লৌকিক-লোকোত্তর কল্যাণ সাধনে কঠিন চীবর দানের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২২, ১১:০৪ এএম

দানশ্রেষ্ঠ শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব বাঙালি বৌদ্ধ সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। শরৎকালীন এই সময়ে বৌদ্ধদের গ্রামে গ্রামে প্রবারণা ও কঠিন চীবর দানোৎসব একটি আনন্দমুখর ধর্মীয় উৎসব ও সম্মিলন অভূতপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাঙালি বৌদ্ধরা এই দিনটি উদযাপনের জন্য সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে। এখানে প্রত্যেকে ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান দিয়ে যেমন অসীম পুণ্য সঞ্চয় করে তেমনি দান-শীল-ভাবনাদির দেশনা শ্রবণ করেও অধিকতর প্রশান্তি লাভ করে। যা বছরের অন্যান্য সময়ে এই সুযোগ আসেনি। ভিক্ষুদের তিন মাসের বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের পরদিন থেকে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপিত হয়। এই দানের গুরুত্ব অপরিসীম।

বঙ্গীয় অঞ্চলে বহু পূর্বে কঠিন চীবর দান প্রচলিত ছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় প্রভৃতি কারণে ধর্মের বিপর্যয় ঘটলে অন্যান্য ধর্মীয় আচার আচরণের মতো কঠিন চীবর দান প্রথাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা থেকে বাঙালি বৌদ্ধদের প্রথিতযশা সাংঘিক ব্যক্তিত্ব রাজগুরু ধর্মরত্ন মহাস্থবির (রাঙ্গুনিয়া) স্বদেশে এসে সর্বপ্রথম আচার্য ভগবান চন্দ্র মহাস্থবিরকে ভিত্তি করে সৈয়দবাড়ী ধর্মচক্র বিহারে ১৯১৩ সালে দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান দিয়ে শুধু গুরু পূজা করেননি; নতুন করে কঠিন চীবর দানের শুভ সূচনা করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

তাছাড়া পটিয়াস্থ নাইখাইন সন্তোষালয় বিহারে ১৯১৪ সালে বিনায়াচার্য বংশদীপ মহাস্থবির মহোদয় আর্যশ্রাবক ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবিরকে ভিত্তি করে কঠিন চীবর দান দিয়ে আরেকটি নব ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সপ্তম সংঘরাজ সদ্ধর্মকীর্ত্তি অভয়তিষ্য মহাস্থবির ও পণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির কঠিন চীবর দানের ব্যাপক প্রসার ঘটান অন্যান্য গুণী-জ্ঞানী মহাস্থবিরদের সহযোগে। 

একসময় তথাগত সম্যকসম্বুদ্ধ বর্ষা মৌসুমে ভিক্ষুদের নিয়ে গ্রামাঞ্চলে পদব্রজে ভ্রমণ করতেন। এতে ফসলের এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি সাধিত হত। এই উপলব্ধিতে সকলের হিতের জন্য তখন থেকে তথাগত বুদ্ধ নিয়ম প্রবর্তনের প্রদান করলেন, ’হে ভিক্ষুসংঘ আমি নির্দেশ প্রদান করছি, বর্ষা মৌসমের তিন মাস তোমরা ভ্রমণ করবে না। এ তিন মাস তোমরা একস্থানে থেকে, একত্রে থেকে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলন করবে।’ তখন থেকে ‘বর্ষাব্রত’প্রথা প্রবর্তিত হয় এবং অদ্যবধি পূজনীয় ভিক্ষুসংঘ আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস সুচারুরূপে বর্ষাব্রত পালনের পর প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মধ্য দিয়ে ব্রত বর্ষাবাস সমাপন করেন।

কথিত আছে, মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ তাঁর পঞ্চম বর্ষা অনাথপিণ্ডিক নির্মিত শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করেছিলেন। তখন পাঠেয়বাসী পশ্চিমাদেশীয় ত্রিশজন ভিক্ষু বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধ দর্শনের জন্য শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে এসেছিলেন। বুদ্ধ সেই ত্রিশজন ভিক্ষুর পরিহিত চীবরের করুন অবস্থা দেখে অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন। আজ থেকে কোন গৃহী যদি ভিক্ষু সংঘকে চীবর দান করে তবে সেই চীবর ভিক্ষু সংঘ ব্যবহার করতে পারবে। তখন থেকে ভিক্ষু সংঘ গৃহী প্রদত্ত চীবর পরিধান করা শুরু করেন।

কঠিন চীবর দান প্রচলনের পূর্বে ভিক্ষুসংঘ পাংশুকুলিক চীবর (শ্মশানে বা অন্য কোথাও পড়ে থাকা ময়লা ছিন্নবস্ত্র) পরিধান করতেন। এতে ভিক্ষুদের রোগাক্রান্ত হওয়া এবং স্বাস্থ্যহানি ঘটার সম্ভাবনা থাকতো প্রচুর। ভিক্ষুদের সুস্বাস্থ্য ও নীরোগ দেহের কথা চিন্তা করে রাজগৃহে বর্ষাবাসকালে তথাগত বুদ্ধ চীবর অর্থাৎ পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করার অনুমতি দেন। তারপর থেকে সাধারণ গৃহীরা ভিক্ষুদের চীবর দান দেওয়া শুরু করেন। তবে সকল ভিক্ষুরা কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারেন না। যারা বিনয়সম্মতভাবে ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান সমাপ্ত করেন তারাই একমাত্র কঠিন চীবর লাভ করতে পারে। তাঁদেরকে কঠিন চীবর লাভী ভিক্ষু বলা হয়।

‘চীবর’ হলো ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র। গাছের শেকড়, গুঁড়ি, ছাল, শুকনো পাতা, ফুল ও ফলের রঙ অনুসারে এর ছয়টি রঙ নির্দিষ্ট। তবে ভিক্ষুসংঘ সাধারণত লাল ফুলের রঙের চীবরই বেশি ব্যবহার করে, যা সাধারণ গৃহীদের পরিধেয় বস্ত্র থেকে পৃথক ও বৈচিত্রহীন।  ‘চীবর দান’ কথাটির সাথে ‘কঠিন’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে ত্রিপিটকের অন্তর্গত বিনয় পিটকের ‘মহাবগ্গ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘যেদিন চীবর দান করা হবে সেদিনের সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুতাকাটা, কাপড় বোনা, কাপড় কাটা, সেলাই ও রঙ করা, ধৌত করা ও শুকানো সহ যাবতীয় কাজগুলি সম্পন্ন করে উক্ত সময়ের মধ্যেই এ চীবর ভিক্ষুসংঘকে দান করতে হবে।’

কঠিন চীবর দান পৃথিবীতে যত প্রকার দান আছে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দাননুষ্ঠান। এই দানের মহৎ ফল বর্ণনা করতে গিয়ে গৌতম বুদ্ধের আগের সিখী বুদ্ধ বলেছেন, ‘যাবতা সব্বদানানি একো বস্সসতং দদে, একস্স কঠিন দানস্স কলং নগ্ঘন্তি সোলসিং।’ অর্থাৎ, সর্বপ্রকার দান শতবর্ষ ব্যাপী দান করলেও, একটি কঠিন চীবর দান-পুণ্যের ষোলভাগের একভাগও পুণ্য হয় না।

কঠিন চীবর দানের দ্বারা মানুষের মধ্যে ত্যাগী চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং এই দানে মানুষের সমৃদ্ধি আসে। কঠিন চীবর দান ও জাতীয় বৌদ্ধ মহাসম্মেলন আয়োজনে বৌদ্ধদের মাঝে বিরাজ করে মহামিলন, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতি। তাই মানুষের মাঝে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য জাগাতে উক্ত অনুষ্ঠান আমাদের মাঝে সুফলতা দেয়। প্রতিনিয়ত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র, বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জর্জরিত, এমনি সময়ে মহামানব তথাগত বুদ্ধের অমিয়বাণী মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা মানব অন্তরের উন্মেষ সাধন করে অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানব জীবনে লৌকিক-লোকোত্তর কল্যাণ সাধন সম্ভব।

মনুষ্যলোকের মনুষ্য সম্পদ, দেবলোকের দেব সম্পদ এবং অন্তিমে পরম শান্তি নির্বাণ সুখ কঠিন চীবর দানে লাভ করা যায়। তাই প্রত্যেক বৌদ্ধ নরনারীগণ কঠিন চীবর দিবসের দিন যে সমস্ত দানীয় বস্তু শ্রদ্ধার সহিত দান করেন সমস্ত দানীয় বস্তু কঠিন চীবর দানের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই দানের পুণ্যফল জেনে প্রত্যেকের জীবনে একবার হলেও শ্রদ্ধার সহিত মহাফল দায়ক কঠিন চীবর দান দেওয়া উচিত। চীবর দানোৎসব উপলক্ষে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে সমগ্র শহর-গ্রামের মানুষের মাঝে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সাড়া পড়ে যায়। দানোৎসবে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সমাবেশে প্রতিটি অনুষ্ঠান যেন বৌদ্ধদের মিলন-মেলায় পরিণত হয়। এতে একদিকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয় অন্যদিকে ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বিজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীদের সদ্ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা সাধারণ মানুষের জ্ঞান ভান্ডার ও নৈতিক উৎকর্ষতা সাধনে প্রভাবিত করে। দানসভা ছাড়াও সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, কীর্তন ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানটি একটি উৎসবমুখর পরিবেশে সমাপ্ত হয়ে থাকে।

লেখক পরিচিতি: এম.এ (মাস্টার্স) অধ্যায়নরত. ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট, যুক্তরাষ্ট্র।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত