‘তুলে নেয়ার’ পর থানা থেকে ডিবি কার্যালয়: কী ঘটেছিল জানালেন মিজানুর

আপডেট : ১৫ জুন ২০২২, ০৭:০৯ পিএম

গত বৃহস্পতিবার (৯ জুন) সকাল ১১টার দিকে জুরাইনের বিক্রমপুর প্লাজার সামনে থেকে মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে ‘তুলে নেয়ার’ অভিযোগ করে তার পরিবার। তাদের অভিযোগ ছিল, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত মিজানুর রহমানকে ঢাকার জুরাইন রেলগেট সংলগ্ন একটি মার্কেট থেকে ‘তুলে নেয়’ শ্যামপুর থানা পুলিশ।

মিজানুরকে ‘তুলে নেয়ার’ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি শ্যামপুর থানা-পুলিশ ও ডিবি। মিজানুরের পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী ও বন্ধুদের মধ্যে দেখা দেয় উদ্বেগ-আতঙ্ক। তবে প্রায় ৬ ঘণ্টা পর মিজানুর রহমান মিজানকে ছেড়ে দেয় ডিবি পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মিজানুর রহমান জানান, ‘তুলে নেয়ার’ আগেই এলাকা ও এলাকার বাইরের স্বজনরা তাকে ডিবি খুঁজছে জানিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

বুধবার মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে আরো বলেন, ‘আমি ভাবলাম সরে যাওয়ার কোনো কারণ নাই। প্রথমত আমি কোনো অন্যায়-অপরাধ করি নাই। দ্বিতীয়ত এই মামলায় অজ্ঞাতনামা অনেক আসামি আছে। এর মানে আমরা বুঝি। যাকে-তাকে ধরা। যার শিকার হয় বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ। তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো তো কোনো লোক দেখছি না। সবচেয়ে বড় বিষয় লুকানো আমার কাছে অমর্যাদাকর লাগছিল। এ কারণেই আমি লুকানোর চিন্তা বাদ দিলাম’।

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে তাকে জুরাইন রেলগেট সংলগ্ন বিক্রমপুর প্লাজা মার্কেটের সামনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখা ও বোঝার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের একজন পরিদর্শককে এক সোর্স  ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন বলে জানান মিজানুর।

image

মিজানুর বলেন, ‘তখন আমার মনে হলো যে, তারা আমাকে ধরতে পারে। অপ্রয়োজনে ধরা দেওয়া ঠিক হবে না ভেবে আমি মার্কেটের ভেতরে ঢুকতেই তখন পুলিশ দৌঁড়ে আমার সামনে এসে নাম জানাতে চায়, তারপর বলে, ‘আপনার সঙ্গে আমাদের ডিসি স্যার একটু কথা বলবেন’’।

তিনি বলেন, এক ফাঁকে মেয়েকে মোবাইল ফোনে বিষয়টা জানাই। মুহূর্তে ঘটনাস্থলে আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত হন। আমাকে ঘিরে ধরে গাড়িতে ওঠান। তখন এক বন্ধুকে জানাই যে, আমাকে শ্যামপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গাড়িতে ওঠানোর পর পুলিশ আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করে। কথা বলার সময় জোর করে আমার মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়’।

মিজানুর বলেন, ‘সেখানে (শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে) একজন নারী অফিসারও ছিলেন। উনি সম্ভবত এডিসি (কাজী রোমানা নাসরিন, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, ওয়ারি বিভাগ, ডিএমপি)। ওখানে তারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করলেন। ধমক ও গালিগালাজ করে কথা বললেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি এই কথা (পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ) কেন বলছি? আমি তখন বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে চাইলে তারা তা ঠিকমতো করতে দিচ্ছিলেন না। একটা পর্যায়ে আমাকে ওই রুমে থাকা নারী কর্মকর্তা মারার নির্দেশও দিলেন। এর আগে আমি দেখছিলাম পুলিশ পাশে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুরুতে লাঠি ছিল না। পরে এনেছে। নির্দেশ পাওয়ার পর আমার শরীরে লাঠি দিয়ে বেশ কয়েকটা জোরে বাড়ি দিল’।

উল্লেখ্য, মিজানুরকে ‘তুলে নেয়ার’ আগের দিন জুরাইনে একজন পুলিশ সার্জেন্টের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪৫০ জনকে আসামি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলার পাশাপাশি সেদিনই ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে মিজানুর লেখেন, ‘দুটি ঘটনা ঘটবে বলা যায়। এক. মামলা–বাণিজ্য। দুই. মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ–বাণিজ্য। এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছি যেখানে এ ঘটনার নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু তদন্ত চাইব, সে অবস্থাও নেই’।

মারধর শুরুর পর নিজের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করে মিজানুর বলেন, ‘আমি মর্যাদার সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য নানান কষ্টকর পথে জীবন নির্বাহ করি। এটা (মারধরের ঘটনা) মানসিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত করল আমাকে। সুন্দরবন রক্ষার হরতালে অল্প সময়ে দুবার পুলিশের মাইরের দ্বিতীয় বার যখন থানার ভিতর নিয়ে অনেক পুলিশ মিলে বুটজুতা দিয়ে এলোপাথারি মারছিল তখন মুহূর্তের মধ্যে আফসোস হয়েছিলে এই ভেবে যে, জীবনে তেমন কিছু করতে পারলাম না, এভাবে পুলিশের মাইর খেয়ে মরতে হচ্ছে। রাস্তায় লড়াইয়ে পুলিশের কাছে মাইর খাইছি সেইটা একটা বিষয়। কিন্তু কথা বলার জন্য আমাকে এইভাবে ডেকে এনে গালিগালাজ করা, গায়ে হাত তোলার মতো বিষয়টা আমার প্রচণ্ড আত্মমর্যাদায় লাগল। আমি জীবনে কখনো এমনভাবে ভেঙে পড়ি নাই। আমার মুখ দিয়ে আর কথা বের হচ্ছিল না। আমার প্রচণ্ড রাগ হলো, ক্ষোভ হলো’।

মিজানুর বলতে থাকেন, ‘কিছুক্ষণ পর আরেকজন সিনিয়র অফিসার আসলেন। তিনি আর খারাপ আচরণ করেননি। কিছু কথাবার্তা হলো তার সঙ্গে। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি যে কথা বলেছেন, তা প্রপার চ্যানেলে বলতে পারতেন’।

থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পুরো সময়টা তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় জানিয়ে মিজানুর বলেন, ‘এর মধ্যে ওসির রুমে অফিসারদের একজন আরেক জনকে বলছিলেন, ‘স্যার ও তো বিএনপির লোক, কমিটিতে নাম আছে’। এ ছাড়া থানায় রেগে গিয়ে আরেকজন বলছে, ‘স্যার ওরা তো পরিবারসুদ্ধা আন্দোলন করে। মেয়েরাও আন্দোলন করে’। তখন থানার কোনো এক অফিসার বলছে, ‘ওইগুলারেও তুইল্যা নিয়া আয়’।

মিজানুর আরো জানান, থানায় ঘণ্টাখানেক অবস্থানের পর তাকে চোখ বেঁধে ও হাজতে থাকা আরেক ব্যক্তির সঙ্গে একই হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয় ডিবি কার্যালয়ে নেয়ার জন্য। মোটামুটি আধা ঘণ্টার মধ্যে তারা ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছান।

তিনি বলেন, ‘গাড়িতে আমাকে তেমন কিছু বলে নাই। নিজেরা নিজেদের কথা বলতেছিল। এরমধ্যে একজন বলেন, ‘মুরব্বি কেন যে এগুলো করতে যান। এখন তো সারাজীবন বাতের ব্যাথায় ভুগবেন’। ডিবি কার্যালয়ে ‘বড় অফিসারের’ কক্ষে নেয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়।

মিজানুর বলেন, ‘ওই রুমে থাকা সবার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সিনিয়র কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমে তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। তিনি আমার সঙ্গে মূলত নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করেছেন। সে সময় ওই রুমে ৫-৬ জন ছিলেন। সিনিয়র কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলার সময় জুনিয়রদের মধ্যে কেউ কেউ আমার ওপর রেগে যাচ্ছিলেন। খারাপ আচরণ করছিলেন। সিনিয়র কর্মকর্তা তখন তাদের থামাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে এগুলো থাকা দরকার। অনেক সময় আমরা তো অনেক ভুল-টুল করি। তাদের (মিজানুর) মতো লোকজন কথাবার্তা বললেও তো আমাদের ভুলগুলো ধরা পড়ে’।

মিজানুর বলেন, ‘ওই সিনিয়র কর্মকর্তা আমাকে উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ধরেন আপনি একটা মামলা খেলেন। মামলা তো নানাভাবেই দেওয়া যায়। ধরেন আপনাকে কেউ ২ পিস, ৫ পিস, ১০ পিস ইয়াবা পকেটে ঢুকায় দিয়ে মামলা দিয়ে দিল। ২০ বছর পর মামলার রায় হলো। আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেন। যারা আপনার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে তারাও জানে আপনি নির্দোষ। কিন্তু এই ২০ বছরের জার্নি আপনি চিন্তা করেন তো’।

image

মিজানুর জানান, এ ছাড়া এই কক্ষে থাকা এক কর্মকর্তা তাকে বিদ্রূপ করে বলেন যে, তিনি ওয়াসার এমডিকে খাওয়ানোর জন্য ড্রেনের পানি নিয়ে গিয়েছিলেন।

এর তিন ঘণ্টা পর মিজানুরকে পাশের আরেকটি কক্ষে নিয়ে প্রথমবারের মতো বসতে বলা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পানি খেতে চেয়েছিলাম। তখন আমাকে বলা হয়, রোজা থাকেন’।

মিজানুর বলেন, ‘তখন তারা জাফর ইকবাল ও আনু মুহাম্মদ এর সঙ্গে তুলনামূলক উদাহরণ দিয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, জ্ঞানীরা এত কথা বলে না। সমালোচনা করতে হয় দায়িত্বের সঙ্গে ইত্যাদি’।

মিজানুর আরো বলেন, ‘সেখান থেকে আমাকে পাশের আরেকটি রুমে নিয়ে আসা হয়, আমি খাওয়া-দাওয়া করেছি কিনা জিজ্ঞেস করা হয়। ওখানে আমাকে ভাত খেতে দেয়। টয়লেটে গেলাম। পানিও দিল। কফি দিল। খাওয়াদাওয়ার পর এক কর্মকর্তার সঙ্গে দেশ-বিদেশের নানান বিষয়ে কথাবার্তার মধ্যে দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথার একপর্যায়ে কর্মকর্তা কৃষিকেই উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা জোরের সঙ্গেই বললেন। ভাত খাওয়ার পর আরেক কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলেন। আমার কেসটা সম্ভবত তার তত্ত্বাবধানে আছে। তিনি আমাকে একজন জিম্মাদার ডাকতে বললেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে ডাকতে বলি। এর মাঝখানে এ কর্মকর্তা  বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, তার বয়স হয়েছে, সন্তান আছে। তাই তার এ ধরণের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো আগে ভাবা দরকার’।

মিজানুর জানান, বিকেল ৪টার পর স্ত্রী ও মেঝ মেয়ে পূর্ণতা ডিবি কার্যালয়ের ভেতরে ঢোকেন। সবমিলিয়ে সেখানে তারা ৩০ মিনিটের মতো ছিলেন। এক পযার্য়ে আমার স্ত্রী কন্যাকে পাশের কক্ষে নিয়ে গেলেন এমাকে এই কক্ষে রেখে ।

মিজানুর বলেন, ‘আমার স্ত্রী যখন (ডিবি কার্যালয়ে) গেলেন তাকে আমার সামনেই বলা হলো, ‘আমরা তো ওনাকে সবার সামনে দিয়ে নিয়ে আসছি। যদি গোপনে ধরে নিয়ে যাই, কাকপক্ষীও টের পাবে না, তখন কি করবেন’? পরে একটা মুচলেকা লিখে নিয়ে আসেন আর এক ডিবি কর্মকর্তা। যতদূর মনে পরে সেখানে লেখা ছিল, আইনবিরুদ্ধ কাজ করব না। রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করব না ইত্যাদি। নানা কিছু বিবেচনায় নিয়ে আমি তাতে স্বাক্ষর করি।

মিজানুর আরো বলেন, ‘ডিবি কার্যালয়ে আমার মেয়েকেও (পূর্ণতা) আমাকে বোঝাতে বলা হয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেছেন, এমন হলে আমার মেয়েদের সরকারি চাকরির সমস্যা হবে। আর রাস্তাঘাটে চলাফেরার ক্ষেত্রে ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

মিজানুরের ভাষ্য, ‘আর মোটামুটি সবাই আমাকে যে কথাটা বলেছে তা হলো, ‘এই যে থানা থেকে এখান পর্যন্ত যা কিছু হলো, এগুলো কাউরে কিছু না বলাই ভালো। সাংবাদিকরা নানানভাবে প্রশ্ন করবে। সাংবাদিক/সংবাদ মাধ্যমের নানা এজেন্ডা থাকে। এগুলো বললে তো সমস্যা। আমাদের সিনিয়রদেরও একটু সমস্যা হয়’।

মিজানুর বলেন, ‘ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমার পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি কি? ভিউ কি? আওয়ামী লীগ-বিএনপি করি কিনা, তা জিজ্ঞেস করে নাই। আমি বলতে নিছিলাম যে, আমি চাই শোষণ-নির্যাতন- নিপীড়নমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র। প্রতিটি মানুষ মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্রে বসবাস করবে। তারা সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনতে চায়নি। অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত