জাতীয় হকি দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রায় দুই দশক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের হকির অনেক কিছুর সাক্ষী সাবেক অধিনায়ক রাসেল মাহমুদ জিমি। হকি ফেডারেশনের নতুন উদ্যোগ ফ্র্যাঞ্চাইজি হকি লিগ নিয়ে অনেক আশাবাদী এই তারকা। দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র নেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে
জিমি হকির সম্ভাবনা নিয়ে বলেছেন অনেক কথা
হকি অঙ্গনে আপনার বিচরণ অনেক দিনের। এখনো জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দীর্ঘ পথে অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন নিশ্চয়?
রাসেল মাহমুদ : জাতীয় দলে খেলছি ২০ বছর ধরে। এখনো খেলছি। তার মানে দলে আমার প্রয়োজনটা এখনো ফুরায়নি। তবে একটা সময় তো বিদায় নিতেই হবে। এটা যখন ভাবি, তখন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ি। শুধু তো হকি খেলাটাই শিখেছি। আর তো কিছু শিখিনি। তাই এটা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। দীর্ঘ পথচলায় অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। এখন ভাবি, হকিটা যদি না খেলতাম তাহলে তো এত মানুষ আমাকে চিনত না। এত সম্মানও পেতাম না।
একটা সময় আপনি আপনার বাবার (সাবেক হকি তারকা সোনা মিয়া) পরিচয়ে পরিচিত হতেন। এখন তো আপনাকে মানুষ চেনে আপনার পরিচয়েই?
রাসেল মাহমুদ: বাবাকে দেখেই তো এই খেলার প্রেমে পড়েছিলাম। তাকে মানুষ অনেক ভালোবাসত, সম্মান করত। এখন আমাকেও মানুষ ভালোবাসে। এখন বাবাকে আমার পরিচয়েও মানুষ চেনেন (হাসি)।
হকিতে ক্রিকেট-ফুটবলের মতো চাকচিক্য নেই। উল্টো হকি খেলে জীবিকা নির্বাহ করাই এ দেশে বড্ড কঠিন। অথচ এই খেলাটাকেই আপন করে নিলেন!
রাসেল মাহমুদ : আমার রক্তে হকি। যেখানে বেড়ে উঠেছি (পুরান ঢাকা), সেখানে এখনো হকির চর্চা হয় নিয়মিত। হকি খেলে যে আর্থিকভাবে খুব উন্নতি করতে পারব না, সেটা আগেই জানতাম। আসলে খেলাটার প্রতি ভালোবাসাই আমাকে হকির মানুষে পরিণত করেছে। হয়তো অঢেল অর্থের উপার্জন করতে পারিনি। তবে এই হকি খেলেই মানুষের হৃদয়ে স্থান পেয়েছি। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায়, হকি খেলছি বলেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মতো বড় সংস্থা আমাকে চাকরি দিয়েছে।
তা অবশ্য ঠিক। নৌবাহিনী হকির জন্য অনেক কিছু করছে।
রাসেল মাহমুদ : আমি নৌবাহিনীতে চিফ প্যাটি অফিসার র্যাংকে চাকুরি করি। আরও অনেক হকি খেলোয়াড়ের কর্মসংস্থান হয়েছে নৌবাহিনীতে। অন্য খেলারও অনেকে চাকরি করছেন। নৌবাহিনীর দেখাদেখি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীও অনেক হকি খেলোয়াড়কে চাকরি দিয়েছে। আমাদের জন্য এই তিন বাহিনীই বড় আশীর্বাদ।
অথচ ঢাকা লিগটা নিয়মিত হলে জীবিকার জন্য বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হতো না আপনাদের।
রাসেল মাহমুদ : এটা বড্ড হতাশার। নিয়মিত লিগ হয় না বলে বেশিরভাগ হকি খেলোয়াড়কে বেছে নিতে হয় অন্য পেশা। আমরা যারা জাতীয় দলে খেলি, তারা বিভিন্ন বাহিনীর কল্যাণে চাকরি করছি। তবে যারা সে সুযোগ পায়নি, তাদের অবস্থা দুর্বিষহ। তাও ভালো যে ফেডারেশন এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। এখন যদি হকি খেলোয়াড়দের সুদিন ফিরে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ নিয়ে আপনারা খুব বড় স্বপ্ন দেখছেন?
রাসেল মাহমুদ : তা তো অবশ্যই। ভারতে যখন আইপিএল শুরু হলো, তারা যখন হকির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ করল। এর দেখাদেখি যখন দেশে ক্রিকেট বোর্ড এ রকম আয়োজন করল, তখন থেকেই আমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। অনেক দিনের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হতে চলেছে। তাই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ধু ধু মরুভূমিতে রহমতের বৃষ্টি হয়ে ঝরেছে। ফেডারেশনের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা এমন একটা উদ্যোগের জন্য। অন্তত আগামী পাঁচ বছর আমাদের একটা আর্থিক সংস্থানের পথ তৈরি হলো। এখন আর কেবল ঢাকা লিগের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। এই লিগ সামগ্রিকভাবেই দেশের হকির উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এ দেশে হকির জনপ্রিয়তা আছে বলেই সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বতারকা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে যুক্ত হয়েছেন। সাকিবের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও একমি, রূপায়ণ গ্রুপ, ওয়ালটন, সাইফ পাওয়ারটেকের মতো করপোরেট হাউজকে ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
সেটা কেমন করে?
রাসেল মাহমুদ : এখানে ছয়টি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিয়েছে। তারা যদি ধীরে ধীরে হকির অন্যান্য খেলায়ও সহযোগিতা করে, আমাদের স্পন্সর সংকট কেটে যাবে। এই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির সুযোগও নিশ্চয় তৈরি হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগটা যখন জমজমাট হবে, তখন ক্লাবগুলোও ঢাকা লিগে নিয়মিত খেলার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হবে। এই দুই লিগ থেকে তখন অনেক খেলোয়াড় উঠে আসবে। তারা সারা বছরই খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সংসার চালাতে অন্য পেশার কথা ভাবতে হবে না। ভালো খেলার একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে সবার মধ্যে। আর ঘরোয়া হকি যখন বছরব্যাপী হবে, তখন জাতীয় দলও শক্তিশালী হবে। কেবল খেলোয়াড় নয়, এর ফলে খেলা ছেড়ে যারা কোচিং পেশার সঙ্গে জড়িত তাদেরও কর্মসংস্থান বাড়বে। আমি এই লিগ নিয়ে অনেক আশাবাদী।
জাতীয় দল শক্তিশালী করা বড্ড জরুরি। বাংলাদেশ এখনো এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল খেলতে পারেনি। অথচ তাদের সামনে আছে বিশ্বকাপে খেলার হাতছানি।
রাসেল মাহমুদ : বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান ২৭তম। আগামী বিশ্বকাপ হবে ২৪ দলের। র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ২০-এর পরের যারা আছে, তারা আমাদের সমপর্যায়ের। তাই বিশ্বকাপে খেলার যথেষ্ট সুযোগ আছে। তবে সেখানে খেলতে হলে সঠিক পরিকল্পনা করে এগুতে হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, ঢাকা লিগের পাশাপাশি বিভিন্ন টুর্নামেন্ট যদি নিয়মিত হয়, তবে সারা বছর খেলার মধ্যে থাকব। এর সঙ্গে ঢাকার বাইরে যেসব জায়গায় একটা সময় নিয়মিত লিগ হতো, সেগুলো আবার শুরু হলে, প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সংকট কেটে যাবে। পাশাপাশি যদি জাতীয় দলের কমপক্ষে দুই-তিনটি পাইপলাইন তৈরি করা যায়, তাদের ভালোভাবে পরিচর্যা করা যায়, নিয়মিত খেলার সুযোগ করে দেওয়া যায়, তবেই সম্ভব। আমাদের ধাপে ধাপে এগুতে হবে। আমরা এখন এশিয়া কাপ খেলিছ পঞ্চম অথবা ষষ্ঠস্থানকে লক্ষ্য করে। পরিকল্পনা করতে হবে সেমিফাইনাল খেলার। বড় স্বপ্ন না দেখলে ছোট লক্ষ্যগুলো ছোঁয়া যায় না।
স্বপ্ন অবশ্যই দেখতে হবে, এটা যেমন ঠিক, একটা সময় স্বপ্নযাত্রার ইতিও টানতে হয়। অবসরের কথা কি ভাবছেন?
রাসেল মাহমুদ : আগেই বলেছি বিদায়ের কথাটা ভাবতেই আমার খারাপ লাগে। তাই বলে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে জাতীয় দলের জায়গা দখল করে রাখার মানুষ আমি নই। আগামী বছর এশিয়ান গেমস আছে। সেই পর্যন্ত অবসর নিয়ে ভাবছি না। ফিটনেস যদি থাকে, দলের যদি প্রয়োজন হয়, তবে এরপরও খেলতে পারি। আর খেলা ছাড়ার পরও হকিকে ছাড়ব না। ইচ্ছে আছে কোচিংকে পেশা হিসেবে নেওয়ার।
