ইরানে আরেক বসন্তের হাওয়া

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৩৫ পিএম

বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইরান। হিজাব না পরার অভিযোগে নীতি পুলিশের হেফাজতে মারা যাওয়া তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো দেশ। মাশা আমিনি নামের ওই তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদের আন্দোলন রূপ নিয়েছে হিজাববিরোধী আন্দোলনে। ইসলামি বিপ্লবের ইরানে হিজাববিরোধী এই আন্দোলন বিচলিত করেছে খোদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। গত সোমবার মাশা আমিনির পরিবারের কাছে নিজের এক প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিয়েছেন নীতি পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস। তবে সে আশ্বাস টলাতে পারেনি বিক্ষোভকারীদের। গত বুধবার  টানা ষষ্ঠ দিনের মতো তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল অবধি পুলিশসহ অন্তত নয় জন নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ছবি ও ভিডিওতে দেখে গেছে বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভ মিছিলে নারী-পুরুষের সমান উপস্থিতি। মাশা আমিনির হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন প্রতিশোধ নেওয়ার সেøাগান। নারীরা তাদের হিজাব জ্বালিয়ে, চুলও কেটে নীতি পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বুধবার রাতে কয়েকটি শহরের রাস্তা থেকে পুলিশের সরে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সেসব এলাকাগুলো এখন বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে। 

এদিকে ইরান সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিবিসি ফার্সি ও ইরান ইন্টারন্যাশনালের মতো ইসলামবিদ্বেষী টিভি চ্যানেলগুলোর ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছে। পার্সটুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি গণমাধ্যমের উসকানিতে উত্তরাঞ্চলীয় রাশতে একটি মসজিদে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। হামেদানে একজন ইমামজাদার মাজারেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। মাশার মৃত্যুর কারণ বের করতে তদন্ত চলছে। কিন্তু এই ইস্যুকে অপব্যবহার করে ইরান ও ইসলামের শত্রুরা মিথ্যাচার অব্যাহত রেখেছে। বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, গতকাল অন্তত ১৫টি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিক্ষোভকারীদের পুলিশকে ধাওয়া করা, গুলির শব্দ এবং মেয়েদের হিজাবে আগুন লাগানো দৃশ্য দেখা গেছে। ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভে একেবারে সামনের কাতারে রয়েছেন ইরানের নারীরা। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, উরমিয়া, পিরানশাহর এবং কেরমানশাহে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত তিন বিক্ষোভকারীর মধ্যে একজন মহিলাও রয়েছেন। ইরানি কর্র্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কেরমানশাহে দুজন বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি শিরাজে একজন পুলিশ সহকারীকে হত্যার অভিযোগ করেছে।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সাকেজ থেকে আসা ২২ বছর বয়সী কুর্দি নারী মাশা আমিনি গত শুক্রবার হাসপাতালে মারা যান। তেহরানে তার ভাইয়ের সঙ্গে থাকার সময় নীতি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ তখন তার বিরুদ্ধে হিজাব না পরা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরার আইন ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ আনে। পুলিশের একটি ডিটেনশন সেন্টারে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পরপরই তিনি কোমায় চলে যান। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নাদা আল-নাশিফ বলেছেন, জাতিসংঘ ইরানে নারীদের প্রতি সহিংস আচরণের অসংখ্য এবং যাচাইকৃত ভিডিও পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ নীতি পুলিশ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পোশাক নিয়ে বেশ কঠোর হয়েছে। ইরানের একজন সিনিয়র এমপি জালাল রশিদি কুচি প্রকাশ্যে নীতি পুলিশের সমালোচনা করে বলেছেন, এ বাহিনী তৈরি একটি ভুল কাজ, কারণ এটি ইরানের জন্য শুধু ক্ষতিই বয়ে এনেছে।

অনেকে বলছেন, ১২ বছর আগে তিউনিশিয়ায় দেশটির অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এক যুবক গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সেই আগুন বিক্ষোভের দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরে অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই বিক্ষোভের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়া, মিসর, বাহরাইন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ অনেক দেশে। এবার প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে সেই একই হাওয়া বইছে বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত