ধোঁকা দেওয়া পাপ

আপডেট : ০৬ মে ২০২২, ১১:০৬ পিএম

ধোঁকাবাজি, প্রতারণা মানুষের নিকৃষ্টতম আচরণগুলোর অন্যতম। এগুলো সমাজের অসৎ মানুষের হাতিয়ার। সত্যপন্থি মানুষ কখনো প্রতারণার আশ্রয় নেয় না। কিন্তু ইদানীং ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর রসিকতা বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। কে কাকে কতটুকু বোকা বানাতে পারে তা নিয়ে প্রতিযোগিতাও চলে। অনেক তরুণের কাছে অন্যকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো একধরনের আধুনিকতা। ধরনটা এমন, কাউকে বোকা বানাতে পারা বিরাট এক সফলতা। অন্যকে বোকা বানিয়ে বিজয়ের হাসিও হাসতে দেখা যায় কাউকে কাউকে। অথচ ধোঁকায় পড়ে বোকা বনে যাওয়া মানুষটি এমন কাজে ভীষণ ব্যথিত হন, কষ্ট পান। এটা অনেকেই অনুভব করেন না, বরং উল্লাস করেন। ইসলামে এ ধরনের কাজ রসিকতা নয় বরং প্রতারণার শামিল।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে ইউটিউবে ইদানীং ট্রল ভিডিও তৈরির প্রবণতা বেশি করে লক্ষ্য করা যায়। যার হাতে ভালো মানের একটি মোবাইল সেট আছে, একটু ভিডিও এডিটিংয়ের কলাকৌশল সম্পর্কে জানেন, ব্যস আর যায় কই। তিনি নেমে পড়েন ট্রল ভিডিও বানাতে। অন্যকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে সেটা ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন। রাস্তাঘাটে, পার্কে চলতে ফিরতে উঠতি বয়সের তরুণদের এমন ট্রল ভিডিও বানাতে দেখা যায় প্রায়ই। অথচ যাদের ট্রলের শিকার বানানো হচ্ছে, তাদের সঙ্গে রসিকতার নামে ভয় দেখানো, সামাজিক মর্যাদাহানি এবং অপদস্থের ঘটনাই বেশি ঘটছে। যাকে কেন্দ্র করে ট্রলের আয়োজন করা হচ্ছে, তিনি আদৌ বিষয়টি পছন্দ করছেন কি-না তার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কোনো কথা এবং কাজ ইসলামে ঘৃণিত অপরাধ। মিথ্যা সব পাপের মূল। মিথ্যা শুধু ইসলামেই ঘৃণিত অপরাধ নয়, দুনিয়ার সব ধর্ম এবং সভ্যতায় এটি ঘৃণিত অপরাধ। মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ এ মিথ্যা মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ সহিহ বোখারি

কোরআনে কারিমে মিথ্যাবাদী সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ সুরা আলে ইমরান : ৬১

কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায়, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যুক।’ সুরা আন নাহাল : ১০৫

ইসলামের বিধান স্পষ্ট, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যারা আনন্দ-উপভোগ করেন; তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।

কেউ কেউ বলেন, আমরা সত্যিকারভাবে মিথ্যা বলি না বরং মজা করার জন্য একটু মিছেমিছি মিথ্যা বলি, একটু মজা নিই আনন্দ করি। এ প্রসঙ্গে মানবতার বিশ্বস্ত বন্ধু হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য, যে লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।’ সুনানে তিরমিজি

বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) অনিবার্য ধ্বংসের কথা গুরুত্ব দিয়ে বোঝানোর জন্য তিনবার উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা পরিহার করা ও সত্য বলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সত্যকে অবলম্বন করো। কারণ সত্যবাদিতা ভালো কাজে উপনীত করে। আর ভালো কাজ উপনীত করে জান্নাতে। মানুষ সত্য বলে ও সত্যবাদিতার অন্বেষায় থাকে। একপর্যায়ে সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিখিত হয়ে যায়। আর মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। কারণ মিথ্যা উপনীত করে পাপাচারে। আর পাপাচার উপনীত করে জাহান্নামে। যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে ও মিথ্যার অন্বেষায় থাকে, এভাবে একসময় আল্লাহর কাছে সে চরম মিথ্যুক হিসেবে লিখিত হয়ে যায়।’ সহিহ মুসলিম

মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কিংবা ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো একধরনের জঘন্য প্রতারণা। সেটা মজা করার জন্য হোক কিংবা আনন্দ নেওয়ার জন্য হোক না কেন। সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট সময় ও সীমা রয়েছে। নির্দোষ রসিকতা এবং নির্লজ্জ উপহাসের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য রসিকতা এবং মানুষকে কষ্ট দিয়ে মজা নেওয়া দুটির মাঝে পর্বতসমান ব্যবধান বিদ্যমান। মজার ক্ষেত্রে একজন অন্যজনের সঙ্গে মিথ্যার সঙ্গে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড করেন। ইসলামে প্রতারণামূলক এসব কাজ চরমভাবে ঘৃণিত। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কারও সঙ্গে প্রতারণা করল, সে আমার উম্মত হতে পারে না।’ সহিহ মুসলিম

নবী মুহাম্মদ (সা.) কঠিন হৃদয়ের মানুষ ছিলেন না। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন, খোশগল্প করতেন। এমনকি হালকা রসিকতাও করতেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রসিকতায় হাস্যরসের তুলনায় শিক্ষা ছিল মূল প্রতিপাদ্য। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যঙ্গ করেছেন কিংবা কোনো সাহাবিকে হেয় করে মজা করেছেন এমন কোনো ঘটনার বিবরণ হাদিসে পাওয়া যায় না। তিনি সবার বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন। সাহাবিরা মন খুলে আপনজনের মতো রাসুলের সঙ্গে কথা বলতেন, তার সংস্পর্শে আসতেন এবং স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে মিশতেন।

বর্তমান সমাজের যেসব যুবক, বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে ধোঁকা দিয়ে বন্ধুকে বোকা বানিয়ে অট্টহাসি হাসেন, তাদের জন্য কোরআন-হাদিসে রয়েছে প্রভূত নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জিন্দেগি থেকে শিক্ষণীয় বিষয়। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘(সত্য কথা এই যে) তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না এবং তাদের এই বিষয়ে কোনো উপলব্ধিও নেই।’ সুরা বাকারা : ৯

আসুন আমরা সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে পারস্পরিক আচরণে আরও যতœশীল হই, একে অপরের প্রতি আন্তরিক হই। ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো কিংবা মজা করার জন্য হেয় করার মতো প্রতারণা নয়, বরং হাস্যোজ্জ্বল আচরণ দিয়ে একে অপরের হৃদয় জয় করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত