দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে তিন দিনের ব্যবধানে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। মারা যায় প্রায় দুই লাখ সামরিক ও বেসামরিক মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের পূর্বাঞ্চলের ছোট শহর ওক রিজ। ‘গোপন’ এই শহরে প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। লিখেছেন নাসরিন শওকত
১৯৪৫-এর ৬ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে। এই বিমান থেকে সকালে জাপানের হিরোশিমা শহরে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল। যার আঘাতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিক মারা যায়। পরে বোমার তেজস্ক্রিয়তায় মারা যায় আরো হাজারো মানুষ। এর মাত্র তিন দিন পর ৯ আগস্ট জাপানের আরেক শহর নাগাসাকিতে আরেকটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল। যার তাৎক্ষণিক আঘাতে আরও ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। সময়ের ধারাবাহিকতায় পরে আরও অনেক মৃত্যর মিছিল ছিল। জোরালোভাবে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে, জাপানকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটাতেই ওই দুটি বোমার হামলা সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৪১- এর ডিসেম্বরের শেষে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন ম্যানহাটন প্রকল্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গরাজ্যেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার জমি চুপিসারে অধিগ্রহণ শুরু করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের সেনা দল। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই এলাকাগুলোর কিছু বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং ভেঙে ফেলা হয় তাদের বাড়িঘর। পরের বছর ১৯৪৩। যুক্তরাষ্ট্রের খুব সাধারণ এই তিন শহরকে দ্রুতগতিতে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, যা ম্যাপের বাইরেই ছিল। শহরগুলোর বিশেষ একটিই উদ্দেশ্য ছিল ম্যানহাটন প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা।
ওই প্রকল্পের তিনটি ‘গোপন’ শহর-এর একটি ছিল ওক রিজ। বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির সময় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ‘গোপন’ শহর ওক রিজ। তখন সেখানে প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। যাদের ২৮ মাসের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল বিশে^র প্রথম পারমাণবিক বোমা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ওক রিজের ওই গোপন মিশনে নিয়োজিত কর্মীদের বেশির ভাগই তখনো জানতেন না যে তারা কী তৈরি করছেন। ১৯৪১-এর ৭ ডিসেম্বর। জাপানিরা পার্ল হারবার আক্রমণ করেছিল। তখনো ওক রিজ শহরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
ম্যানহাটন প্রকল্প
১৯৩৯-এর আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখেছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। সেখানে সতর্ক করে তিনি বলেন, সম্ভবত জার্মানরা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন। এজন্য নাৎসি ও জার্মান বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ আকরিক কিনছেন, যা দিয়ে পরমাণু প্রযুক্তির সহায়তায় সম্ভবত একটি নতুন শক্তিশালী বোমা বানানোর চেষ্টা করছেন তারা। তাই আমেরিকার উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। আইনস্টাইনের ওই সতর্কবার্তাই তখন টেনেসির প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি গোপন শহর গড়ে তোলাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল।
১৯৪২-এর ২৮ ডিসেম্বর। আইনস্টাইনের চিঠির জবাবে ‘দ্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প গঠনের অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। দ্য ম্যানহাটন প্রকল্প ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রযুক্তিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির গবেষণা প্রকল্পের সাংকেতিক নাম (কোড নেম)। যেখানে গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তির পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র। একটাই ছিল লক্ষ্য। নাৎসিরা সে সময় যেভাবে পরমাণু অস্ত্রের পেছনে ছুটছিল সে বিষয়ে সচেতন থাকা। যদিও যেমনটা ভাবা হয়েছিল তখনো পরমাণু অস্ত্রের অতটা কাছে পৌঁছায়নি নাৎসিরা। কিন্তু এরই মধ্যে প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য বিশাল পরিমাণের অর্থ ও জনশক্তি বিনিয়োগ করে ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমন আতঙ্কের কারণেই তখন ম্যানহাটন প্রকল্প অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছিল ।
এই প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী অংশীদার ছিল যুক্তরাজ্য ও কানাডা। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভসকে। ম্যানহাটন প্রকল্পের গবেষণার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে একাধিক স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। যাতে ওই এলাকায় পরমাণু-সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো চালানো যায়।
ওক রিজ কেন
১৯৪২-এর ১৯ সেপ্টেম্বর। ম্যানহাটন প্রকল্পের অধীনে প্রাথমিকভাবে তিনটি শহরকে নির্বাচন করেছিলেন গ্রোভস। এর মধ্যে টেনেসির ওক রিজ একটি। অন্য দুটি শহরের মধ্যে ছিল নিউ মেক্সিকোর লস আলামোস ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের হ্যানফোর্ড বা রিচল্যান্ড। গ্রোভের কাছে সম্ভাব্য অন্য দুটি স্থানের চেয়ে ওক রিজকে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল । কার্যত তখন সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শহরটির অবস্থান সবচেয়ে আদর্শ বলে মনে হয় তার কাছে। উপকূল অঞ্চল থেকে আরও ভেতরে অবস্থিত ওই এলাকা থেকে খুব সহজেই জাপান ও জার্মানির ওপর বোমা নিক্ষেপ সম্ভব ছিল। তখন ম্যানহাটন প্রকল্পের জন্য এই শহর তিনটিকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করেন গ্রোভ।
প্রকল্প এলাকাটি যানবাহনের প্রাণকেন্দ্র ও জনসমাগমের কেন্দ্র নির্মাণের জন্য যথেষ্ট কাছাকাছি ছিল (প্রায় ২৫-৩৫ মাইল দূরে)। তবে রাডারের আওতায় থেকে তুলনামূলক দূরে ছিল যথেষ্ট। ম্যানহাটন প্রকল্পের আওতায় একাধিক প্লান্ট ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্ররোম্যাগনেটিক প্লান্ট, গ্যাসিয়াস ডিভিউশন প্লান্ট ও থারমাল ডিফিউশন প্লান্ট। প্লান্টগুলোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে বিদ্যুতের প্রয়োজন পড়ে, যা টেনেসি উপত্যকার কাছাকাছি নরিস ড্যামের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়। ওই এলাকায় সে সময় পানির উৎস ও প্রচুর পরিত্যাক্ত জমি ছিল।
ওক রিজ নির্মাণ
১৯৪৩ সাল। টেনেসি অঙ্গরাজ্যে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। শহর তিনটি নির্বাচনের পর সেখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল এলাকার চাষের জমি অধিগ্রহণ শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তখন ওক রিজের আতঙ্কিত বাসিন্দারা স্বল্পমূল্যেই জমি বিক্রি করে সরকারের কাছে। প্রায় এক হাজার পরিবার সেখান থেকে দ্রুত চলে চায়। ওক রিজ ভেঙে শুরু হয় ম্যানহাটন প্রকল্পের নতুন প্লান্ট নির্মাণ। প্লান্টে কাজ করার জন্য তখন অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে। সেজন্য কাছের নক্সভিল ও আশপাশ থেকে কয়েক হাজার তরুণ কর্মী চলে আসে সেখানে। নক্সভিলের প্রায় ২৫ মাইল পশ্চিমের ৫৯ হাজার একর জমিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছিল কয়েক হাজার তরুণ শ্রমিক। বিপুল পরিমাণের নির্মাণ উপকরণ নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে, যা আগে কখনোই দেখা যায়নি। প্রথমে রেকর্ড গতিতে বাড়িঘর ও অন্যসব স্থাপনা নির্মাণ
করা হয়েছিল।
এদিকে প্লান্ট নির্মাণের জন্য আসা শ্রমিকরা সামরিক বাহিনীর সংরক্ষিত নতুন ওই এলাকায় নিজেদের থাকার জন্য তাৎক্ষণিক তাঁবু নির্মাণ করে। পরে তারা স্ক্র্যাচ দিয়ে রেকর্ড গতিতে কয়েকশ বাড়ি ও অন্যসব স্থাপনা তৈরি করেছিল। যার মধ্যে ছিল আসবাবপত্রসহ ঘর থেকে শুরু করে নজিরবিহীন পরিমাণের শিল্প-কাঠামো। ১৯৫৩ সালের মধ্যে ৫৯ হাজার একর জায়গায় একটি নতুন শহর হিসেবে ওক রিজ গড়ে উঠেছিল। জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে ওই এলাকাকে আড়াল করার জন্য তখন প্রতিবন্ধকতা ও বেড়া দিয়ে পুরো এলাকা মুড়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে শহর নির্মাণ শেষ হয়। তখন সেখানে গোলাবারুদ উৎপাদনের আভাস দিয়ে মিথ্যা গুজবও ছড়ানো হয়েছিল। তাতে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটার বিষয়ে স্পষ্টতই সন্দেহ শুরু করেন। কিন্তু তখনো তাদের কেউ পরমাণু অস্ত্র দেখেনি বা সে সম্পর্কে শোনেনি। যুক্তরাষ্ট্র তখন যুদ্ধে থাকার কারণে বেশির ভাগ মানুষই এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, যা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে চালিয়ে নিতে সহায়তা করেছিল।
ওক রিজের বাসিন্দা
নতুন ‘গোপন’ শহর ওক রিজের নির্মাণ করা বাড়ি ও বিশালাকারের সব স্থাপনার নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমার জন্য জ্বালানি তৈরি ও অস্ত্র তৈরির জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থকে পরিমার্জন করা যায়। তখন ম্যানহাটন প্রকল্পের নেতারা দৃঢ়ভাবে এটা অনুভব করেছিলেন যে, শহরটিতে আসা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্যও বাড়ি নির্মাণ করা প্রয়োজন। যাতে তারা ছাত্রাবাসের মতো আবদ্ধ পরিবেশে থাকার পরিবর্তে নিজের বাড়িতে স্বচ্ছন্দ জীবন কাটাতে পারেন। তাদের দেখতে যেন একটি ‘সাধারণ’ শহরবাসী মনে হয়। এভাবেই তখন প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানের সাধারণ চেহারার শহরতলির মতো দেখতে।
তখন ওক রিজ শহরকে কেন্দ্র করেই নতুন নানা ধারণার পরীক্ষা চালাতে সক্ষম হয়েছিল মার্কিন সরকার, যা পরে যুদ্ধোত্তর নগর নির্মাণ ও নকশাকে প্রভাবিত করে। সে সময় স্কিডমোর, উইংগস অ্যান্ড মেরিল নামে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পুরো ওক রিজ শহরের পরিকল্পনার নকশা করেছিল। প্রাথমিকভাবে শহরটিকে ১৩ হাজার বাসিন্দার জন্য পরিকল্পনা করে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ৭৫ হাজার বাসিন্দার শহর হয়ে ওঠে, যা টেনেসির পঞ্চম বৃহৎ শহরে রূপান্তরিত হয়। তবে যুদ্ধের শেষ দিকে গোপন ওই তিনটি শহর দখল করে ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিকর্মী ও সহযোগী কর্মী। তখন সেখানকার বাসিন্দাদের একটি পরিকল্পিত সুখী জীবনধারা দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কিছু সামাজিক সমস্যা বিদ্যমান ছিল সেখানে, যা জাতিগত বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ওক রিজ শহরের পূর্বপাশের শেষ প্রান্তে ‘নিগ্রো ভিলেজ’-এর পরিকল্পনা করেছিলেন স্থপতিরা। সেখানকার শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দাদের জন্যও একই নকশার বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ‘গোপন ওই শহরটি’তে যতই আফ্রো-আমেরিকান বাসিন্দার সংখ্যা বাড়তে থাকে, হালকা কাঠের তৈরি ‘কুঁড়েঘর’ নির্মাণের সংখ্যাও তত বেড়ে যায়। মৌলিক এই কাঠামোর নকশা ও উপকরণ ততটা মানসম্পন্ন ছিল না। সে সময়ের এই জাতিগত বিচ্ছিন্নতার ঘটনা সব মহলের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গোপনীয়তা
যুদ্ধের সময় ওক রিজ শহরে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করত। তা সত্ত্বেও তখন আনুষ্ঠানিক কোনো অস্তিত্ব ছিল না শহরটির। এমনকি ম্যাপেরও কোথাও ওক রিজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে সময় এলাকাটিকে ‘সাইট এক্স’ বা ‘ক্লিনটন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ হিসেবে দেখানো হতো। যুদ্ধের পুরো সময় গোপন এ শহরটির প্রবেশপথ নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে সুরক্ষিত ছিল। সেখানকার কর্মী ও শ্রমিকরাও কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলত। ধারণা করা হয়ে থাকে, এই পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র কয়েকশ ব্যক্তি বিষয়টি জানতেন তখন। টেনেসির ছোট্ট শহর ওক রিজে তখন লাখেরও বেশি মানুষ বাস করত। যারা গোপন ওই বোমা তৈরির কাজ করত। কিন্তু এই বাসিন্দাদের বেশির ভাগই তখনো জানতেন না যে, তারা একটি নতুন ধরনের বোমা তৈরির জন্য কাজ করছেন। তারা শুধু ততটুকু তথ্যই জানতেন যতটুকু তাদের দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। তাদের বলা হয়েছিল, যুদ্ধের জন্য কাজ করছেন তারা।
১৯৪৫-এর ১৬ জুলাই। নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। ম্যানহাটন প্রকল্পের আরেক গোপন শহর লস আলামোস থেকে যা প্রায় ১০০ মাইল দূরে ছিল।
বোমা ফেলা এবং তারপর
প্রাথমিক পরীক্ষার এক মাসও পার হয়নি তখন। ১৯৫৪-এর ৬ আগস্ট। সকালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে’র তিনটি বিমান প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ছেড়ে যায়। জাপানের উপকূলের ওপর দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে চক্কর দিতে থাকে বিমান তিনটি। বেশ কয়েক ঘণ্টা পর নিচের সবকিছু স্পষ্ট হতে শুরু করে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। এনোলা গে’র পাইলট মার্কিন সামরিক বিমানবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পল ডব্লিউ টিবেটস জুনিয়র তার মিশন শেষ করেন। বোমারু ওই বিমান থেকে জাপানের হিরোশিমা শহরে প্রথমবারের মতো একটি পারমাণবিক বোমা ফেলেন তিনি। মার্কিন সামরিক বিমানবাহিনীর ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন টিবেটস জুনিয়র। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট এ লুইস। পারমাণবিক ফিশন ওই বোমাটি ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। যার ডাকনাম দেওয়া হয় ‘লিটল বয়’। বোমাটির আঘাতে সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়েছিল তখন। যা হিরোশিমা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল নিমেষেই।
হিরোশিমায় প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেলার পরপরই ওক রিজের বাসিন্দাদের উদ্দেশ করে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। যেখানে স্পষ্ট করা হয়, এত দিন ধরে তারা কী কাজ করছিলেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান গোপন ওই তিনটি শহরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়ে একটি ঘোষণা দেন সে সময়। তার ওই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ওক রিজ শহরের রহস্য উন্মোচিত হয়। তখন ওক রিজের বোমা তৈরির দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও উপলব্ধি করতে পারলেন যে, কীভাবে তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করছেন। এমন অর্জনে গর্ববোধ করে বাসিন্দাদের কেউ কেউ রোমাঞ্চিতও হলেন। গর্বের কারণ তাদের তৈরি বোমাই এই যুদ্ধ শেষ করতে সহায়তা করেছে। তখন স্থানীয় পত্রিকা ‘ওক রিজ জার্নাল’-এ দাবি করা হয়েছিল ‘ওক রিজ জাপানে আক্রমণ চালিয়েছে’। এর মধ্য দিয়ে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। এমন খবরে রাস্তায় আনন্দ মিছিলে নেমেছিল বাসিন্দাদের একাংশ। আবার কেউ কেউ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে, এমন বিধ্বংসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাও। এর ঠিক তিন দিন পর ৯ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বি-২৯ বোমারু বিমান ‘বকস্কার’ থেকে জাপানের নাগাসাকি শহরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল। বোমারু বিমানটির পাইলট
মেজর চার্লস সুইনি। পারমাণবিক ফিশন ওই বোমাটি প্লুটোনিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়। যার ডাকনাম ছিল ‘ফ্যাটম্যান’।
স্নায়ুযুদ্ধ চলা পর্যন্ত ‘গোপন এই তিনটি শহর’ টানা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে গেছে। সেই সঙ্গে সীমান্তে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চালু রেখেছে তারা। বর্তমানে ওক রিজ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ভবন ওয়াই-১২-এ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। শহরটির অনেক পুরনো ভবন এখনো আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশে^র পারমাণবিক বোমা তৈরির ঐতিহ্যকে বহন করে চলা ম্যানহাটন প্রকল্পের প্রাণকেন্দ্র ওক রিজ আজও ‘গোপন’ শহর হিসেবেই রয়ে গেছে।