে। সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রসহ বেশি সক্রিয় ছিল নর্থ ও সাউথ হলের ছাত্রলীগ নেতা–কর্মীরা। দুই হলের অন্তত ২৫ জনের হাতে ধারালো রামদা ছিল। তবে বেশি দা ছিল সাউথ হলের ছাত্রদের হাতে। তারা দাবি করেছে, তাদের মধ্যে উত্তেজনা কাজ করছিল। নাহিদ হত্যার পর তারা বাড়ি চলে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিল। তবে গ্রেপ্তার আতঙ্কে সময় ক্ষেপণ করছিল।
রিমান্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি রমনা বিভাগের ধানমন্ডি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. ফজলে এলাহী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুক্রবার দিনভর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। এ সময় আমরা মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।’
এদিকে ব্যবসায়ী কর্মচারী ও ছাত্রদের সংঘর্ষ নিয়ে শুক্রবার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, যখনই কোনো ঝামেলা হয় আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি, বারবারই একটি মহল উসকে দেন। তবে তারা যারাই হোক না কেন অন্যায় করে পাবে না।
উল্লেখ্য, গত ১৮ এপ্রিল রাতে নিউমার্কেটে দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংঘর্ষের জেরে পরদিনও দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুরুতর আহত হয়ে কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী নাহিদ মিয়া ও নিউমার্কেটের দোকান কর্মচারী মোরসালিন মারা যান। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় ২৪ বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ সর্বমোট পাঁচটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের ১ হাজার ৭৫০ জন ছাত্র ও ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে।
