তথ্য বা ডেটার দুনিয়া

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ১১:১৮ পিএম

ইংরেজিতে লেখা হয় data, আমরা বাংলায় বলি ডাটা বা ডেটা। শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Datum শব্দের বহুবচন। Datum অর্থ হচ্ছে তথ্যের উপাদান। তথ্যের অন্তর্গত ক্ষুদ্রতর অংশসমূহ হচ্ছে ডেটা বা উপাত্ত। প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত অসংঘবদ্ধ তথ্যকে ডেটা বলে। ডেটা বর্ণ, সংখ্যা ও চিহ্নের সমন্বয়ে গঠিত হয়। অনেকের মতে ‘ডেটা’ হলো তথ্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অ-শ্রেণিবদ্ধ তথ্য। আজকের দুনিয়ায় এই তথ্যই হয়ে উঠেছে চালিকাশক্তি একুশ শতকের পেট্রোলিয়াম।

মাত্র কয়েক দশক আগে পৃথিবীর সব বিলিয়ন ডলার কোম্পানি ছিল এনার্জি/পাওয়ার কোম্পানিগুলো ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, জেনারেল ইলেকট্রিক, শেল। কারণ, তখন তেল চালাত বিশ্ব। এখন বিশ্ব চালায় ডেটা। যার কাছে বেশি ডেটা, সেই চালাচ্ছে পৃথিবী। ডেটা থেকে প্রজ্ঞা নিয়ে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গুগল, ফেইসবুক, টুইটার, অ্যামাজন, আলিবাবা, নেটফ্লিক্স, স্পেসএক্সের মতো ডেটা পরিচালিত কোম্পানি। এই কভিডের সময়েও তাদের ব্যবসা ও ডেটার কমতি নেই, যখন অন্য ব্যবসাগুলো বিপদে পড়েছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের তথ্যের আদান-প্রদানের পরিধিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা সারাক্ষণ একে অন্যের কাছে বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছি বা অন্যের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছি। ইন্টারনেটের বিস্তৃতির পর এই তথ্যের আদান-প্রদানের মাত্রা অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্যের সাগরে প্লাবন এসেছে কয়েক দশক ধরেই। ক্রমেই তা আরও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। ইন্টারনেট এবং সমাজমাধ্যমের বাড়বাড়ন্তই তার প্রধান কারণ। এই তথ্যের পরিমাণ কীভাবে বাড়ছে, একটা হিসাব দিলে তা স্পষ্ট হবে। ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে মোট যত তথ্য সঞ্চিত ছিল, পরের দু’বছরেই তৈরি হচ্ছে ততখানি তথ্য। তার পরের দুবছরে তার দ্বিগুণ, পরের দু’বছরে চার গুণ এভাবেই বাড়তে থাকবে তথ্যের পরিমাণ।

আমাদের প্রতিটা অভ্যাস, দিনযাপনের রোজনামচা ইন্টারনেটের সর্বগ্রাসী প্রবাহে এই তথ্যভান্ডারের অংশ হয়ে চলেছে। কোন ভাঁড়ারে আমাদের কোন তথ্য কীভাবে জমা হচ্ছে, মেঘের আড়ালে থেকে কোন তথ্যের দখল নিচ্ছে কোন মহাজন, সেটাই আজকের দুনিয়ার হর্তাকর্তাদের প্রধান মাথাব্যথা। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে গোপনীয়তা, নিরাপত্তা থেকে নির্বাচন, সব কিছুরই চাবিকাঠি হয়ে উঠছে এই বিপুল তথ্য এবং তার অপব্যবহার। ডেটা-কে নিয়ন্ত্রণের হরেক চেষ্টায় তাই ব্যগ্র দুনিয়া। তথ্যকে কীভাবে মানবিক করে তোলা সম্ভব, তার বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ, আর আইন প্রণয়ন চলেছে দুনিয়া জুড়ে, দেশে দেশে, নিজেদের মতো করে। ২০১৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চালু করেছে জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন। তুরস্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া দুনিয়ার অনেক দেশই নিজেদের তথ্য নিরাপত্তা আইন তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের কাঠামো অনুসরণ করে। এমনকি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গিয়েও আইনটি বজায় রেখেছে ব্রিটেন। চীন সম্প্রতি চালু করেছে ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপত্তা আইন কীভাবে তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণ করা হবে, তার রূপরেখা। বাংলাদেশে তথ্যের সুরক্ষা, গোপনীয়তার ব্যাপারে কঠোর আইন আছে। তবে দেশের তথ্য যাতে দেশের সার্ভারে জমা থাকে, বিদেশি বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো যাতে বাংলাদেশের তথ্য নিয়ে নয়-ছয় করার সুযোগ না পায়, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। গোটা বিশ্বেই তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টির চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে গোপনীয়তার মৌলিক অধিকারের মানদণ্ডে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১১ সালের একটি রিপোর্ট তথ্যকে সম্পদের শ্রেণিভুক্ত করেছিল। বলেছিল, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টির সুযোগের এক নতুন তরঙ্গ তৈরি করতে পারে তথ্য। এক দিকে তথ্যই যেমন হয়ে উঠেছে একুশ শতকের সর্বপ্রধান অস্ত্র, সেই সঙ্গে দুনিয়া আজ বিশ্বাস করে যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হতে পারে তথ্যবলে সমৃদ্ধ হয়েই। তাই মহামূল্যবান এই তথ্যভান্ডারের কেবল সংরক্ষণই নয়, অন্যান্য সম্পদের মতো এর ব্যবহারের চেষ্টাও শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের আমেরিকান তথ্যচিত্র দ্য সোশ্যাল ডাইলেমা-তে এক প্রাক্তন গুগল কর্মীকে বলতে দেখা যায়, যেভাবে জলের খরচের পরিমাণ দেখে জলকর নেওয়া হয়, তথ্যের জন্যও ট্যাক্স নেওয়া উচিত সেভাবেই। বড় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ‘ডেটা ট্যাক্স’ নেওয়ার এই চিন্তাভাবনা ক্রমশ সাড়া পাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। জার্মানিতে, আমেরিকায়; সম্প্রতি চীনেও। চীন আবার সরকারিভাবেই ডেটা-কে ঘোষণা করেছে ‘প্রোডাকশন ফ্যাক্টর’। জমি, শ্রম, মূলধন এবং প্রযুক্তির মতো ‘তথ্য’ও এক নতুন উৎপাদক। তাদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বলা হয়েছে যে, ‘তথ্য’ বাড়িয়ে দিতে পারে উৎপাদনশীলতা। এমনকি তথ্য বিপণনের ব্যবস্থাও করছে চীন। গত বছরের নভেম্বরে শুরু হয়েছে শাংহাই ডেটা এক্সচেঞ্জ, একেবারে স্টক এক্সচেঞ্জের ধাঁচে। সরকারিভাবে নিয়ম মেনে যেখানে হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের বেচাকেনা।

তথ্য তো জমা হয়ে চলেছে অবিরত। ডেটা হয়ে উঠেছে ‘বিগ ডেটা’। ফেইসবুক, গুগল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মতো সংস্থার ঘরে এখনই এত তথ্য রয়েছে, যা সামলে উঠতেই তারা হিমশিম। কিন্তু, বিপুল তথ্যের হৃদয় মন্থন করে ‘জ্ঞান’ ছিনিয়ে আনতে না পারলে, এই তথ্যসমুদ্র দিয়ে হবেটা কী? অ-শ্রেণিবদ্ধ তথ্য তো অপরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের মতো। তাকে পরিশ্রুত করে অন্য কিছুতে পরিণত না করলে তার ব্যবহার কোথায়? সে প্রচেষ্টাও তাই চলেছে পুরোদস্তুর। কয়েক দশক ধরেই। এক নতুন পেশা তৈরি হয়ে গেছে ‘ডেটা সায়েন্টিস্ট’। গণিত, কম্পিউটার, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানেজমেন্ট সব কিছুর খিচুড়ি পাকিয়ে এক নতুন ধরনের বিশেষজ্ঞ। ‘হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ’ ২০১২ সালে বলেছিল, এটাই একুশ শতকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাকরি।

যেখানেই ডেটা, সেখানেই ডেটা সায়েন্স। ডেটা সায়েন্স হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান যা ডেটাকে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেয় বা ডেটাকে কর্মক্ষমে পরিণত করে। ডেটা সায়েন্স ডেটাকে নিয়ে আলোচনা করে। ডেটা আবার অনেকের সম্পত্তি। গণিতবিদের সম্পত্তি, পরিসংখ্যানবিদের সম্পত্তি আর কম্পিউটার বিজ্ঞানীদেরও সম্পত্তি। তাই ডেটা সায়েন্সের মালিক এরা সবাই। মূলত ডেটা সায়েন্সের ভিত্তি হচ্ছে গণিত এবং পরিসংখ্যান আর প্রয়োগের হাতিয়ার হচ্ছে কম্পিউটার সায়েন্স। বর্তমানে ডেটা সায়েন্টিস্টদের প্রায়ই অনেক বড় বড় ডেটা নিয়ে কাজ করতে হয়। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় বিগ ডেটা। বিগ ডেটা হচ্ছে খুব বৃহদাকার এবং জটিল ডেটা-সম্ভার, যা গতানুগতিক ডেটা প্রক্রিয়াকরণ অ্যাপ্লিকেশন সফ্টওয়্যার দিয়ে সমাধান করা যায় না। বিগ ডেটার জন্য আমাদের অন্যরকম কম্পিউটার, সফ্টওয়্যার ও সমাধান দরকার হয়।

ফেইসবুক, গুগল ও অ্যামাজনের মতো জায়ান্ট টেক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে বিগ ডেটাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এদের সার্ভারে প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন ডেটা জমা হচ্ছে এবং এতসব তথ্যের মধ্যেও কাক্সিক্ষত তথ্য খুঁজে পেতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে যা কেবল মাত্র বিগ ডেটার কারণেই সম্ভব হয়েছে। ফেইস রিকগনিশন, ভয়েস রিকগনিশন, ভয়েস সার্চ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট আরও কত কী! কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিতে ভর করে সমষ্টিগতভাবে কোটি কোটি মানুষের এই বিপুল তথ্যকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কি আদৌ আছে ডেটা সায়েন্টিস্টদের? ১৯৯১-এর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী রোনাল্ড কোয়াস বলেছিলেন, ‘ডেটা-কে অত্যাচার করে তাকে দিয়ে যা খুশি স্বীকার করিয়ে নেওয়া যায়।’ তাই ‘ডেটা’ যা বলছে, সেটাই তার সর্বোত্তম বিশ্লেষণ-ভিত্তিক ফল কি না, তা কে বলবে! রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের মতো সংবেদনশীল বিষয় জড়িয়ে থাকলে অ-শ্রেণিবদ্ধ তথ্যের যথাযথ বিশ্লেষণের গুরুত্ব অপরিসীম। তার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সঠিক প্রযুক্তি, আর উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের সুনিপুণ সাধনা।

গত শতকের ষাটের দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ স্টার ট্রেক-এর এক চরিত্র ছিল ‘ডেটা’। আত্ম-সচেতন, সপ্রতিভ, সংবেদনশীল। কিন্তু মানুষ নয়, সে ছিল এক ‘রোবট’। স্টার ট্রেক-এর চরিত্র ডেটা ক্রমশ মানুষের মতো হয়ে উঠতে থাকে। শেষে তার মধ্যে যোগ করা হয় ‘ইমোশন চিপ’। হয়তো ডেটা-র ‘মানুষ’ হওয়াটা প্রায় পূর্ণতা পায় এ ভাবেই। তার প্রতিটা দিনই নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনায় ভরা। তথ্যের দুনিয়া এই রকমই। গোপনীয়তা আর নিরাপত্তা যদি মুদ্রার এক পিঠ হয়, তার অন্য পিঠ তাই অজ্ঞাত, অনির্ণেয়, কিন্তু অমিত সম্ভাবনায় ভরা এক জাদু-দুনিয়া। চিচিং ফাঁক মন্ত্রটা কেবল ঠিকঠাক বলা চাই।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত