কাবুলের একটি বাড়িতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরি। অথচ সেখানে বিস্ফোরণের চিহ্নটুকু নেই। তবে কি অস্ত্রাগার থেকে গোপন হাতিয়ার বের করল মার্কিন সেনারা? কেমন সেই অস্ত্র? কীভাবে গোপন ডেরায় ঢুকে জঙ্গি নেতাকে চিনে নিয়ে নিকেশ করেছে এই নতুন অস্ত্র? বিশ্বজুড়ে এই নিয়ে জল্পনার মাঝে সামনে এসেছে একটি নাম। ‘হেল ফায়ার আরনাইন-এক্স নিনজা’। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গি দমনে এখন মার্কিন কমান্ডোদের ফার্স্ট চয়েস এই লেজার গাইডেড সাবসনিক মিসাইল। সূত্রের খবর, এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই আল কায়দা শীর্ষ নেতা আইমান অল-জাওয়াহিরিকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছেন তারা।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি বাড়িতে দীর্ঘদিন লুকিয়ে ছিলেন আল কায়দা নেতা জাওয়াহিরি। মার্কিন প্রশাসন সূত্রে খবর, পরপর ২টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কুখ্যাত এই জঙ্গিনেতাকে হত্য়া করা হয়। কিন্তু যে এলাকায় মিসাইল হামলা হয়, সেখানে ছিল না কোনও বিস্ফোরণের চিহ্ন।
আয়মান আল-জাওয়াহিরি যে বাড়িতে ছিলেন, তার শুধু একটি জানালা উড়ে গেছে। কিন্তু বাকি সব ঘর, পারিপার্শ্বিক এলাকা- কোথাও হামলার কোনও চিহ্নই নেই! এই হামলায় কোনো শব্দ হয়নি। এমনকি, আল কায়দা প্রধান ছাড়া কারও গায়ে আঁচড়ও পড়েনি বলে দাবি করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোন হামলায় জাওয়াহিরি ছাড়া আর কেউই আহত বা নিহত হননি। এমনকি তার পরিবারের সদস্যরাও অক্ষত রয়েছেন। শুধু একটি জানালা ভেঙে গেছে। বাড়িটির বাকি সব জানালাও অক্ষত রয়েছে।
এরপরই কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে শুরু হয়ে যায় জল্পনা। বেশ কিছু সংবাদ সংস্থার দাবি, ‘হেল ফায়ার আরনাইন-এক্স নিনজা’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে মার্কিন সেনা। কতটা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এই মিসাইল? বিশেষজ্ঞদের দাবি, ড্রোন বা ফাইটার জেট থেকে মাটিতে হামলা করতে ব্যবহার হয় এই ক্ষেপণাস্ত্র। লেজার গাইডেড হওয়ায় পিন পয়েন্ট টার্গেটে আঘাত হানতে পারে এই মিসাইল। তবে এর গতিবেগ শব্দের চেয়ে সামান্য কম।
মূলত ট্যাঙ্ক ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ‘হেল ফায়ার আরনাইন-এক্স নিনজা’-কে তৈরি করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রক। কিন্তু বিশেষ কিছু সুবিধা থাকার জন্যেই বর্তমানে জঙ্গি দমনে ব্যবহার হচ্ছে এই অস্ত্র। প্রথমত, অপারেশনের গুরুত্ব অনুযায়ী বিস্ফোরকের তারতম্য ঘটিয়ে ব্যবহার করা যায় এই মিসাইল। তাছাড়া সেফ হাউস বা বাড়িতে লুকিয়ে থাকা জঙ্গি নিকেশের ক্ষেত্রে আদর্শ বলা যেতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে। এই ক্ষেপণাস্ত্রে কোনো বিস্ফোরক থাকে না। বরং ছয়টি ধারালো ব্লেড থাকে।
আরব দুনিয়ার দাবি, ২০২০-তে এই অস্ত্র ব্যবহার করেই ইরানি জেনারেল কাসেম সুলেমানিকে হত্যা করেছিল আমেরিকা।
এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম ব্যবহার হয় ২০১৭ সালে। তখন এক আল কায়দা নেতাকে হত্যার ছক কষে যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়ায় গাড়ি নিয়ে ঘুরছিলেন আল কায়দার অন্যতম শীর্ষনেতা আবু আল-খায়ের আল-মাসরি। কোনও শব্দ হল না। আচমকা গাড়ির ছাদ ফেটে মৃত্যু হল তার। সেটাও নাকি এই ‘ম্যাকাব্রে হেলফায়ার আরএনএক্স’-এর কল্যাণে।
সে সময়ের ছবিগুলোতে গাড়ির ছাদে একটি বড় গর্ত দেখা যায় এবং এর অভ্যন্তরীণ সব কিছু এবং ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা মুহূর্তেই টুকরা টুকরা হয়ে যায়। কিন্তু গাড়ির সামনে ও পেছনে অক্ষত থাকে।
গাড়ির ছবিগুলিতে গাড়ির ধাতুসহ ছাদ দিয়ে একটি বড় গর্ত দেখা গেছে এবং এর অভ্যন্তরীণ সব অংশ, যার মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা শারীরিকভাবে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে৷ কিন্তু গাড়ির সামনে ও পেছনে সম্পূর্ণ অক্ষত দেখা গেছে।
ধারণা করা হয় এটি এমন এক মিসাইল যার ওয়ারহেডে লাগানো থাকে ছয়টি ধারালো ব্লেড, যার আঘাতে বিস্ফোরণ হয় না, কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু টুকরা টুকরা হয়ে যায়।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে কাবু করার সক্ষমতা থাকায় এটিকে নিনজা মিসাইল বলেও ডাকা হয়। বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়িয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করতে পেন্টাগন ও সিআইএর প্রিয় অস্ত্র হয়ে উঠেছে নিনজা হেল ফায়ার।
‘টার্গেট কিলিং’এ র আদর্শ ‘হেল ফায়ার আরনাইন-এক্স নিনজা’ক্ষেপণাস্ত্রের সাঙ্কেতিক নাম ‘উড়ন্ত জিন্সু’। যা নিয়ে মার্কিন ড্রোন বা ফাইটার জেট উড়লেই বুক কাঁপছে জঙ্গিদের।
