‘হামার স্বামী এতদিন আছলো, ভিক্ষা করি সংসার চলাইছে, হামরাগুলা খাইছি। স্বামী মরার দেড় বছর হইল। এলা হামার স্বামী নাই, দুঃখেরও শেষ নাই। বেটা একটা তাও মোর ভরি সইতে পায় না। বেটা বউ বাচ্চাকে নিয়া ব্যস্ত।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের জুম্মা পাড়া গ্রামের মৃত মঙ্গা শেখের স্ত্রী ছকিনা বেগম (৬৫)।
তিনি জানান, তাদের আধা কালি জমিতে সরকারি আশ্রয়ণের ঘর পেয়েছেন। সেই ঘরের এক রুমে ছেলে, এক রুমে মেয়ে-জামাই থাকেন। তিনি থাকেন সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের তৈরি করা বাথরুমে।
তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বারেরা টেহা চায় টেহা দিবার পাং নাই দেহি মোর বয়স্ক, বিধবা ভাতা করি দেয় নাই। একবেলা খাইলে আরেক বেলা নাই, মুই এলা মেম্বারোক টেহা দেং কেমন করি।’
তিনি আরও বলেন, এখন খাই কি, চলি কেমন করি তোমারে উপরা আবদার করলোং। তোমরা ছাড়া হামাক দেহার আর কাইও নাই। হামাক দেখলে আল্লাহ খুশি হইবে, মুইও খুশি হইম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছকিনা বেগমের স্বামী মঙ্গা শেখ ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে গত দেড় বছর আগে মারা গেছেন স্বামী মঙ্গা শেখ। তাদের এক শতক জমিতে সরকারি ভাবে দুই রুম বিশিষ্ট একটি আধা পাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। সেখানেই তার এক ছেলে এক মেয়ে থাকে। ছেলে মেয়েরাও দিনমজুরের কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন।
এদিকে ছকিনা বেগম সরকারি ঘরের সঙ্গে যে বাথরুম পেয়েছেন সেই বাথরুম ব্যবহার না করেই সেখানে থাকেন তিনি। জীবন বাঁচার তাগিদে তিনিও স্বামীর রেখে যাওয়া পেশা বেঁচে নিয়েছেন। তার দাবি ছেলে তাকে ভরণপোষণ দেন না। ছকিনা বেগম একটা বিধবা কিংবা একটা বয়স্ক ভাতার জন্য অনেক বার মেম্বারের কাছে গিয়ে বার্থ হয়েছেন। তার অভিযোগ টাকা দিতে না পারায় হয়নি কোনো বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতা কার্ড।
ছকিনার বিষয়ে প্রতিবেশী নুরনবী মিয়া বলেন, ছকিনার অনেক কষ্ট চোখেও ঠিকমতো দেখতে পান না। মাঝে মাঝে ভিক্ষা করেই কোনো রকমভাবে চলছে। তারা একটা সরকারি ঘর পেয়েছেন, সেই ঘরের পাশে বাথরুম আছে সেটা ব্যবহার না করেই সেখানে থাকেন ছকিনা। তার ছেলে মেয়েরাও দিনমজুরের কাজ করেন। তারাও একদিন কাজ না করলে না খেয়ে থাকতে হয়। এ রকম মানুষ যদি কোনো ভাতা না পায় তাদের বিষয়ে আসলে কিছু বলার ভাষা থাকে না।
স্থানীয় শাহিদা বেগম নামের একজন নারী বলেন, ছকিনা খুব কষ্ট করে চলেন। ছেলে-মেয়ের কাছে ভাত চাইলে ছকিনাকে অন্যায় কথা শুনতে হয়। সে ভালোমতো চোখেও দেখে না কোথাও থেকে যে কাজ করে নিয়ে এসে খাবে তাও পায় না। আপনারা যদি একটু সহযোগিতা করেন অন্তত একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দেন তাও একটু ভালো চলতে পারবে ছকিনা।
এ বিষয়ে জানতে সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল বাতেন সরকারের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমি এই মুহূর্তে একটি সালিসে আছি পরে কথা বলব।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারিভাবে বরাদ্দ পেলে আমরা সার্কুলার দিই। যারা আবেদন করেন যাচাই বাছাই করে তাদের ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হয়। ওই বৃদ্ধা মনে হয় অনলাইনে আবেদন করেননি। আগামী জুলাই মাসের দিকে বরাদ্দ পাওয়া যাবে, অনলাইনে আবেদন করলে তাকে ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
