যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে শাটাকোয়া ইনস্টিটিউশনে ভাষণ দিতে গিয়ে ছুরিকাহত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত লেখক ও ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি। হামলার পরপরই হাসপাতাল নেওয়া হয়েছে বুকারজয়ী এই লেখককে।
তিনি এখন ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার এজেন্ট অ্যান্ড্রু ওয়াইলি। তিনি জানিয়েছেন, রুশদির ‘খবর ভালো নয়’। তিনি কথা বলতে পারছেন না, সম্ভবত একটি চোখ হারাতে পারেন। তার বাহুর স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং লিভার ছুরিকাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুক্রবার নিউ ইয়র্ক শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে শাটাকোয়া ইনস্টিটিউশনের মঞ্চে বক্তৃতা করতে ওঠার সময় রুশদির উপর হামলা চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মঞ্চে কারও সঙ্গে পরিচয় করানো হচ্ছিল লেখককে। সেই সময় আচমকা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এক ব্যক্তি। চলতে থাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানো। ওই সময় যারা মঞ্চে ছিলেন, তারা সঙ্গে সঙ্গেই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন। মেরেকেটে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ১০-১৫ বার কোপানো হয়েছে রুশদিকে। তার ঘাড়েও কোপ মারা হয়েছে।
এই ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহ ছাড়তে বলা হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশেও। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে এসে পুলিশের পক্ষ থেকে রুশদিকে হেলিকপ্টারে (এয়ারলিফ্ট) হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় হামলাকারীকেও। আপাতত পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন অভিযুক্ত।
শতকা ইনস্টিটিউশনের মঞ্চে রুশদির ভাষণ শুনতে বহু দর্শকেরই সমাগম হয়েছিল। চোখের সামনে এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর প্রেক্ষাগৃহের বাইরে বেরিয়ে র্যাবাই চার্লস স্যাভেনর নামে এক দর্শক বলেন, ‘প্রথমে আমি ভাবলাম, কী হচ্ছে এটা! কোনও স্টান্ট নাকি! তার পর যা দেখলাম, ভাবা যায় না’। ক্যাথলিন জোন্স নামে আর এক দর্শক বলেন, ‘হামলাকারী ঝাঁপিয়ে পড়ার কয়েক মুহূর্ত পর আমাদের ভুল ভেঙেছিল’।
সালমান রুশদির ওপর হামলার পর বিশ্বজুড়ে লেখক এবং রাজনীতিবিদরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত বুকার পুরস্কারজয়ী ৭৫ বছর বয়সী লেখক রুশদি ১৯৮১ সালে তার লেখা বই ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে তার চতুর্থ বই ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এর জন্য তাকে ৯ বছর লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।
‘স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে বলে মনে করেন মুসলিমরা। এই বইটি লেখার পর থেকেই বুকার পুরস্কারজয়ী সালমান রুশদিকে অসংখ্যবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বইটি ১৯৮৮ সালে ইরানে নিষিদ্ধ হয়। এর এক বছর পর ১৯৮৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি রুশদিকে হত্যার ফতোয়া দেন। তার মাথার মূল্য ৩০ লাখ ডলার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। খোমেনি মারা গেছেন, কিন্তু ‘ফতোয়া’ জারি থেকেছে বছরের পর বছর।
এরপর এই লেখক ১৩ বছর বেনামে কাটিয়েছেন। প্রতিনিয়ত পুলিশি পাহারায় কার্যত ‘বন্দি’ থেকেছেন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ছদ্মনামে’র জীবন থেকে বেরিয়ে আসেন রুশদি। তার বছর তিনেক আগেই তেহরান ঘোষণা করেছিল, লেখকের বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। গত ২০ বছর ধরে নিউ ইয়র্কেরই বাসিন্দা রুশদি।
ওই বইয়ের কারণেই নব্বইয়ের দশকে ইতালির মিলানে রুশদির ওপর হামলা চালানো হল। শুধু তাই নয়, ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এর জাপানি অনুবাদক হিতোসি ইগারাসিকেও ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় টোকিওর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
