সৌভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছেন পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
রুশ প্রেসিডেন্ট দপ্তর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘গর্বাচেভের বিদায় অনুষ্ঠান এবং আন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আগামী ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রেসিডেন্ট পুতিনের সেদিন অন্য কাজ থাকায় তিনি তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না’।
পেসকভ বলেন, পুতিন হাসপাতালেই গর্বাচেভকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, যেখানে গত মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সূচনা করে ইতিহাসের গতিধারা বদলে দেওয়া নেতা মিখাইল গর্বাচেভ মারা গেছেন গত মঙ্গলবার।
এরপর গর্বাচেভের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিবৃতিতে বিশ্ব ইতিহাসে গর্বাচেভের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে জানান পুতিন। তবে, গর্বাচেভের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক ছিল ভালো-খারাপ-ভালো সমীকরণে।
বুধবার পুতিন বলেন, শেষ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন একথা সত্য। তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু তিনি পশ্চিমাদের সঙ্গে ‘চিরন্তন প্রেমে’ বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন’।
পুতিনের মতে, তিনি সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঠেকাতে অক্ষম ছিলেন এবং অনেক রাশিয়ান বছরের পর বছর ধরে চলা অশান্তির জন্য তাকেই দায়ী করেছিল।
পুতিন বলেন, ‘তিনি গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে সংস্কারগুলো প্রয়োজনীয় ছিল। তাই তিনি জরুরী সমস্যার নিজস্ব সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে ভুল ধারণা করেছিলেন’।
পুতিনের মুখপাত্র, দিমিত্রি পেসকভ বলেন, গর্বাচেভ ‘আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন যে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সোভিয়েত ইউনিয়নের যাত্রা শুরু হবে। আর পুরো বিশ্বসহ পশ্চিমের সঙ্গেও সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘চিরন্তন প্রেমের’ সূচনা হবে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল’।
গর্বাচেভ অবশ্য পুতিনের খুব বেশি সমালোচনা করেননি। ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক টানাপড়েন ও বরিস ইয়েলৎসিনের বিদায়ের পর রাশিয়া যখন ব্যাপক সংকটময় পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন গর্বাচেভ সাবেক কেজিবি এজেন্ট পুতিনকে নিয়ে আশার আলো দেখেছিলেন।
পুতিন প্রথমবার রাশিয়ার ক্ষমতায় আসেন ২০০০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। তখন গর্বাচেভ বলেছিলেন, ‘পুতিন একজন বুদ্ধিমান, নিজের কাজের প্রতি সিরিয়াস এবং সুসংগঠিত। আমি এই ধরনের মানুষ পছন্দ করি’।
গর্বাচেভের জন্য পুতিন ছিলেন রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারিগর। ২০০৬ সালে পুতিনের কতৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে যখন রুশরা রাজপথে নেমেছিল, তখনো গর্বাচেভ বলেছিলেন, ‘যারা পুতিনের কর্র্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে ভয় পায় তারা ভুল’। কিন্তু কয়েক বছর পরই পুতিনের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে কঠোর বাক্যের প্রয়োগ করতেও তাকে দেখা যায়।
২০১১ সালে তৃতীয়বারের মতো যখন পুতিন নির্বাচন করছিলেন, তখন গর্বাচেভকে দেখা যায় পুতিনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত জনগণের পক্ষে কথা বলতে। ২০১৩ সালে গর্বাচেভ বলেন, ‘রাজনীতি ক্রমশ গণতন্ত্রের অনুকরণে পরিণত হচ্ছে। সমস্ত ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রপতির হাতে। অর্থনীতি একচেটিয়া এবং দুর্নীতি ব্যাপক আকার নিয়েছে’।
গর্বাচেভের কাছ থেকে সমালোচনা বন্ধে ক্রেমলিন একাধিকবার পদক্ষেপও নিয়েছিল। পুতিন তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর গর্বাচেভ যখন পুতিনকে আক্রমণ করতে শুরু করেন, তখন পুতিনও চুপ থাকেননি।
২০১৪ সালে। পুতিন যখন সামরিক অভিযান চালিয়ে ক্রিমিয়ার দখল নেন, তখন গর্বাচেভকে দেখা যায় পুতিনকে সমর্থন দিতে। পরের বছরই গর্বাচেভ পুতিনের সিরিয়ায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে আখ্যা দেন।
২০১৮ সালে পুতিন যখন চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় থাকতে নির্বাচন করেন, তখন গর্বাচেভকে পুতিনের পক্ষে ফিরিস্তি দিতেও দেখা যায়। সাংবাদিকদের গর্বাচেভ বলেছিলেন, ‘আজ তিনি এমন একজন নেতা যিনি প্রাপ্যভাবেই জনগণের সমর্থন উপভোগ করেন’। গর্বাচেভ আরও বলেন, ‘বিশ্বের এই জটিল পরিস্থিতিতে রাশিয়ায় তার (পুতিন) মতো নেতা দরকার’।
তবে, চলতি বছরে গর্বাচেভ পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ করার সিদ্ধান্তেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন
সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভের মৃত্যু গত শতকের ৯০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের ইতি, রাশিয়ার সেসময়কার অভ্যন্তরীণ টালমাটাল ঘটনাপ্রবাহকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
মিখাইল গর্বাচেভের মৃত্যুতে পশ্চিমের রাজনৈতিক নেতারা দলে দলে শোক প্রকাশ করছেন ও তার ভুমিকার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন।
পশ্চিমাদের কাছে তিনি ছিলেন ‘সোভিয়েতের কারাগারে বন্দি কোটি কোটি মানুষের মুক্তিদাতা’, অন্যদিকে রাশিয়ার নবীন-প্রবীণ অনেকের কাছে তিনি খলনায়ক, ‘যিনি রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন’।
স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনাকর সময়ে পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর জোটের দায়িত্ব পাওয়া এ ব্যক্তি গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রইকা দিয়ে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শাসনকাঠামো আমূল বদলে ফেলার মিশনে নামেন। তার ওই মিশন, রাজনৈতিক খোলা হাওয়া আর মুক্ত বাজার অর্থনৈতিক উদারীকরণের একের পর এক ঝটকায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পূর্ব ইউরোপের মানচিত্র বদলে যায়। বাঁক বদল ঘটে ইতিহাসেরও। রক্তপাতহীনভাবে স্নায়ু যুদ্ধের অবসান ঘটালেও সোভিয়েত পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হন তিনি।
গর্বাচেভ পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত নামে উদারীকরণের যে দুই কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন, তাই রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত করেছিল বলে তার সমালোচকরা বলে থাকেন।
প্রবাদপ্রতীম কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের গড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে পড়লে আলাদা আলাদা ১৫টি জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে, তার মধ্যে বড়টি হল আজকের রাশিয়া।
পরাশক্তি থেকে রাশিয়াকে দুর্দশাগ্রস্ত দেশের কাতারে নিয়ে আসার জন্য অনেক রুশ এখনও গর্বাচেভকে ক্ষমা করতে পারেন না বলে কথিত আছে।
