২৫টি জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) পদ খালি হয়েছে। এসব জেলায় শিগগিরই পদায়ন শুরু হচ্ছে। কে কার আগে পছন্দের জেলায় পোস্টিং পাবেন তার জন্য পুলিশ বিভাগে জোর লবিং ও তদবিরের হিড়িক পড়ে গেছে।
যদিও পুলিশ সদর দপ্তরও চাচ্ছে সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের বাছাই করে কিছুটা চমক দেখাতে। কিন্তু তারা কতটুকু পারবে তা নিয়ে পুলিশের ভেতরে চলছে আলোচনা। পুলিশ কর্মকর্তারাও ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে দেখা করে পোস্টিং পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এসপিদের পদে পদায়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ উঠেছে, তদবিরের পাশাপাশি কেউ কেউ অর্থও লেনদেন করছেন। যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা তা মানতে নারাজ। তবে তদবিরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তদবিরের কারণে ঊর্ধ্বতনরাও বিরক্ত বলে জানা গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পছন্দের পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদবির করছেন। কেউ যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায়। সম্প্রতি পুলিশে বড় ধরনের পদোন্নতি হওয়ায় খালি হয়েছে পদগুলো। গত ১১ মে ৩২ জন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক বা অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতি পেয়ে ডিআইজি হন। তার কিছুদিন পর দুই দফায় ১১৯ জন পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি হন। তা ছাড়া ৩ জুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে ৩৩ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পান। একসঙ্গে এত কর্মকর্তার পদোন্নতি পাওয়া পুুলিশে বিরল।
পুলিশ সুপারদের পাশাপাশি মহানগরসহ কিছু ইউনিটেও বেশ কিছু পদ খালি হয়েছে। তদবির বেশি হওয়ায় পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা অনেকটা নাখোশ। ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। তালিকাটি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আসার পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ঈদের পরের দিন রাতে পুলিশপ্রধানের নৈশভোজেও পোস্টিংয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে অনেকে পুলিশপ্রধানের কাছে নিজেদের মনোভাব তুলে ধরেন। তবে এবার পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে সরকারের অনুগত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কারণে বিষয়টিও মাথায় রাখা হচ্ছে।
ডিএমপির তেজগাঁও ও রমনা জোনের উপপুলিশ কমিশনার পদে সরকারের আস্থাভাজনদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। কারণ এই দুই জোনের গুরুত্ব ডিএমপিতে সব থেকে আলাদা। এ ক্ষেত্রে ২৪ ও ২৫ ব্যাচের দুই কর্মকর্তার নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পছন্দের জেলা পেতে অনেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ টাকা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও পছন্দের কর্মকর্তাদের জেলায় নিতে চেষ্টা করছেন। ওই সব নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও দেখা করছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। ওই দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, এসপিদের নিয়োগ গত সপ্তাহেই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তর যে তালিকা করেছে তা আবার কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তদবিরের কারণে তারা খুবই বিরক্ত।
ওই কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চাইছেন ভালো কর্মকর্তারা জেলার দায়িত্বে থাকুন। বর্তমানে ২০, ২১, ২২, ২৪ ও ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তারা জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে ২৫ ব্যাচ বাদে ওই সব ব্যাচ থেকে অনেকেই পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছেন। এবার যাদের জেলার এসপি পদে দেওয়া হবে তাদের মধ্যে ২৭ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তা থাকবেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, কক্সবাজার, লালমনিরহাট, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, নীলফারামারী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, সিলেটসহ ২৫টি জেলায় এসপি হওয়ার জন্য বেশি তদবির হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একজন উপকমিশনারকে কক্সবাজার জেলায় পোস্টিং করা হতে পারে। যদিও ওই কর্মকর্তাকে ঢাকায় রাখতে চাচ্ছেন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা। ডিএমপির একটি জোনের উপকমিশনার নারায়ণগঞ্জের এসপি হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তার দৌড়ঝাঁপে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বিরক্ত হয়েছেন। জেলার পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও বিভিন্ন মহানগরের উপকমিশনারের পদ ফাঁকা রয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১৬ মে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৪৮ জন এসপিকে র্যাবে উপপরিচালক পদমর্যাদায় বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনটি পাওয়ার পর র্যাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে র্যাব জানায় যে এসব কর্মকর্তাকে র্যাবে পদায়ন করা যাবে না। কারণ অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী থেকে র্যাবে কর্মরত থাকতে পারেন ৯ জন এসপি। যাদের পদবি হবে উপপরিচালক। বছরের পর বছর এই ৯টি পদ ফাঁকা ছিল। পুলিশ থেকে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের র্যাবে যাওয়ার অনীহার কারণে অন্যভাবে এসব পদ পূরণ করা হয়। কোনোভাবেই ৯ জনের বেশি এসপির র্যাবে পদায়নের সুযোগ নেই। এরপর র্যাবে উপপরিচালক পদে ৯ জনকে পদায়নের পর বাকি ৩৯ জনকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সম্প্রতি ১১৯ জনের পদ ফাঁকা হওয়ায় ওই ৩৯ জনকে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
