ক্লাস নিচ্ছেন ইউএনও, যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:২৫ এএম

‘শিক্ষা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিল সেই ছাত্রজীবন থেকে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন অনুষদে ভর্তি হওয়ার পরেও ছাত্র পড়িয়ে যখন পড়ার খরচ জোগাড় করেছি, বর্তমানে কাজের চাপে খুব একটা সুযোগ পাই না। তবে সুযোগ পেলেই ছুটে যাই বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসায়। যেকোনো শ্রেণিকক্ষে ঢুকে একটি ক্লাস নিতে পারলে মনটা ভালো হয়ে যায়। সব সময় ভাবি, যদি কিছু জ্ঞান আমার মধ্যে থাকে, তা যদি বিতরণ করতে না পারি, নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তাই মফস্বল এলাকায় যখন চাকরি করছি, এখানকার শিক্ষার্থীদের একটু মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারলে তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।’

কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ উল্যাহ। গত ১২ মে তিনি এ উপজেলায় ইউএনও হিসেবে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পর থেকে উপজেলার শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে ব্যতিক্রম সব উদ্যোগ নিয়ে যাচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করছেন নানা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। যারা ভালো করে, তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুরস্কৃত করেন। কাজের অবসরে ছুটে যান প্রত্যন্ত স্কুল-মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে, এমনকি শিক্ষার্থীদের বাড়িতেও।

লোহাগাড়ায় মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে ৫৪টি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১০৩টি। যোগ দেওয়ার পর কয়েক দিনে প্রায় ৩৫টি বিদ্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শনে যান ইউএনও। গিয়ে দেখতে পান শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে দুর্বল। এই দুর্বলতা কাটানোর জন্য তিনি কিছু প্রতিযোগিতামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেগুলোর মধ্যে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য, ¨, USET (UNO Special evaluation test), MOV (Master of Vocabulary), RISE (Reading improves skill easily), Everyday five word এবং প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য Everyday three word প্রোগাম। এ ছাড়া ‘ইউএনও মেধাবী ছাত্রছাত্রী এওয়ার্ডস’, গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনা, রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে আকস্মিক পরিদর্শন, শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়ন এবং প্রতিটি স্কুলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিভাবক সমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

শিক্ষকরা জানান, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য ইউএনও নিজেই সিলেবাস তৈরি করেন এবং তা বই আকারে ছাপান। প্রতিটি স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে তৈরি করেছেন হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ। প্রতিদিন রাতে ইউএনও মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি ইংরেজি শব্দ অর্থসহ লিখে পাঠান। পরের দিন শিক্ষকরা তা শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে লিখে দেন। একইভাবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি শব্দ লিখে পাঠান। যখন যে স্কুলে তিনি পাঠদানের জন্য যান, সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের এসব শব্দের ওপর পরীক্ষা নিয়ে পুরস্কৃত করেন। বর্তমানে তিনি প্রতি রাতে বিভিন্ন ইউনিয়নের কমপক্ষে পাঁচজন শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে লেখাপড়ার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং শিক্ষাসামগ্রী উপহার দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীরাও খুব খুশি।

লোহাগাড়া দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সামশুল আলম বলেন, ‘ইউএনও স্যারের এসব পরিকল্পনার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অপেক্ষায় থাকে কখন ইউএনও স্যার ক্লাস নিতে আসবেন।’

জনকল্যাণ বালক উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মাইনুদ্দিন বলে, ‘প্রতিদিন আমি পাঁচটি ইংরেজি নতুন শব্দ শিখছি। কিছুদিন আগে ইংরেজি শব্দের পরীক্ষায় আমি পুরস্কার পেয়েছি।’

সুখছড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রজ্ঞা প্রদীপ্তা আচার্যের বাবা দেবাশীষ আচার্য বলেন, ‘ইউএনওর এই উদ্যোগের কারণে আমার মেয়ের বিভিন্ন বিষয়ে বাড়তি অনুশীলন হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতমূলক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে।’

লোহাগাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘এ ধরনের শিক্ষানুরাগী প্রশাসক আমরা আগে দেখিনি। এমনকি রাতের বেলায় শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। শিক্ষার জন্য তার এ প্রয়াস অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এতে দারুণ উপকৃত হচ্ছে।’

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শিক্ষার ওপর নানা পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আগ্রহ বেড়েছে লেখাপড়ায়।’

উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এম ইব্রাহিম কবীর বলেন, ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে ইউএনও শরীফ উল্যাহর বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার শিক্ষার প্রতি এ অনুরাগ উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত