বাবার কিনে দেওয়া মাত্র ৪০ টাকার একটি বল নিয়েই হিমালয় জয়ী কৃষ্ণা রানী সরকারের যাত্রা শুরু। আজ সে সাফ ফুটবলে জয়ের রানী হয়ে ১৬ কোটি মানুষকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়েছে। পরিবারের চাওয়াও পুরণ করেছে সে। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথুলিয়া গ্রামের বাসুদেব সরকার ও নমিতা রানী সরকার দম্পতির কন্যা।
অভাবের সংসার। দর্জির কাজ করে কোনো রকমে সংসারের খরচ চালাতেন বাবা। রান্নার চুলায় গিয়ে দেখতেন কান্নারত মায়ের মুখ। দুই ভাই-বোনের মুখে প্রায়ই দুবেলা ভাত জোটেনি। অর্ধাহার-অনাহারে দিনানিপাত করেছেন। সেই কৃষ্ণা আজ দারিদ্রকে পেছনে ফেলে অদম্য পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দিয়ে সাফল্যের উচ্চ শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়েছেন।
গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ৩-১ গোলের ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশকে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেন মেয়েরা। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে বাংলাদেশ ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। সেখানে কৃষ্ণা রাণী সরকারের জোড়া গোলে হিমালয় জয় করে বাংলাদেশ। তাই সারাদেশের সাথে টাঙ্গাইলের গোপালপুর ভাসছে আনন্দে।
কৃষ্ণার ফুটবলার হয়ে বেড়ে ওঠার পথটি সহজ ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে আজকের এখানে তাকে আসতে হয়েছে। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে পরিবার, সবই কটাক্ষ করেছ তাকে। কিন্তু কোনো বাঁধাই থামাতে পারেনি তাকে। অদম্য ইচ্ছেশক্তি তার লক্ষ্য থেকে তাকে টলাতে পারেনি চুল পরিমাণও। ছোট বেলা থেকেই কৃষ্ণা ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় ছেলেদের সাথে কৃষ্ণাও ফুটবল খেলত। এ নিয়ে পাড়ার লোকজন বাজে মন্তব্য করত। তার মা-বাবাকে কথা শোনাতে ছাড়ত না। মা মাঝেমধ্যেই বকাঝকা করত। কৃষ্ণার ফুটবলের প্রতি আগ্রহ দেখে তার বাবা একদিন ৪০ টাকা দিয়ে একটি বল কিনে দেন। সেই বল দিয়ে কৃষ্ণার যাত্রা শুরু। আজ সে হিমালয় জয়ের রানী হিসেবে দেশের মানুষের মুখে মুখে।

মানুষের কটূ কথা সহ্য করতে না পেরে তার মা এক দিন বটি দিয়ে তার ফুটবল কেটে ফেলেন। তবু থামেনি কৃষ্ণা। ১৬ কোটি মানুষের তাজ হবে যে, তাকে কি থামিয়ে রাখা যায়? প্রাইমারি স্কুল থেকে বঙ্গমাতা ফুটবল খেলে নজরে পড়ে সৃতি ভিএম পাইলট স্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের। তিনি একটি নারী ফুটবল দল গঠন করেন। ওই দলে রাখেন কৃষ্ণাকে । কৃষ্ণাদের বাড়ি থেকে সূতি ভিএম স্কুলের দূরত্ব সাত কিলোমিটার। এত দূরে গিয়ে কিভাবে প্র্যাকটিস করবে? তখন কেউ রাজি হননি। বরং মা-বাবা বাধা দিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় এগিয়ে আসেন তার চাচা নিতাই চন্দ্র সরকার। তিনি সাহস যোগাতে থাকেন। ভাতিজিকে কোনো দিন সাইকেলে, কোনোদিন ভ্যানে, কোনোদিন হেঁটে প্র্যাকটিস করতে নিয়ে যান। কৃষ্ণা স্কুল দলের হয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে থাকে।
২০১৩ সালে বাফুফে তৃণমূল পর্যায় থেকে মহিলা ফুটবলার তুলে আনার কর্মসূচি হাতে নেয়। দেশের ৪০টি ভেন্যুতে এক সাথে এ প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি পালন করে। টাঙ্গাইল জেলা থেকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয় কৃষ্ণা। এরপর রাজশাহী ভেন্যুতে এক মাসের একটি ক্যাম্প হয়। ওই ক্যাম্পে কোচ হিসেবে গোলাম রায়হান বাপনের ভাই গোলাম রব্বানী ছোটনকে কোচ হিসেবে পায়। তার পরের গল্পটা শুধু সামনের দিকে এগোনোর।
কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার বলেন, ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহ দেখে ৪০ টাকা দিয়ে একটি বল কিনে দিয়েছিলাম কৃষ্ণাকে। কে জানতো সেই বলই তাকে আজকের এই অবস্থায় এনে দিবে। ‘মেয়ের সাফল্যে খুব খুশি হয়েছি। এলাকার মানুষও শুভেচ্ছা জানাতে আসছে। কৃষ্ণা যেন দেশের জন্য আরও গৌরব বয়ে আনতে পারে সেই আশীর্বাদ চাই।’
কৃষ্ণার মা নমিতা রানী সরকার বলেন, ‘মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ভালো একটি ফোন না থাকায় মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারি না। আমি কৃষ্ণাসহ ওদের দলের সবার জন্য দেশবাসীর কাছে আশীর্বাদ কামনা করি।’
গোপালপুর সূতি ভিএম পাইলট স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন বলেন, ‘ওর খেলায় নৈপুণ্য রয়েছে। রয়েছে ভাল করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বল নিয়ে দৌড়ানোর তীব্র গতি। আমি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম ও ভালো কিছু করবে। ওর সাফল্যে আমরা তথা টাঙ্গাইলবাসী গর্বিত।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. আতাউল গনি বলেন, ‘নারী ফুটবলে তার এই সাফল্যে টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশ গর্বিত। আমরা এই কৃতি ফুটবলারকে টাঙ্গাইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেব।’
