বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সুরক্ষায় গুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে উচ্চ আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষায় কোনোভাবেই কোনো অন্যায় দাবির সঙ্গে আপস করা যাবে না।
এ ছাড়া সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত ও সুসংরক্ষিত এলাকায় খালের ভেতরে কোনোভাবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার চলতে পারবে না বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে কাঁকড়া জেলেরা বইঠা চালিত নৌকা এবং ‘দোন দড়ি’র মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের কাঁকড়া সুন্দরবনের ভেতর থেকে আহরণ করতে পারবেন।
এক রিট আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের এমন পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা আসে।
গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম (এখন আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। গত সোমবার ১৪ পৃষ্ঠার রায়ের অনুলিপি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে কাঁকড়া পরিবহন করতে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন জাহান আলী গাজীসহ কয়েকজন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণসহ সাত নির্দেশনা দিয়ে রিট মামলাটি নিষ্পত্তি করে।
রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আল-ফয়সাল সিদ্দিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
অ্যাডভোকেট আল- ফয়সাল সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কাঁকড়া পরিবহন করা যাবে। তবে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে কোনোভাবে কোনো ইঞ্জিনচালিত যান প্রবেশ করতে পারবে না। সুন্দরবন রক্ষায় যে প্রচেষ্টা তা এ রায়ের ফলে আরো প্রতিষ্ঠিত হবে। কেন না রায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বেশ কিছু অভিমত ও নির্দেশনা এসেছে।’
রায়ে অভিমতসহ সাত নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট
(১) আবেদনকারীসহ (রিট মামলার আবেদনকারী) কাঁকড়া জেলেরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট স্টেশন অফিসে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব প্রদান করে পাস (অনুমতি) সংগ্রহ করে কেবল বইঠা চালিত নৌকা এবং ‘দোন দড়ির’ মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের কাঁকড়া আহরণ করতে পারবেন।
(২) কোনো অবস্থাতেই সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত এলাকার খালের ভেতরে কোনো প্রকার ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার চলাচল করা যাবে না। এ জন্য বন বিভাগসহ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে চলাচলকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে।
(৩) পাস নিয়ে কাঁকড়া আহরণের জন্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের সময় বন বিভাগের স্টেশন অফিস থেকে কঠোরভাবে সংশ্লিষ্ট নৌকা ও নৌকার লোকদের পরীক্ষা করতে হবে। যাতে কোনো প্রকার ‘চারু (কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের শলা দ্বারা নির্মিত চাই, যা স্থানীয়ভাবে চারু নামে পরিচিত) এবং ‘বিষ’ কিংবা অন্য কোনো বেআইনি জিনিস বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাতে না পারে।
(৪) প্রতিটি নৌকা পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশকালে তাদের জন্য কী কী করণীয় এবং কী করা দণ্ডনীয় সে সম্পর্কিত হ্যান্ডবিল/পোস্টার সরবরাহ করা যেতে পারে।
(৫) যেহেতু সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদী ও খালগুলো থেকে মাছ আহরণ করে তা জেলে পল্লি দুবলা থেকে সংগ্রহ করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারের মাধ্যমে পরিবহন করে বাজারজাতকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেহেতু অনুরূপভাবে বইঠা চালিত নৌকা দ্বারা কেবলমাত্র ‘দোন দড়ি’ পদ্ধতিতে কাঁকড়া আহরণ করে তা দুবলা জেলে পল্লিসহ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অন্য যেকোনো স্বীকৃত স্থানে যেখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকার/ ট্রলারের যাতায়াতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, সেখান থেকে সংগ্রহ করে দ্রুত বাজারজাতকরণের জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে পরিবহনের অনুমতি দিতে হবে।
(৬) সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কৃষি বিভাগ, মৎস্য বিভাগ ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে স্থানীয় বাজার, ওষুধের দোকানসহ কৃষির জন্য সার, ওষুধ ও বীজ বিক্রির দোকানগুলিতে অনুসন্ধান করতে হবে যাতে ওই এলাকায় অননুমোদিত কোনো বিষ বিক্রি করা না হয়।
(৭) পাস সংগ্রহ করে সুন্দরবন অভ্যন্তরে প্রবেশকালে কিংবা সুন্দরবনে অবস্থানকালে কাঁকড়া জেলেসহ মৎস্য জেলে এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তির কাছে কোনো রূপ বেআইনি দ্রব্য পাওয়া গেলে তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া বিষ নিয়ে মাছ শিকার করলে কিংবা চারু পদ্ধতির মাধ্যমে কাঁকড়া শিকার করলে ওই নৌকার সব আরোহীকে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমাদের গর্ব ও অহংকার। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট যা বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশের জনগোষ্ঠীকে ঝড় জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্মরণাতীতকাল থেকে ঢাল হিসেবে নিজেকে ব্যবহার করে জনজীবনকে স্বাভাবিক রাখছে। সুন্দরবন প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষা ও জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম এবং জাতীয় সম্পদ। সুন্দরবন অক্ষুণ্ন থাকলে ওই বিরাট জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকবে এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও ওই অঞ্চল রক্ষা পাবে।
আদালত বলে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষাসহ সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য কারো কোনো অন্যায় দাবির সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না।
হাইকোর্ট আরো বলে, সুন্দরবনকে স্বমহিমায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য যা কিছু করা দরকার, তা আমাদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে করতে হবে এবং একে আমাদের জাতীয় স্বার্থ হিসাবে দেখতে হবে। এর জীববৈচিত্র্য এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকারি বেসরকারিভাবে ব্যাপক প্রচারণার দরকার। এ জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে তাদের বোঝাতে হবে কোন কাজ সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর এবং কোন কাজ সুন্দরবনের জন্য কল্যাণকর।
সে জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্র/ছাত্রী ও শিক্ষকদের এবং মসজিদের ইমামসহ প্রত্যেক ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে পারলে এর সুফল পাওয়া যাবে।
