মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের উৎপাত কমাতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধী ভাতাও। কিন্তু সেই এমএফএস সুবিধারই অপব্যবহার করে প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠকর্মী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে। জীবিতকে মৃত দেখিয়ে ভাতা বন্ধ করে সেখানে অন্য কোনো নাম অন্তর্ভুক্ত করে সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বর হিসেবে নিজেদের নম্বর দিচ্ছে তারা। পরে সেই নম্বরে এমএফএসের মাধ্যমে শারীরিক ও বাকপ্রতিবন্ধীদের নামে বরাদ্দের মাসিক ভাতার টাকা জমা হলে তা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। আবার অনেকের ভাতা হুট-হাট বন্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে নিজেরাই তুলে নিচ্ছে এসব চক্রের সদস্যরা। এমন বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জের সংশ্লিষ্ট মাঠকর্মীদের বিরুদ্ধে। জেলাটির চৌহালী উপজেলার একাধিক গ্রামের বেশ কয়েকজন প্রতিবন্ধী শিশুর অভিভাবকের অভিযোগ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা তাদের আওতাধীন এলাকার বহু প্রতিবন্ধীর ভাতা বন্ধ করে কৌশলে ভাতার টাকা নিজেরাই তুলে নিচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধীর মধ্যে যারা বা যাদের স্বজনরা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ করছেন, তাদের ভাতা ফের সচল হলেও অনেকেই জেলা কার্যালয় পর্যন্ত যেতে পারেন না। তারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধর্ণা দিয়েও কোনো ফল পাচ্ছেন না।
প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডধারী ভুক্তভোগী এমনই একজন শিশু মরিয়ম খাতুন। খামার গ্রামের বাসিন্দা নূরনবী সরকারের একমাত্র মেয়ে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবন্ধী মেয়ের নামে বরাদ্দকৃত প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পেয়ে আসছিলেন নূরনবী সরকার। ব্যাংক থেকে মোবাইল ব্যাংকিং ‘নগদ’ -এর মাধ্যমে ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই তার মেয়ের ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।
বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি ও দৌড়ঝাঁপ করে নিজের মেয়ের নামে বরাদ্দ ভাতা নিয়মিত করতে পারলেও ২০২০ সালের ১৩ মে থেকে পরবর্তী ৯ মাসের ভাতা তিনি আর তুলতে পারেননি। এই টাকা কোনোভাবেই তিনি পাবেন না বলে চৌহালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জানিয়ে দেন।
একই গ্রামের বাসিন্দা হতদরিদ্র রেজাউল সরকারের ১০ বছর বয়সী শিশুকন্যা রাজিয়া খাতুনের ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে। রাজিয়ার মা নূরনাহার বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাতা বন্ধ হওয়ার পর অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম আমার মেয়ে নাকি মারা গেছে। তাই তার ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আমার মেয়ে বেঁচে আছে।’
রাজিয়ার বাবা রেজাউল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু কেউই মেয়ের ভাতা চালু করতে পারেননি। সবাই বলেছে, আমার মেয়ে নাকি মারা গেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার মেয়ে বেঁচে আছে। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলতে পারে না। এমনকি কথাও বলতে পারে না। কারা, কী কারণে আমার মেয়েকে মৃত বলছে তার কিছুই জানি না।’
একই উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত শ্রী নিবাস শীল ও বাসন্তী রানী শীলের প্রতিবন্ধী ছেলে শ্রী প্রকাশ শীলের ভাতা বন্ধ ছিল তিন কিস্তি। গত জুন মাস থেকে ভাতা পেলেও বকেয়া তিন কিস্তির টাকা পাননি। বাসন্তী রানী শীল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি মাসে টাকা দেয় না। কখনো তিন মাস অন্তর আবার কখনো ছয় মাস অন্তর টাকা দেয়। গত জুন মাসের আগে ছেলের নামে তিন কিস্তির টাকা পাইনি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘অনেক মাঠকর্মী আছে, যারা ভুল তথ্য সরবরাহ করে অধিদপ্তরের কাছে। ভাতাপ্রাপ্তদের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নম্বর দিয়ে থাকে। এতে প্রকৃত ভাতাভোগীর কাছে ভাতার টাকা না গিয়ে মাঠকর্মীদের সরবরাহ করা মোবাইল নম্বরে টাকা চলে যায়। এই টাকা তারা আত্মসাৎ করে থাকে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চৌহালী উপজেলায় মোট পাঁচজন মাঠকর্মী রয়েছেন। সম্প্রতি কয়েকজনের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তাদের একজনকে ভাতা প্রদানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি যারা আছেন, তারাও কৌশলে অনেক ভাতাভোগীর টাকা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভাতাবঞ্চিতদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, চৌহালী উপজেলার একাধিক মাঠকর্মী ও তাদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবন্ধীদের ভাতা নিয়ে নয়ছয় করছেন। তারা কারও ভাতা আটকে দেন, আবার কারও কারও টাকা নিজেরাই তুলে নেন। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চৌহালী উপজেলার মাঠকর্মী আলেয়া খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমআইএস করার সময় যে তারিখ দেখানো হয়, সেই তারিখ থেকেই টাকা বরাদ্দ হয়। তার আগে ব্যাংকে জমা হওয়া কোনো টাকা যদি কোনো ভাতাভোগী না তুলে থাকেন, সেটি ব্যাংকের মাধ্যমেই ফেরত গেছে। এছাড়া যারা মারা যান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে তাদের ভাতা বন্ধ করে অন্যদের নাম দেওয়া হয়। সব তথ্য যাছাই-বাছাই করেই কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। কারও টাকা তুলে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ রাজিয়া খাতুন নামে যে প্রতিবন্ধী শিশুকে নথিপত্রে মৃত দেখানো হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
তবে মাঠকর্মী আলেয়া খাতুনের বিরুদ্ধে ভাতার টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এর আগেও উঠেছিল বলে জানিয়েছেন চৌহালীর ১নং সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগেও মাঠকর্মী আলেয়া একজনকে মৃত দেখিয়ে তার ভাতা বন্ধ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে সে (সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধী) অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, মারা যায়নি। পরবর্তীতে ওই মাঠকর্মীকে ডেকে এনে বিষয়টির সুরাহা করা হয়। আবারও যদি কাউকে সে মৃত ঘোষণা করে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
ভাতার টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের গবেষণা, মূল্যায়ন, প্রকাশনা ও জনসংযোগ শাখার উপ-পরিচালক রকিব আহমেদ বলেন, ‘কোনো প্রতিবন্ধীর নামে নিয়মিত সরকারি ভাতা কখনোই বন্ধ করা হয়নি। ব্যাংকের বদলে মোবাইল ব্যাংকিং নগদের মাধ্যমে ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরুর প্রাক্কালে কিছুদিন ভাতা প্রদান বিঘ্নিত হয়েছে, তবে একটি মাসেরও ভাতা বকেয়া থাকার কথা নয়। আর জীবিত শিশুকে মৃত দেখিয়ে ভাতা বন্ধের প্রশ্নই আসে না। কেন জীবিত শিশুকে মৃত বলা হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট জেলার উপজেলা কর্মকর্তা ভাল বলতে পারবেন।’
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেই এমন অভিযোগ তারা শুনতে পান। কেউ বলেন, ছয় মাস ধরে ভাতা পান না। কেউ বলেন, তাদের সন্তানদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ বলেন, তার শিশুকে মৃত দেখিয়ে ভাতা বরাদ্দ বন্ধ করা হয়েছে। এটি মূলত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধির ভুল তথ্যের কারণে হয়ে থাকে। অনেক সময় বন্ধ করা ভাতার টাকা নিজেরাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের ৯ উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে মোট ৪২ হাজার ৫৩২ জনকে প্রতিবন্ধী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রতি মাসে তাদের নামে নির্ধারিত টাকা বরাদ্দ হয়ে থাকে। এর মধ্যে চৌহালী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দুই হাজার ১৮৫ জন প্রতিবন্ধীর নাম ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে তাদের প্রত্যেককে মাসে ৭৫০ টাকা করে দেয়া হতো। চলতি অর্থবছর থেকে এই ভাতার টাকা বাড়িয়ে মাসে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা মাঠকর্মীর সহায়তায় প্রতিবন্ধীদের তালিকা করে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এক্ষেত্রে যেকোনো ব্যক্তি তার সন্তানকে প্রতিবন্ধী মনে করলে জেলার কার্যালয়ে আবদেন করে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকেন নির্ধারিত মাঠকর্মী। এছাড়া জেলার নির্ধারিত চিকিৎসক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে প্রতিবন্ধী হিসাবে মতামত দিলে তাকে প্রতিবন্ধীর কার্ড দেয়া হয়ে থাকে। তারপর তার অনুকূলে নিয়মিত ভাতা দেয়া হয়।
শিশুকন্যা রাজিয়া খাতুনকে কেন মৃত বলা হচ্ছে? জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জের সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মতিয়ার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি চৌহালী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ভালো বলতে পারবেন। যদিও তিনি নিজেই গত ১৫ দিন হলো মারা গেছেন। তার জায়গায় নতুন কাউকে পদায়ন করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপ-পরিচালকের সাথে কথা বলতে পারেন।’
পরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জের উপ-পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্ডধারী প্রতিবন্ধীরা কোনোভাবেই ভাতা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না। মৃত্যু সনদ ছাড়া কাউকে মৃত বলে ভাতা বন্ধের এখতিয়ার কারও নেই। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
