ইউক্রেনে একের পর এক রুশ জেনারেলের মৃত্যুর রহস্যটা কী?

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০১:৪৫ পিএম

মে মাসে পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে একটি অত্যাধুনিক রুশ এসইউ-২৫ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছিল। জ্বলন্ত সেই বিমানটির ছবি অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দেয় বিশ্লেষকদের মধ্যে। প্রশ্নগুলো ওঠে বিমানটির পাইলট মেজর জেনারেল কানামাত বোতাশেভ ও তার মৃত্যু নিয়ে।

প্রথম প্রশ্ন, এত আধুনিক একটি যুদ্ধবিমান একজন ৬৩ বছর বয়স্ক বৈমানিক চালাচ্ছিলেন কেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, প্রায় এক দশক আগে রুশ সশস্ত্র বাহিনীর চাকরি থেকে বিদায় নেয়া একজন অবসরপ্রাপ্ত লোক ওই বিমানে কী করছিলেন?

তৃতীয় প্রশ্ন, কেন আরো একজন রুশ জেনারেল সম্মুখ সমরে প্রাণ হারালেন? এবং, তাকে নিয়ে মোট কতজন রুশ জেনারেল এ যুদ্ধে নিহত হয়েছেন?

মেজর জেনারেল কানামাত বোতাশেভ ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ ও সম্মানিত রুশ পাইলট। সেই দিনটিতে তিনিই বসেছিলেন যু্দ্ধবিমানটির ককপিটে - যদিও তার র‌্যাংক, বেশি বয়স এবং অবসরপ্রাপ্ত মর্যাদার কারণে তা হবার কথা ছিল না।

তার অধীনস্থ হিসেবে অতীতে কাজ করেছেন এমন তিনজনের সাথে বিবিসি কথা বলেছে। তারা বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধকে রাশিয়া যেভাবে বর্ণনা করে সেই ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ থেকে দূরে থাকা মেজর জেনারেল বোতাশেভের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বোতাশেভের একজন সাবেক সহকর্মী বলছিলেন, ‘তিনি এমন স্তরের পাইলট ছিলেন যা লিখতে হলে আপনাকে বড় হাতের পি- দিয়ে লিখতে হবে। আকাশ নিয়ে এত আগ্রহী মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।’

‘আমি যে তার অধীনে কাজ করেছি এজন্য আমি সবসময় গর্ব বোধ করবো’, বলছিলেন আরেকজন।

কিন্তু সত্যি কথাটা হলো- কিভাবে বোতাশেভ ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন সেটা আসলে ঠিক হিসেবে মেলে না। এবং সেটা শুধু তার বয়সের কারণে নয়।

মেজর জেনারেল বোতাশেভ রুশ বাহিনীর একজন চাকরিরত সদস্যও ছিলেন না। তাকে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল এক দশক আগে।

 

নিহত জেনারেলরা

বোতাশেভ হচ্ছেন ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত বেশ কয়েকজন রুশ জেনারেলের মধ্যে মাত্র একজন। ঠিক কতজন রুশ জেনারেল এ যুদ্ধে নিহত হয়েছে- সে সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু সংখ্যা যাই হোক আধুনিক যুদ্ধে মাত্র একজন জেনারেল নিহত হওয়াটাও অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা।

তুলনা হিসেবে বলা যায়, মার্কিন মেজর জেনারেল হ্যারল্ড গ্রিনের নিহত হবার ঘটনার কথা। ২০১৪ সালে তার স্বপক্ষেরই একজন আফগান সৈন্যের হাতে মেজর জেনারেল গ্রিন নিহত হয়েছিলেন। সেটা ছিল ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে একজন জেনারেলের নিহত হবার প্রথম ঘটনা।

ইউক্রেন একবার দাবি করেছিল যে, এ যুদ্ধে অন্তত ১১ জন রুশ জেনারেল নিহত হয়েছে। পরে অবশ্য এসব খবরের বেশ কয়েকটিই ভুল প্রমাণিত হয়। ইউক্রেন যাদের নিহত হবার দাবি করেছিল, সেই জেনারেলরা অনলাইনে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করে তাদের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করেছিলেন।

বর্তমানে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মোট আট জন রুশ জেনারেল ইউক্রেনে নিহত হয়েছেন বলে মনে করা হয়। এদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্য চারজনের খবর নিশ্চিত করা যায়নি, কিন্তু এ মৃত্যুগুলোর কথা অস্বীকারও করা হয়নি।

বোতাশেভ ছাড়া অন্য যাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে তারা হলেন:

মেজর জেনারেল আন্দ্রেই সুখোভেৎস্কি: তিনি ১লা মার্চ নিহত হয়েছেন বলে খবর বেরোয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত রুশ সামরিক অফিসার টুইট বার্তায় জানান, রাজধানী কিয়েভের অদূরে হস্টোমেল এলাকায় একজন ইউক্রেনীয় চোরাগোপ্তা বন্দুকধারীর গুলিতে তিনি নিহত হন।

মেজর জেনারেল ভাদিম ফ্রলভ: গত ১৬ই এপ্রিল ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন বলে খবরে বলা হয়। পরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে তার শেষকৃত্যের ব্যাপারে এক নোটিশে এ মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়। ঠিক কীভাবে তিনি নিহত হয়েছেন তা জানা যায়নি।

মেজর জেনারেল রোমান কুতুজভ: গত ৫ই জুন রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের একজন সাংবাদিক টেলিগ্রামে একটি বার্তা পোস্ট করেন যে ডনবাসে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অভিযানে নেতৃত্ব দেবার সময় কুতুজভ নিহত হয়েছেন।

 

নিহত রুশ জেনারেলের সংখ্যা কত তা জানা যায় না কেন?

সবচেয়ে সহজ কারণ হলো, ইউক্রেনীয়রাও নিশ্চিতভাবে জানে না, আর রুশরা এটা কাউকে বলবে না। রাশিয়ার চোখে সামরিক মৃত্যুকে এমনকি শান্তির সময়ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য হিসেবে দেখা হয়।

গত ২৫শে মার্চ রাশিয়া বলেছিল যে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম এক মাসে ১,৩৫১ জন রুশ সৈন্য নিহত হয়েছে। তবে তার পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা হালনাগাদ করেনি।

বিবিসির একটি চলমান অনুসন্ধানী প্রকল্প আছে- যাতে রুশ সৈন্যদের পরিবার এবং উন্মুক্ত সূত্রের সাথে কথা বলে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এতে ৩,৫০০-রও বেশি জনের নাম আছে তাদের সৈনিক র‌্যাংকসহ। এতে আভাস পাওয়া যায় যে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।

বিবিসির গবেষণায় আরো দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন নিহত রুশ সৈন্যের একজন হচ্ছে মধ্যম বা সিনিয়র র‌্যাংকের অফিসার।

 

থেকে কি ধারণা পাওয়া যায়?

নিহতদের মধ্যে উঁচু র‌্যাংকের সামরিক কর্মকর্তাদের অনুপাত চমকে দেবার মতো। তবে এটাও ঠিক যে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে বিপুল সংখ্যাক সিনিয়র অফিসার আছেন। জেনারেল স্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আাছেন প্রায় ১,৩০০ - যদিও তাদের অনেককেই যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি উপস্থিত থাকতে দেখা যাবে না।

তবে অন্য অনেকে আছেন যারা ততটা ভাগ্যবান নন। বেশ কিছু জেনারেলই নিজেদেরকে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় আবিষ্কার করেছেন। এর একটা কারণ হয়তো এই যে, উচ্চপদের রুশ অফিসারদের এমন কাজ করতে হয় বা এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়- যা অন্য কোন দেশের সেনাবাহিনী অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের অফিসাররা নিয়ে থাকেন।

এ কারণে রুশ সিনিয়র কর্মকর্তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক কাছাকাছি আসতে হয়, যা হয়তো অন্য দেশের সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে হতো না।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা আরো আভাস দিয়েছেন যে রুশ সৈন্যদের নৈতিক মনোবল কম- এ কারণে তারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে।

এই কর্মকর্তাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ার জন্য যোগাযোগের যন্ত্রপাতির ঘাটতিকেও দায়ী করা হয়, কারণ এর ফলে তাদেরকে প্রথাগত ফোন ব্যবহার করতে হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি আসতে হয়, যার ফলে অপারেশনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

সবশেষ কারণ, মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে বলা হচ্ছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে রাশিয়ার অফিসারদেরকে লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা বন্দুকধারী বা কামান দিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে। এসব খবরে আরো বলা হয়, রুশ অফিসারদের গতিবিধি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে ইউক্রেনকে।

image

বোতাশেভের যত দু:সাহসী কান্ড

বোতাশেভ যদি অবসর জীবনকে মেনে নিয়ে বাড়িতে বসে থাকতেন তাহলে কি হতো সে বিতর্ক এখন অর্থহীন। কিন্তু তার পক্ষে কীভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়া সম্ভব হলো- সে প্রশ্নটা করাই যায়।

বোতাশেভের সামরিক জীবন, বলা যায়, সরল রেখায় চলেনি। তাকে ২০১২ সালে সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়- কারণ তিনি এমন একটি বিমান চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন যেটা তার চালানোর কথা ছিল না।

রুশ সামরিক প্রযুক্তি শীর্ষ বিন্দু হচ্ছে এসইউ-২৫ নামের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। আর এই বিমানেরই ককপিটে গিয়ে বসেছিলেন বোতাশেভ। রুশ সামরিক বাহিনীর নিয়ম হচ্ছে, অনেক ঘন্টার বিশেষ প্রশিক্ষণের পরেই একজন বিমান সেনা কোন একটি বিশেষ বিমান চালানোর অনুমতি পান।

কিন্তু বোতাশেভের এসইউ-২৫ বিমান চালানোর অনুমতি ছিল না। কিন্তু কোন এক উপায়ে তিনি এ সুযোগ করে নিয়েছিলেন। বিমানটি মাঝ-আকাশে থাকার সময় বোতাশেভ এর নিয়ন্ত্রণ হারান। কিন্তু তিনি ও আরেকজন সহকর্মী দুর্ঘটনা কবলিত বিমানটি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

ফলে প্রাণে বেঁচে যান বোতাশেভ, কিন্তু এই দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটানোর জন্য তাকে যে মূল্য দিতে হবে- তা তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। সমস্য হলো, যে বিমান চালানোর জন্য তার অনুমোদন নেই তা নিয়ে আকাশে ওড়ার ঘটনা যে তিনি এই প্রথম ঘটালেন তা নয়।

এর আগে ২০১১ সালেও তিনি লুকিয়ে এসইউ-৩৪ নামে আরেকটি উচ্চ প্রযুক্তির বোমারু বিমানের ককপিটে উঠে ‘আনন্দ ভ্রমণে’ বেরিয়েছিলেন। এটি চালানোর জন্যও উপযুক্ত লাইসেন্স তার ছিল না। এসইউ-২৫ বিমানটি ধ্বংস করার কারণে বোতাশেভকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল।

একটি আদালত ২০১২ সালে রায় দেয় যে বোতাশেভকে এ কারণে রাষ্ট্রকে প্রায় ৭৫,০০০ ডলার দিতে হবে। যদিও বিমানটির আসল দাম ছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার। গত মাসে বোতাশেভ যখন মারা যান তখন তার সেই অর্থের অর্ধেকই পরিশোধ করা বাকি ছিল। একটি রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডার থেকে এ কথা জানা গেছে।

বোতাশেভকে এরপর তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি কাজ করতে শুরু করে ডোসাফ নামে একটি রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে- যার সাথে রুশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর যোগাযোগ আছে। তারা সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত নানা বিষয়ে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টিতে কাজ করে থাকে।

বোতাশেভ পেনশন পেতেন ৩৬০ ডলারের মত। অনুমান করা যায় যে তার বেতনও হয়তো খুব বেশি ছিল না। এই আয় নিয়ে তার পক্ষে রুশ সরকারের ঋণ শোধ করা খুবই কঠিন হতো। অভিযোগ করা হয় যে মৃত্যুর সময় বোতাশেভ একটি প্রাইভেট সামরিক কোম্পানির হয়ে কাজ করছিলেন। রুশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব প্রাইভেট কোম্পানির সাথে রাষ্ট্রের কোনও সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত