শ্রীলঙ্কার প্রধান বিরোধী দল সামাগি জনা বালাওয়েগয়া (এসজেবি) জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার জন্য তাদের নেতা সাজিথ প্রেমাদাসাকে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
এসজেবির জাতীয় সংগঠক তিসা আত্তানায়েকে রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নেতা প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন’।
রাজাপাক্ষে এক টেলিফোন আলাপে প্রেমাদাসা এবং এসজেবির অর্থনীতি বিষয়ক গুরু হার্শা ডি সিলভা উভয়ের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। শক্তিশালী বৌদ্ধ ধর্মযাজকদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া গ্রুপও অন্তবর্তী সরকার গঠনের দাবি জানাচ্ছে।
শনিবার এসজেবি ঘোষণা দেয় যে, তারা আইনজীবীদের সংগঠন বার অ্যাসোসিয়েশন অফ শ্রীলঙ্কা (বিএএসএল)-এর কাছ থেকে আসা প্রস্তাবকে সমর্থন করবে। তারা রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন ব্যবস্থা বাতিল করার পাশাপাশি ১৮ মাসের জন্য একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছে।
বিএএসএল সংবিধানের ২০তম সংশোধনী বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমেই ২০২০ সালে রাজাপাক্ষে অবাধ ক্ষমতা পেয়েছিলেন।
বিএএসএল সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী পুনঃস্থাপনের আহ্বানও জানিয়েছে, যেখানে প্রেসিডেন্টের ওপর সংসদকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এসজেবি নেতা হারিন ফার্নান্দো জানিয়েছেন, তারা এই প্রস্তাব নিয়ে বিএএসএল এর সঙ্গে আলোচনা করবেন।
২০১৫ সালে গৃহীত ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যনির্বাহী রাষ্ট্রপতির ওপর সংসদকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সীমিত করা হয়।
কিন্তু ২০১৯ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোতাবায়া রাজাপাক্ষে জয়ী হওয়ার পরে ১৯তম সংশোধনী বাতিল করা হয়।
এদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনাও শনিবার প্রেমাদাসার সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন, এসজেবিকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি করানোর জন্য।
কিন্তু প্রেমাদাসা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, তিনি দুই রাজাপাক্ষে- গোতাবায়া এবং মাহিন্দার নেতৃত্বাধীন কোনও সরকারে অংশ নেবেন না।
এসজেবি ইতিমধ্যেই এসএলপিপি জোট সরকার এবং প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সংসদের স্পিকারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এবং সেই প্রস্তাবের ওপর শিগগিরই বিতর্ক শুরু করার জন্য স্পিকার মাহিন্দা ইয়াপা আবেবর্দেনার উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ওদিকে, বৌদ্ধ ধর্মযাজকরাও অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রাজাপাক্ষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
এক মাস ধরে রাস্তার বিক্ষোভের মুখে থাকা শ্রীলঙ্কা সরকার গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ফের জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের ক্ষমতা দিয়েছে।
১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে শ্রীলঙ্কা।
গত ৯ এপ্রিল থেকে আমদানিকৃত খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতির প্রতিবাদে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন শহরে থেমে থেমে বিক্ষোভ চলছে। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পুরো শ্রীলঙ্কা জুড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশটিতে আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে গেছে; নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং জ্বালানি, ওষুধ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে তীব্র ঘাটতি চলছে।
গত মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার ঘোষণা দিয়ে নিজেকে কার্যত দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করে দ্বীপরাষ্ট্রটি। দেশটির আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার ঋণের মধ্যে ৭০০ কোটি চলতি বছরেই শোধ করার কথা ছিল। বাকিটা ২০২৬ সালের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বর্তমানে ১০০ কোটিরও কম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে তাদের।
বিক্ষোভাকারীদের ক্রমবর্ধমান চাপ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে এবং তার বড় ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাক্ষে পদ ছাড়তে অস্বীকার করছেন।
গত শুক্রবার মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্ষে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। মাত্র এক মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা।
রাজাপাক্ষে তার ব্যক্তিগত বাসভবনের সামনে গণবিক্ষোভের পরেও গত ১ এপ্রিল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। তার ওই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনার পর তিনি ৫ এপ্রিল তা প্রত্যাহার করে নেন।
