বাজেট ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ১০:২৬ পিএম

করোনায় বিধ্বস্ত আর্থসামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের, কিয়েভ ক্রেমলিন যুদ্ধের অভিঘাত মোকাবিলার এই সংকটকালে আগামী ৯ জুনে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিতব্য বাজেটের কাছে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে মুখিয়ে। সবাই নতুন বাজেট ঘোষণার সময় সরব হয় বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে। এটা যেন সদাশয় সরকারের কাছ থেকে দয়াদাক্ষিণ্য, সুবিবেচনা প্রাপ্তির ব্যাপার। কিন্তু ‘প্রত্যাশিত’ বরাদ্দ ঘোষিত হওয়ার পর তার ‘প্রাপ্তির’ খতিয়ানে, প্রাপ্তিতে ফারাকের কারণ জানতে, দূরত্ব কমানোর কী উপায় তা নিয়ে বছরব্যাপী নিশ্চুপ, নিরুপায় অবস্থায় থাকাটা আরও দুঃখজনক। একটি গণপ্রজাতন্ত্রী সমাজে আমজনতার ন্যায্য বরাদ্দ পাওয়া বা তার ব্যবহারের বা জবাবদিহির অধিকারটি পদ্ধতি প্রক্রিয়ার ঘেরাটোপে, তাচ্ছিল্যের পরিস্থিতিতে উপনীত হওয়াটা আরও দুঃখজনক। সেসব ঔপনিবেশিক সময়ের মতো ‘জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা গঠিত, জনগণের’ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সদয় হয়ে বাজেট বরাদ্দ দিয়েই কৃতার্থ করা সকলকে, জাতীয় সামর্থ্য ও জনস্বার্থকে বিকিয়ে দেওয়ার কলাকৌশলের কাছে সমবণ্টন নিশ্চিত না করে ‘দুর্বলের রক্ষা করো, দুর্জনের হানো’ না হয়ে, সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ-অনুশাসনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্যায় অনিয়ম দুর্নীতিকে সুরক্ষার মহাসুযোগ অবারিত হতে থাকলে, শত সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী (সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রারম্ভেই উচ্চারিত উদ্ভাসিত “আমরা বাংলাদেশের জনগণ”-এর দেশে) পরিবেশ পরিস্থিতিতে তা ‘নিজেরে অপমান’ বলে প্রতীয়মান হতে থাকবে। বাজেট প্রস্তাবনা, পাস ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতির সুরতহাল পর্যালোচনায় গেলে দেখা যাবে ক্রমশ অনেক উন্নয়ন উন্নতি, সমূহ সংস্কার, সাফল্য, অগ্রগতির পাশাপাশি অনেক মৌলিক অধিকার অর্জন এখনো বাকির খাতায়, তার তালিকাও বেশ বড়। চেষ্টা চলছে, চেষ্টা অব্যাহত থাকুক, তবে করোনা বিপর্যয় মোকাবিলার এ পর্যায়ে চলতি বাজেটবর্ষের বরাদ্দ বাস্তবায়নের নির্মোহ মূল্যায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এই অভিজ্ঞতার আলোকে আগামীর কলাকৌশল কর্মকৌশল আঁকতে হবে, থামাতে হবে, রশি টানতে হবে।

প্রত্যাশা এই যে, আগামীর পরপর কয়েকটি বাজেট হতে হবে মানুষকে কাজ দেওয়ার এবং কাজে রাখার বাজেট। বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের এই পর্বে গুরুত্বহীন ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসৃজন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়াবার কোনো বিকল্প নেই। কোনো সুযোগ রাখা সমীচীন হবে না বাস্তবায়ন না করে বরাদ্দকৃত অর্থ ও সুযোগ বেহাত অব্যাহত রাখা। সরকারি খাতের বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ করতেই সহায়কনীতি ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসতে হবে। যাতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন বিনিয়োগে। আসন্ন বাজেটে এসব কৌশল নেওয়া হলে কর্মসৃজন বাড়বে। তখন মানুষ কাজ পাবে। এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যা অর্থনীতির অচল চাকা সচল হতে হবে এবং বাড়ার পথে থাকবে প্রকৃত জিডিপি। এ কারণে মানুষকে কাজের মধ্যে রাখতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাকে বাস্তবায়ন অনুগ, গৃহীত পদক্ষেপকে প্রভাবক ভূমিকায় আনা দরকার হবে। ভ্যালু ফর মানি স্পেন্ড, গুডস অ্যান্ড সার্ভিস প্রডিউস হলেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্থবহ হবে। সংখ্যায় জিডিপির অঙ্ক বাড়লে এবং সেই সংখ্যাভিত্তিক জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণে উল্লম্ফন ঘটবে ঠিকই, কিন্তু সম্পদ ও সেবার পরিমাণ না বাড়লে এবং সেই সম্পদ ও সেবা সবার মধ্যে পরিব্যাপ্ত, বণ্টিত না হলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি বৈষম্য বৃদ্ধির সহগ ও সূচকে পরিণত হবে। কাজীর খাতায় গরুর হিসাব থাকলে হবে না, গোয়ালে গরুও থাকতে হবে।

করোনায় গত দুই বাজেট বছরে অর্থনীতি স্থবির ছিল। উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের বড় খরচগুলো ঠিকমতো হয়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ আগের চাইতে তেমন বেশি দেওয়া হয়নি, পরে বাড়ানো হলেও তার ব্যবহার নিয়ে অপারগতা অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য কম থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় করতে পারেনি রাজস্ব। ব্যাংক, বিদেশ ও ব্যক্তি খাত থেকে কঠিন শর্তের ঋণ নিয়ে সরকারকে চলতে হয়েছে। মানুষ বেকার হয়েছে। কমেছে আয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কোনো ফর্মুলা মানেনি, ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথা রাখেননি, সব মিলে একটি অস্থির পরিবেশ। করোনা বর্গি নিকট প্রতিবেশী দেশে আবার যেভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে, ইতিমধ্যে সবাই অতি স্বাভাবিক অবস্থার অবয়বে যেভাবে চমৎকারভাবে চলাচল শুরু করেছে, সেখানে বাংলাদেশ করোনার নবযাত্রাকে কতটা থামাতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কা প্রবল হচ্ছে। ডেঙ্গু ডায়রিয়া হাত ধরাধরি করে করোনাকে টেক্কা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিয়েভ ক্রেমলিন যুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধের নতুন মেরুকরণের পথে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক অনিশ্চিত পর্বে অবস্থান করছে তাকে বিবেচনার অবশ্যই অবকাশ থেকে যাবে নতুন বাজেটে।

আশা করা যায়, বাজেটে সংকট মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট পথনকশা ও কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন থাকবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো কমানোর পরিসংখ্যান দিলে হবে না, কীভাবে তা ব্যবহার বা অর্জন সম্ভব হবে সে ব্যাপারে কর্মপন্থা ও কড়া পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে, প্রেসক্রাইব করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বড় কথা নয়, বড় কথা হবে বরাদ্দ অর্থনীতি ও পরিস্থিতিতে কীভাবে কতটুকু প্রভাবক ভূমিকা পালন করতে পারবে সেটা নিশ্চিত হওয়া বা করা। গুণগত মানের খরচ ও সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়াটা এখন জরুরি। কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। এতে কর্মসৃজন হবে। বেকারত্বে দুর্নাম ঘুচবে। সরকারের অনেক অগুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে, সেগুলো থেকে অর্থ কাটছাঁট করে কর্মসংস্থানমূলক খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে অর্থবহ করতে হবে, নইলে শিক্ষায় করোনার ভাইরাস জাতির ভবিষ্যৎ সুস্থতাকে যাতে বিকলাঙ্গ করে না দিতে পারে সে ব্যাপারে রাখতে হবে সজাগ দৃষ্টি।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে, ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে না, এটা মেনে রেখেই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনীতিকে সচল সক্রিয় করেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। মানুষকে কর্মমুখী করতে হবে। মানুষ কাজ করলে আয় হবে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কেনাকাটা করবে। ফলে বাড়বে ব্যবসাবাণিজ্য। এতে বাড়বে রাজস্ব আয়। ব্যবসা না বাড়লে রাজস্ব আসবে না। চলতি বাজেট বছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। অর্থনীতির মন্দা অবস্থায় এটা অর্জন করা ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ। আমদানি শুল্ক বেশি পাওয়ার সুবাদে রাজস্ব আয় বাড়াটা সাময়িক স্বস্তির ব্যাপার হলেও আখেরে এটা টেকসই হবে বলে মনে করা ঠিক হবে না। এ প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরে আরও বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরার বাজেট হবে অবাস্তব। রাজস্ব আয়ের বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট করতে হবে। রাজস্ব বোর্ডকে সে মর্মে দায়িত্বশীল করতে হবে। তাহলে বাজেটের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে বাস্তবায়ন ও গ্রহণযোগ্যতাও। সবার আগে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতির চাকা থেমে থাকলে বাজার থেকে রাজস্ব আসবে না।

করোনার কারণে যেমন বিনিয়োগ কম হয়েছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে টাকা পাচারও কিছু কাল কম ছিল। এসব টাকার কিছু অংশ ঘোষিত কালো টাকা পোষণমূলক সুযোগ প্রদানের আওতায় সাদা হয়েছিল। সেখান থেকে সামান্য কিছু রাজস্ব জুটেছে। কিন্তু কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে করের হার ও জরিমানা কমানোয় প্রাপ্য রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হয়েছে, সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের প্রতি কর-অবিচার করা হয়েছে এবং কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না বলার মাধ্যমে দুর্নীতিজাত অর্থ উপার্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে, এটি সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংঘর্ষিক এবং পরিপন্থী। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার মানে শুধু দুর্নীতিকে পুনর্বাসনে সীমিত থাকবে না, ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট’ হিসেবে দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকার বঞ্চিতকরণ বা অস্বীকৃতির নামান্তর। মেগা প্রকল্প ব্যতিরেকে সরকারি বিনিয়োগ কম হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ কম। অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে করতে পারছেন না। বিনিয়োগ সহায়ক উৎসাহ উদ্যোগ বা পলিসির পরিবর্তে আছে নানা জটিলতা। অনিশ্চয়তা। বড়রা প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা নিয়ে কাজের কাজে বিনিয়োগ করতে পারেননি, আর ক্ষুদ্রমাঝারিরা সে টাকা এখনো পুরোপুরি পাননি। কালো টাকা যথাযথ পরিমাণে কর দিয়ে অর্থনীতির মূল ধারায় এনে সেগুলোকে টাকার মালিকের দায়িত্বে ও জিম্মায় কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প, জনসম্পদ প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবকাঠামো নির্মাণে, এমনকি হাওর ও উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করার জন্য বিশেষ কর অবকাশ, ভর্তুকি, প্রণোদনা দেওয়া হলে আম-ছালা দুটোই রক্ষা পাবে।

গত দুই বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এর মাধ্যমে মানবসম্পদের উন্নয়ন হচ্ছে না। শিক্ষা খাতের বিনিয়োগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে, শিক্ষা খাতের বরাদ্দ অপচয়িত হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোদমে চালু করা প্রয়োজন। সমাজ বা গ্রামভিত্তিক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। কারণ দেশের সব স্থানে করোনার থাবা নেই। শহরে ও নগরে করোনার প্রকোপ ঠেকানোর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে সেখানে অনলাইনে হলেও লেখাপড়ায় ব্যস্ত রাখা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে করোনার প্রকোপ নেই বললেই চলে, সেখানে শিক্ষায়তন বা ব্যবস্থাপনা চালু রাখার বিয়ষটি বাস্তবতার আলোকে অগৌণ বিবেচনা প্রয়োজন। সেখানকার শিক্ষকরা স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে লাগসই পদ্ধতি প্রক্রিয়া অবলম্বন করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় এনগেজ রাখবেন, মোট কথা জরুরি মুহূর্তে স্থানীয় পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা পদক্ষেপ গ্রহণে যেতে দিতে হয়। জাতীয় সমস্যার অজুহাতে স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে থামানো কমানো সমীচীন হয় না, অন্তত শিক্ষার মতো অনিবার্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে বৈষম্য সৃষ্টির সহগ হতে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না।

লেখক কলাম লেখক সরকারের সাবেক সচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত