শতশত নারীকে গ্রেপ্তারেও থামছেনা আন্দোলন, নতুন কৌশল ইরানের

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০১ পিএম

সঠিক নিয়মে হিজাব না পরার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের হেফাজতে মাশা আমিনি নামে এক তরুণীর মৃত্যুতে ইরানজুড়ে গত ৮ দিন ধরে হাজারে হাজারে নারী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগে শত শত নারীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তারপরও আন্দোলন থামছে না। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না আন্দোলন।

এবার তাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্দোলন দমাতে চাইছে ইব্রাহিম রাইসির সরকার। হিজাববিরোধী আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের সকলকেই চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে কারণে ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরানের পুলিশ।

ইরান প্রশাসন সূত্রে খবর, আন্দোলনের পেছনে হিজাব নিয়ে উসকানি রয়েছে বিশেষ এক শ্রেণির নারীদের। সেটা বন্ধ করতেই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছে ইরানি পুলিশ। সেজন্যই এবার প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দেশটিতে নারীদের হিজাব পরা ও লম্বা চুল রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই আইন কোনোভাবেই বাতিল করছে না ইব্রাহিম রাইসির সরকার। বিশেষজ্ঞদের দাবি, হিজাব নিয়ে চলা আন্দোলন দ্রুত বন্ধ করতে চাইছে তেহরান।

এদিকে ‘ফেসিয়াল রিকগনিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহারের খবর সামনে আসায় ক্ষোভে ফুঁসছেন ইরানি নারীরা। তাদের অভিযোগ, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা আরও ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

এক আন্দোলনকারী নারী বলেন, এরপর তো হিজাব না পরে রাস্তায় বের হলে আমাকে চিহ্নিত করে রাখবে সরকার। সেক্ষেত্রে আমার এবং আমার পরিবারের ওপরও অত্যাচার নেমে আসতে পারে।

হিজাব নিয়ে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে গত শুক্রবার মৃত্যু হয় উত্তর-পশ্চিম ইরানের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী মাশা আমিনির। তার মৃত্যুর পরই ইরানজুড়ে হিজাব নিয়ে শুরু হয়েছে আন্দোলন। বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরার আইন বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদীরা তেহরানের রাস্তায় জড়ো হন। সেখানে তাদের চিৎকার করে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। ‘হিজাব নয়, স্বাধীনতা ও সাম্য চাই’- বলে স্লোগান দেন তারা। পাশাপাশি অনেক ইরানি নারী তাদের চুল কেটে ফেলেও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। বুধবার থেকে প্রতিবাদীদের ওপর গুলি চালানো শুরু করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। গত ৮ দিনে নিহতের সংখ্যা ৫০ জন ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর)।

ইরানের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত’ শক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়া এড়াতে গুতেরেস সবাইকে সংযম প্রদর্শনেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

শুক্রবার নিউ ইয়র্কে গুতেরেসের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করার কারণে বহু মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, এমন খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা কর্তৃপক্ষের প্রতি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সভা করার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য ফের আহ্বান জানাচ্ছি’।

দুজারিক জানান, বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম বার্ষিক অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সঙ্গে বৈঠককালে গুতেরেস মানবাধিকারের ইস্যুটি তুলেছিলেন।

মাশা আমিনির মৃত্যুর বিষয়ে ‘স্বাধীন দক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত শুরু করার জন্য’ গুতেরেস রাইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বলে দুজারিক জানিয়েছেন। 

রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘ নারী অধিকার ও অন্যান্য মানবাধিকার লংঘন থেকে নারীদের রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

শুক্রবার ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে চলমান নারীদের বিক্ষোভের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল সরকার সমর্থকরা। তারা প্রতিবাদকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ অভিহিত করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

আরও পড়ুন...

হিজাব পরতে বা খুলতে বাধ্য করলেই প্রতিবাদ করব: মালালা

ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ইরান

ইরানে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভে নিহত বেড়ে ৫১

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত