বাংলাদেশের অর্থনীতি চলে স্বমহান গতিতে, একটি আন্তঃসহায়ক সলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) বলে, শত সহস্র কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী আমজনতার নিরলস পরিশ্রমের ফসলে ঋদ্ধ হয়। একটা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (বা জিডিপি) হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওই দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম, পুঁজি ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবাজাত দ্রব্য উৎপাদন করা যায় টাকার অঙ্কে তার হিসাবকে বোঝায়। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ঐ উৎপাদন গত বছরের তুলনায় এ বছর কী হারে বাড়ছে তার পরিমাণ বোঝায়। জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি সংগঠিত হয় শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, পুঁজি সঞ্চয় (ভৌত ও মানব), প্রযুক্তির পরিবর্তন ইত্যাদির অবদানের কারণে আর এগুলোকে বলে উৎপাদনের উপকরণ বা ফেকটরস অব প্রডাকশন।
অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে অর্থাৎ সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ঘটলে মানুষের কর্মসংস্থান, আয় এবং জীবনকুশলতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে এবং একই সঙ্গে এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটায়। জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে জিডিপি’র অগ্রগতি সাধিত হয় বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জীবনযাত্রার মান বাড়ার কথা।
সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্থির থাকলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি সাপেক্ষে সমাজে সবারই কিছু না কিছু আয় বৃদ্ধি ঘটে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যান্য সব সমস্যার সমাধান করে দেয় যেমন: সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন, সুস্থতা, শিক্ষা (খাদ্য ও সার্বিক নিরাপত্তা) ইত্যাদি। যা কিনা আবার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। লক্ষ করতে হবে সব কিছুর ওপর এটা সত্য যে জিনিস বা সম্পদ উৎপাদিত হতে হবে এবং সম্পদ ও সেবা যা উৎপাদিত হবে তাই-ই জিডিপি হিসাবায়নের জন্য জরুরি। টাকা থাকলে বাঘের চোখ কেনা যায় বটে কিন্তু টাকা থাকলেই যে উন্নয়ন চোখে দেখা যাবে এমন কোনো কথা নেই। পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যতিরেকে টাকা উপার্জিত হলে সে মওকা টাকা জিডিপি’র উপাদান হিসেবে কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কোনো অবদান হিসেবে হিসাব কষার কোনো সুযোগ নেই।
রাজশাহীর আলু উৎপাদনকারী জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখেন যখন ১ কেজি আলু ৬ টাকা দামে বিক্রি করেন পাইকারের কাছে। এখানে জিডিপিতে ১ কেজি আলুর উৎপাদন ৬ টাকায় স্বীকৃত হয় কিন্তু এই আলু ঢাকায় আসার পথে চাঁদাবাজি বাবদ কেজিপ্রতি ১৫ টাকা অতিরিক্ত চাঁদাবাজি ও আদায়সূত্রে অর্জন করলে সে টাকা জিডিপি’র হিসাবে আসবে না, কেননা অতিরিক্ত এ টাকা দ্বারা অতিরিক্ত কোনো সম্পদ তৈরি হয়নি। এটি অর্জিত হয়েছে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই।
এ অর্থ উপার্জন জিডিপি পদবাচ্য নয়। বরং এই ১৬ টাকা অপব্যবহৃত হয়ে অর্থনীতিতে অনুৎপাদনশীল খাতে অপব্যয়িত হয়ে দেশ ও সমাজকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে কেননা এই ১৬ টাকা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির কাজে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়ে সমাজে নির্ধারিত আয়ের মানুষের জন্য জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তোলে। সমাজে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য সৃষ্টি করে।
২৫ কোটি টাকায় একটি সেতু নির্মাণ প্রাক্কলন করে প্রকৃত ব্যয় ৬৫ কোটি টাকায় উন্নীত হলে ৪০ কোটি টাকার বর্ধিত ব্যয় জিডিপি’র হিসাবে অর্থবহ রূপে ধর্তব্য হবে না, এ জন্য সেতু তো সেই একটিই পাওয়া গিয়েছে। বাড়তি ৪০ কোটি টাকা দিয়ে একাধিক সেতু তো তৈরি হয়নি।
সুতরাং প্রকৃত সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি ব্যতিরেকে এডিপি’র বিশাল ব্যয় জিডিপি’র বপুতে টাকার অঙ্কে যোগ করার যৌক্তিকতা নেই। কর্মচারীকে বেতন দেওয়া হয় কাজের বিনিময়ে অর্থাৎ তার দ্বারা সম্পদ ও সেবা সৃষ্টির বিপরীতে এই ব্যয়। কিন্তু তাকে দিয়ে কোনো কাজ না করিয়ে তাকে বসিয়ে বসিয়ে যদি বেতন দেওয়া হয় তাহলে কোনো গুডস অ্যান্ড সার্ভিস উৎপাদন ব্যতিরেকেই তার পেছনে অর্থ ব্যয় করা হবে। এই ব্যয় জিডিপি’র শরীরে অপাঙ্তেয়।
সুতরাং সম্পদ ও সেবা উৎপাদনই বড় কথা জিডিপি’র হিসাবায়নে। ৩৫০০০ ইলিশ মাছের দাম ৭ কোটি টাকা। এই দাম ১৪ কোটি টাকা হলে কোনো উপকার নেই যদি আরও ৩৫০০০ অতিরিক্ত ইলিশ উৎপাদিত না হয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে প্রকৃত উৎপাদন, ক্রয়ক্ষমতা, চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয় না হলে খামোখা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি জিডিপি’র জন্য দুঃসংবাদ, অর্থনীতির পুষ্টিহীনতার লক্ষণ। উন্নয়নের জন্য অবশ্য আয় বৃদ্ধি দরকার হবে যদিও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটলেই জনগণের উন্নয়ন ঘটবে এটা নিশ্চিত নয়; আর এ জন্যই বলা হয়ে থাকে যে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি উন্নয়নের দরকারি শর্ত পূরণ করে, যথেষ্ট শর্ত পূরণ করে না। আয় বৃদ্ধি ঘটলে অমরত্ব না হলেও অন্তত রোগ- শোক, দুর্দিন-দুশ্চিন্তামুক্ত অপেক্ষাকৃত একটা দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই দীর্ঘ জীবন কত দীর্ঘ? অনুমান করা যেতে পারে গড়পড়তা ৭০-৭৫ বছর বাঁচতে পারাটা স্বস্তিদায়ক, ৭৫-৮০ বছর টিকে গেলে আরও বেশি ভালো এবং ৮০ বছরের ওপর বাঁচতে পারলে তো কোনো কথাই নেই। তবে দেখার দরকার হবে সময়ের বিবর্তনে মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ুও বাড়ছে কিনা।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ১৮২০ সালে ভারতে গড় আয়ু ছিল ২১ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৪০ বছর, কিন্তু ১০০ বছরের ব্যবধানে ভারতে গড় আয়ু মাত্র ৩ বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ বছর আর একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বছর আয় বেড়ে ৫০ বছরে পৌঁছে; তারও প্রায় ১০০ বছর পর (১৯৯৯) ভারতে প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৬০ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৭৭ বছর এবং বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১৯৮১ সালে ছিল প্রায় ৫৫ বছর আর ২০১০ সালে প্রায় ৬৮ বছর।
সুতরাং অমর্ত্য সেন যেমনটি বলেছেন- ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাথাপিছু আয়কে গৌরবান্বিত করে কিন্তু এ প্রক্রিয়া আয়ের বিতরণ, বিন্যাস ও মাত্রাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না’। মোটা হওয়া মানে বলবান হওয়া নয়। আবার অনেকে আয় শূন্য অবস্থায় তলানিতে পড়ে থাকলেও কিছু লোকের পর্বত-প্রমাণ আয় বৃদ্ধি মাথাপিছু গড় আয় ওপরের দিকে ঠেলে দিতে পারে যেমন : কারও আয় বৃদ্ধি ঘটাতে পারে ২০০-৩০০ শতাংশ হারে; কারও ১-২ শতাংশ হারে এবং এভাবেই সমাজে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্য প্রকট হতে পারে। একটা নির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া যাক, বাংলাদেশে ১৯৭৩/৭৪ সালে গড়পড়তা মাথাপিছু আয় ছিল ১০০-১৫০ ডলার এবং সেই সময় বৈষম্য নির্দেশক গিনিসহগ ছিল বড়জোর ০.৩৫ অথচ মাথাপিছু আয় যখন ৯৮৩ ডলার দাঁড়ায় তখন কিন্তু গিনিসহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৪৭; ২০২০ সালে মাথাপিছু আয় ২০১০ ডলার, গিনিসহগ? সবার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ধনীর বেড়েছে গরিবের চেয়ে অনেক বেশি হারে অর্থাৎ সময়ের বিবর্তনে ৭ বেড়েছে বৈষম্য।
কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যেও প্রধান সমস্য হলো বৈষম্যের স্তর বড় থাকলে প্রবৃদ্ধির দারিদ্র্য হ্রাস সংক্রান্ত প্রভাবটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একটা অপেক্ষাকৃত সাম্যবাদী সমাজে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটুকু দারিদ্র্য হ্রাস করাতে পারে, একটা বৈষম্যমূলক সমাজে তার চেয়ে অনেক কম গতিতে দারিদ্র্য হ্রাস ঘটায়। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ বা অর্থনীতি আছে (যেমন- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা) সেখানে প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি কিন্তু তার বিন্যাস এতটাই বেদনাদায়ক এবং নির্মম যে মনে হবে ওই দেশগুলোতে সার্বিক দারিদ্র্য, অব্যবস্থাপনা ও অসচ্ছতা প্রবৃদ্ধিকে উপহাস করছে।
প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটতে পারে কিন্তু প্রবৃদ্ধি ঘটা মানেই উন্নয়ন নয় এবং উন্নয়ন যেখানে আছে সেখানে অবশ্য মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলেই সেখানে উন্নয়ন ঘটেছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। অপেক্ষাকৃত সাম্যমূলক নীতি গ্রহণ ব্যতিরেকে বস্তুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এক সঙ্গে পাওয়া যাবে না। উন্নয়ন ডিসকোর্সে মানুষের ‘স্বত্বাধিকার’ ও সেই স্বত্বাধিকার থেকে পাওয়া ক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
অমর্ত্য সেন যেমনটি উপলব্ধি করেন- ‘‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরম লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সক্ষমতা সৃষ্টি; মানুষ কী করতে পারছে, কী পারছে না, সেটাই উন্নয়ন তত্ত্বের আলোচ্য হওয়ার কথা। মানুষ দীর্ঘজীবন লাভ করছে? অকাল মৃত্যুকে জয় করতে পারছে? তার কি যথেষ্ট পুষ্টির ব্যবস্থা হয়েছে? সে কি লিখতে পড়তে, পরস্পর চিন্তার আদান-প্রদান করতে শিখেছে? সাহিত্যচর্চায় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পারঙ্গম হয়েছে? ... মানুষের সক্ষমতা প্রসারের প্রক্রিয়াটিই আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন’’। প্রবহমান সময়ের সঙ্গে চলতে পারাটাই প্রকৃত প্রবৃদ্ধি। দৈহিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে শরীরে পরিমিত পরিমাণে পটাশিয়াম, সোডিয়াম, নাইট্রোজেনের উপস্থিতি আবশ্যক, যার অবর্তমানে চিকিৎসা শাস্ত্রমতে ইলেকট্রলিক ইমব্যালান্স অবস্থা দৈহিক চলৎশক্তি বা কার্যক্ষমতা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
