জুয়া খেলে সব হারিয়ে নামেন বাস চুরির পেশায়

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ০৮:২৪ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জন্ম মো. রিপনের (৪০)। রাজধানীতে চলাচল করা লেগুনার (ফিটনেসবিহীন মাইক্রোবাস বা পিকআপের নতুন সংস্করণ) চালকের সহকারী (হেলপার) থেকে হন চালক। পরে চালক থেকে মালিক। তারপর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বড় মহাজন। একে একে ১৫টি লেগুনার মালিক হন। শুধু তা-ই নয়, রাজধানীর ফার্মগেটকেন্দ্রিক চলাচল করা লেগুনা মালিক সমিতির সভাপতিও হয়েছিলেন। রাজধানীর সড়কে কিশোর বয়স থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেগুনার পেছনে ঝুলে লড়াই করে ডজনেরও বেশি গাড়ির মালিক হওয়ার সংগ্রামের গল্প এখন শুধুই অতীত স্মৃতিচারণ। কারণ রিপনের বর্তমান পরিচয় একজন পেশাদার চোর। তাও আবার ছোটখাটো চোর নয়, পাক্কা বাস চোর। রাস্তা বা গ্যারেজের পাশে থাকা বন্ধ গাড়ি কৌশলে চালু করে একাই চালিয়ে সটকে পড়েন রিপন।

গত সাত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১৫টি বাস চুরি করেন রিপন। প্রত্যেকটি চুরির কাজ একাই সারেন, নেননি কোনো সঙ্গী-সাথী। চুরি করা বাস একাই চালিয়ে মিরপুরের একজন প্রভাবশালীর জায়গায় গড়ে ওঠা গ্যারেজে নিয়ে যান। সেখানে কেটে টুকরো টুকরো করে ভাঙ্গারি হিসেবে বিক্রি করে দেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বড়পা এলাকার রড তৈরির কারখানায়। সেখানে এসব ভাঙ্গারি গলিয়ে রড তৈরি করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওয়ারী বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ ও উদ্ধার টিমের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এক দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে এই রিপনকে। তার সঙ্গে কারাগারে গেছেন আরও চারজন। তারা হলেন মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার বাস কাটার গ্যারেজ মালিক নূর ইসলাম এবং চুরি করা বাসের যন্ত্রাংশ বিক্রি কেনাবেচায় জড়িত নজরুল ইসলাম (৫১), আজিজুর রহমান (৩৪) ও মো. মঞ্জু মিয়া (৩৮)।

ডিবির ওয়ারী বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। রিমান্ড শেষে গতকাল তাদের সবাইকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ডিবির ওয়ারী বিভাগের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাত্রাবাড়ী থানায় করা আসিয়ান পরিবহনের একটি বাস চুরির মামলার তদন্তের সূত্রে রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাস কাটার গ্যারেজ মালিক ও বাসের টুকরো বা কাটা যন্ত্রাংশ কেনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা সবাই ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বাস চুরি থেকে শুরু করে তা কেটে টুকরো করে বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

ওয়ারী বিভাগের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে রিপন জানান, লেগুনার চালক হওয়ার পর থেকেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসা শুরু করে। গাড়ি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় মাসে লাখ লাখ টাকা আসতে থাকে। সেই টাকা দিয়ে লেগুনা কিনতে থাকে। ২-৩ বছরের মাথায় ১৫টি লেগুনার মালিক হন। তারপর ফার্মগেট এলাকার লেগুনা মালিক সমিতির সভাপতির পদ পান। ১৫টি লেগুনার ভাড়া বাবদ দিনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা উপার্জন করতেন। প্রতিদিনই হাজার হাজার টাকা পাওয়ায় জুয়া খেলায় জড়িয়ে পড়েন রিপন। কখনো জুয়া খেলেছেন আরামবাগের ক্লাবে, কখনো তেজগাঁওয়ের খেলাঘর ক্লাবে, আবার কখনো রাইফেলস ক্লাবে। এভাবে খেলতে খেলতে জুয়াড়ি রিপন একে একে সব লেগুনাই বিক্রি করে দেন জুয়ার বোর্ডে বসেই। সব হারিয়ে নিঃস্ব রিপন নামেন বাস চুরির পেশায়। দুই থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে যাত্রীবাহী যেকোনো বাস চুরি করে কেটে টুকরো করে বিক্রি করে দিতে পারেন। তার কোনো দল নেই। একাই চুরি করেন। চুরির আগে টার্গেট করা বাস ও আশপাশের এলাকা রেকি করতেন। তারপর সুযোগ বুঝে বন্ধ গাড়ি স্টার্ট করেন তার নিজস্ব কৌশলে। সবশেষে একাই চালিয়ে সটকে পড়েন।

বন্ধ গাড়ি চালু করার কৌশল : গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে রিপন জানান, তিনি যেকোনো বন্ধ গাড়ি চাবি ছাড়াই চালু করতে পারেন। বাসের ইঞ্জিনে যুক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগের তারের সহায়তায় কৌশলে চালু করেন। আবার পুরনো চাবি দিয়েও গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতেন। রিপন নিজের মুখে স্বীকার করেছেন ৮-৯টি বাস চুরির কথা। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গত সাত মাসে অন্তত ১৫টি বাস চুরি করেছেন রিপন। তার কাছ থেকে ১২টি বাসের নম্বর প্লেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কোনো বাস পাওয়া যায়নি। শুধু উদ্ধার হয়েছে একটি বাসের কিছু যন্ত্রাংশ। বাকি সব বাসই তার পরিচিত গ্যারেজে নিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ভাঙ্গারি হিসেবে বিক্রি করে দেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানান, রিপন বাস চুরি করে নূর ইসলামের গ্যারেজে নিয়ে কাটার কাজ দিতেন। বিনিময়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দিতেন নূর ইসলামকে। রিপন সেই গ্যারেজ থেকে প্রায় ৯০ হাজার টাকা দামের ইঞ্জিন বিক্রি করতেন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। সিট ও গ্লাস আলাদা বিক্রি করতেন। আর টুকরো টুকরো যন্ত্রাংশ ভাঙ্গারি হিসেবে বিক্রি করে দিতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর অনেক এলাকাতেই বাস চুরির ঘটনা ঘটে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানায় এ বিষয়ে কোনো মামলা রেকর্ড করা হয় না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি মামলা বেশি হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য মামলা নিতে অনাগ্রহী থাকেন। এ কারণে অনেক বাস মালিক তার বাস চুরির বিষয়ে থানায় গিয়ে কার্যকর সেবা পান না। মামলাও হয় না। বাসও উদ্ধার হয় না। এসব কারণে চোররাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস চোর ও তাদের সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখন বেপরোয়া। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি বড় ময়লার ট্রাক চুরি করে ঘণ্টাখানেকেই টুকরো টুকরো গলিয়ে ফেলে আরেক চক্র। সেই চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে ওয়ারী বিভাগের ডেমরা জোনাল টিম।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, রিপন একাই বাস চুরি করলেও পরবর্তী ধাপগুলোতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা খুব সহজেই তার কাছ থেকে বাসটি বুঝে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কেটে ফেলত। তারপর ফেলত গলিয়ে। তবে ইঞ্জিনের মতো দামি যন্ত্রাংশের ক্রেতা আলাদা সিন্ডিকেটও আছে। এসব প্রত্যেকটি সিন্ডিকেটের সঙ্গেই রিপনের সম্পর্ক রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘বাস, মিনিবাস ও ট্রাক চুরি, কেটে টুকরো টুকরো করে গলিয়ে ফেলে এমন একাধিক চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত