সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া 'এনশিওরিং হেলথ ইকুইটি অ্যান্ড ইকোনমিক পার্টিসিপেশন ফর ক্রনিক লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস পেশেন্টস থ্রু সার্জিক্যাল ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত ফলাফলসমূহ প্রচার করার উদ্দেশ্যে আজ আইসিডিডিআর,বি একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে। মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বি-র ট্র্যাকশন মিটিং রুমে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
ফাইলেরিয়াসিস একটি পরজীবীঘটিত রোগ যা কিউলেক্স মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত অঙ্গের ফুলে যাওয়া এবং পরবর্তীতে ঘন ঘন জ্বর হওয়া হলো এই রোগের প্রধান উপসর্গ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন মাত্রার অক্ষমতার কারণ হতে পারে।
ফাইলেরিয়াসিসে আক্রান্ত পুরুষ রোগীর অণ্ডথলি ফুলে যেতে পারে, যা হাইড্রোসিল নামে পরিচিত। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ১০টি এন্ডেমিক জেলায় প্রায় ২৫ হাজার সন্দেহভাজন হাইড্রোসিলের রোগী রয়েছেন, যারা সামাজিক ভ্রান্ত ধারণার কারণে স্বাস্থ্যসেবা চাইতে লজ্জা বোধ করেন। উপরন্তু, এই ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী হাইড্রোসিল সার্জারির খরচ বহন করতে পারে না এবং চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যায়, যার ফলে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না।
২০২২ সাল থেকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায়, আইসিডিডিআর,বি হাইড্রোসিলে আক্রান্ত ২০৩ জন রোগীকে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের অস্ত্রোপচার সহায়তা প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১৪৫ জন রোগীকে রংপুর এবং ৫৮ জনকে কুড়িগ্রাম জেলায় অপারেশন করা হয়। পূর্বে ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে অফিসের সহায়তায়, আইসিডিডিআর,বি ৮৩৮ জন হাইড্রোসিল রোগীকে হাইড্রোসিল অপারেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল।
আইসিডিডিআর,বি-র গবেষকরা একটি ফলাফল মূল্যায়ন কার্যক্রমও পরিচালনা করেছেন, যা দেখায় যে অপারেশন এই রোগীদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। অস্ত্রোপচারের এই কার্যক্রম অত্যন্ত সাশ্রয়ী (১:১৫), যার অর্থ অস্ত্রোপচারের অর্থনৈতিক সুবিধা সার্জারির খরচ অপেক্ষা ১৫ গুণ বেশি। অধিকন্তু, এই রোগীরা এখন আগের চেয়ে বেশি ঘণ্টা কাজ করতে সক্ষম।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন চৌধুরী লিয়াকত আলী, অতিরিক্ত পরিচালক, সাস্টেইনেবল ফাইনান্স ডিপার্টমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক; রাগীব ইবনুল আসিফ, উপপরিচালক, সাস্টেইনেবল ফাইনান্স ডিপার্টমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক; ডা. সাবেরা সুলতানা, ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিডিডিআর,বি-র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. সামস্ এল আরেফিন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ফাইলেরিয়া নির্মূল, কৃমি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম এবং কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচি, ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান।
অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম তার বক্তব্যে এই ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করার উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, 'হাইড্রোসিল সহ অন্যান্য নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিসে আক্রান্ত মানুষেরা নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন যা তাদের জীবনমানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এই মহান কার্যক্রমের মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি ও বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সকল ভুক্তভোগী মানুষদেরকে সহায়তা করছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে চৌধুরী লিয়াকত আলী হাইড্রোসিল আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই সহায়তাকার্যক্রম অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং বলেন, 'এটি একটি অসাধারণ উদ্যোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক হাইড্রোসিল আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচার করার এই কর্মযজ্ঞে সহায়তা করতে পেরে গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও এই ধরনের মহৎ উদ্যোগে আমাদের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।'
ড. আরেফিন হাইড্রোসিল সার্জারির গুরুত্ব বোঝার জন্য, এই রোগীদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এবং সেই অনুযায়ী প্রকল্পটিকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ জানান।
আইসিডিডিআর,বি-র ল্যাবরেটরি সায়েন্সেস অ্যান্ড সার্ভিসেস ডিভিশন (এলএসএসডি)-এর ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র ডিরেক্টর ড. দীনেশ মণ্ডল সভায় উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
প্রকল্পটি আইসিডিডিআর,বি-র এলএসএসডির ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র ডিরেক্টর ড. দীনেশ মণ্ডলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস ডিভিশনের রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর ডা. শমিক মারুফের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
সেমিনারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, মিডিয়া এবং আইসিডিডিআর,বি-র প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
