প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হয় গণরুমে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা একেকটি কক্ষে থাকেন দশ থেকে বিশজন করে। এই কক্ষগুলোকে ‘মিনি গণরুম’ বলা হয়। তৃতীয় বর্ষের শেষে কিংবা চতুর্থ বর্ষের শুরুতে গিয়ে আসন পেয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা।
এটি দেশের একমাত্র আবাসিক হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলের চিত্র। পরিস্থিতিটা এমন যে, মনে হতে পারে দেশের এই একমাত্র আবাসিক হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নবীন শিক্ষার্থীরা মানবেতর অবস্থায় অনাবাসিক হয়ে রয়েছেন হলের গণরুমগুলোতে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রীদের আবাসনের জন্য ৮টি করে মোট ১৬টি হল রয়েছে। হলে সব মিলিয়ে ৮ হাজার ৫৫২টি আসন রয়েছে। ছাত্র এবং ছাত্রীদের সংখ্যা সমান হলেও ছাত্রী হলের তুলনায় ছাত্র হলের আসনসংখ্যা বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪৫ থেকে ৫০তম ব্যাচের ১২ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। ছাত্রীদের হলে ৪৪তম ব্যাচ অনেক আগেই বের হয়ে গেছে। তবে পড়াশোনার পাঠ চুকালেও ছাত্র হলে ৪৩ ও ৪৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছেন। আর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ৪১ ও ৪২ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীরাও হলে থাকছেন। যার ফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্র হলে সিট সংকট বেশি। এর পেছনের কারণ হিসেবে ছাত্রলীগের সিট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও হলগুলোতে দু-এক বছর বেশি করে থাকেন ছাত্ররা। আর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত হলে থাকার নজির রয়েছে। আবার ছেলেদের আটটি হলেই ছাত্রলীগের জন্য নির্দিষ্ট ব্লকে শুধু তাদের জন্যই কক্ষ রাখা হয়। যে কক্ষগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা পান না। আবার হলে শীর্ষ নেতাদের কথিত অফিস কক্ষও আছে। হল ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হলের সিট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মীর মশাররফ হোসেন হলের আসন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন ৪৩তম ব্যাচের প্রীতম আরিফ, ৪৪তম ব্যাচের আবুল কালাম আজাদ, শামীম ইয়াসির শাফিন, নুর আমিন আকন্দ ও আরিফুল আলম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দায়িত্বে আছেন ৪৩তম ব্যাচের তানজিলুল ইসলাম, ৪৪তম ব্যাচের এস এম দীপ ও সাঈদ আনোয়ার নাফি।
মাওলানা ভাসানী হলে আসন বরাদ্দে ভূমিকা পালন করেন ৪৬তম ব্যাচের ছাত্রলীগকর্মীরা। শহীদ রফিক-জব্বার হলের ৪৪তম ব্যাচের মাহফুজুর রহমান, সাব্বির হোসেন, আল বেরুনী হলে ৪৩তম ব্যাচের এনামুল হক ও শাহরিয়ার কবির অনিক এবং শহীদ সালাম-বরকত হলে ৪৩তম ব্যাচের আরিফ আহমেদ সিট বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের আসন বণ্টনের দায়িত্ব পালন করেন ৪৩তম ব্যাচের আর. রাফি চৌধুরী এবং ৪৪তম ব্যাচের আব্দুল্লাহ আকাশ। অন্যদিকে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের ৪৪তম ব্যাচের মো. অলীদ ও ৪৫তম ব্যাচের মো. জয় এ দায়িত্ব পালন করেন।
হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের জন্য হলে নির্দিষ্ট ব্লক রয়েছে। ৮টি হলে অন্তত ৩২৫টি কক্ষ ছাত্রলীগের জন্য সুনির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।
হলের আসন বরাদ্দের বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের হলে সিট নির্ধারণ করে দেয় বা নিয়ন্ত্রণ করে বিষয়টি এমন নয়। কোনো হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলেও আমাদের কাছে অভিযোগ আসেনি। আমরা নিজেরাই হল প্রশাসনকে বলেছি সবার সিট নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিতে। এতে ছাত্রলীগ থেকে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক কনোজ কান্তি রায় বলেন, ‘কর্মী বাড়ানোর জন্য যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারাই সিট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। হল প্রশাসন সিট নিয়ন্ত্রণ করলে সিট সংকট এতটা প্রকট হতো না। আবার নতুন হল উদ্বোধনের পরেও যদি ছাত্রলীগের সিট নিয়ে নৈরাজ্য চলে তবে আদতে সিট সংকটের সমাধান হবে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মো. মনজুরুল হককে ফোনে করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
হল প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হেল কাফী বলেন, ‘ছাত্রলীগ হলের আসন নিয়ন্ত্রণ করে বিষয়টি এমন নয়, হল প্রশাসন থেকেই আসন বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আবাসন সংকট তা অচিরেই নিরসন হবে। নির্মিতব্য হলগুলোর কাজ প্রায় শেষের দিকে। দ্রুতই সেগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।’ তবে হল উদ্বোধনের সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।
